
শেষ আপডেট: 13 September 2021 13:59
শুধু তিনি একা নন, তাঁর বয়সি আরও একজনকে দেখা গেল সাইকেলের ব্যালেন্স ঠিক করতে। জানা গেল বয়স তাঁর পঞ্চাশ পেরিয়েছে। কিন্তু শেখার ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে হয়ে ওঠেনি। তাই সুযোগ পেয়ে খুশি রত্না কুণ্ডু। রত্নাদেবী বলেন, "ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। যদি শিখতে পারি ভবিষ্যতে একটা সাইকেল কিনব। এখান-ওখান যেতে হলে সাইকেল খুব প্রয়োজনীয়।' সেইসঙ্গে ভয়েও আছে এই বয়সে হাত-পা ভাঙার। কিন্তু তারপরও ইচ্ছার জোরে সাইকেলে পা ঘোরাচ্ছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ অর্জুনের বাড়ির সামনে বোমাবাজি: এনআইএ তদন্তের নির্দেশ দিল মোদী সরকার
নিজের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সাইকেল শিখছেন পেশায় আইটি কর্মী ধৃতিমান রায়। কেন? 'পেট্রল-ডিজেলের যা অস্বাভাবিক দাম বাড়ছে, তাতে গাড়ি নিয়ে যাতায়াতে ব্যয় বাড়ছে। তাই সাইকেল শিখলে সহজেই যাতায়াত করা যাবে। শিখে গেলে সাইকেল চেপেই অফিস যাওয়ার ইচ্ছা আছে' সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন ধৃতিমানবাবু।
কারও চিন্তা স্বাস্থ্য, আবার কারোর চিন্তা খরচ কমানো, কেউ বা আবার পেশার তাগিদে সাইকেল শেখা শুরু করেছেন। বয়েসের বাধা নেই, যেমন ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সিরাও সাইকেলের প্যাডেলে পা ঘোরাচ্ছেন, তেমনই মধ্যবয়সি থেকে কিশোর-কিশোরীরাও। সবার মুখে একটাই কথা সাইকেল শিখতে হবে।
একবছর আগে সাইকেল শিখেছেন সায়ন্তনী। তারফলে উপকারও মিলছে। সব কাজেই নিজের সাইকেলের ওপর ভর করে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। আবার শ্রীমন্তনী জুলাই মাসেই সাইকেল শিখে নিয়েছেন। এখন উত্তর কলকাতার হাতিবাগান থেকে সল্টলেকের অফিসে সাইকেল চেপেই যাতায়াত করেন। নিজের ফ্লোডিং সাইকেলটাই এখন তাঁর কাছে খুব প্রিয়।
সাইকেল শিখে যেমন শরীর ভালো রাখা যায়, তেমনই পেশার কাজেও ব্যবহার করা যাবে মনে করেন যাদবপুরের সুনীল মাহাতো। প্রথমদিনেই সাইকেলে ব্যালেন্স আয়ত্ত করে ফেলায় খুশি তিনি। 'শিখে গেলে একটা সাইকেল কিনব, ডেলিভারির কাজে সাইকেল চড়ে দেওয়া যাবে' জানালেন সুনীল। পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সাইকেল এখন পেশার অঙ্গ হয়ে উঠছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে যাতায়াতের খরচ বাড়ছে তো বটেই, পাশাপাশি স্বাস্থ্যের কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে সাইকেলই শ্রেয়, মত এক শ্রেণির মানুষের। তবে সবাই কি সাইকেল চালাতে পারেন? বিশেষত, শহরের বুকে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের কাছে সাইকেল শেখা হয়ে ওঠে না। পড়াশুনার চাপ, নয়তো জায়গার অভাব। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছেন কলকাতার সাইকেল সমাজ।
নিখরচায় সাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণের এই উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতা সাইকেল সমাজ। উত্তর কলকাতার গৌরীবাড়ি এলাকায় এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম নাম সুনীশ দেবের।
তিনি বলেন, 'আগে সবার ঘরেই সাইকেল থাকত। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বোঝাই যায় কলকাতায় সাইকেলটা ব্রাত্য হয়ে গেছে। তাই সাইকেলকে পুরোনো মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মহিলা, প্রবীণদেরই ভিড় বেশি।' এখানে শিখতে গেলে টাকার প্রয়োজন নেই, প্ৰয়োজন শুধু সাইকেলের প্রতি ভালোবাসা।'
তবে শহরের বহু জায়গা আছে যেখানে এখনও সাইকেল চালানোর অনুমতি নেই। যেমন শেক্সপিয়ার সরণি, ক্যামাক স্ট্রিট, মহাত্মা গান্ধী রোড সহ বহু বড় রাস্তায় সাইকেল চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। সেইসব রাস্তায় সাইকেল চালানোর অনুমতির জন্য বারবার আন্দোলন চালিয়েছে কলকাতার সাইকেল সমাজ। সুনীশ দেবের কথায়, 'সরকার এই সাইকেলের প্রতি যাতে ভাবে তাই চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা।'
দু'চাকায় ভর করে অনায়াসে পাড়ি দেওয়া যায় এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়। কেউ চালাচ্ছে প্রয়োজনে, কেউ চালাচ্ছে নেশায়। কিন্তু এই দূষণহীন, শব্দহীন, খরচহীন এই যানটি মানুষের কাছের, খুব নিজের। এই 'সাইকেল' মানুষের জীবনে এক উপকারের বার্তা বহন করে আনে। শুধু খরচ কমাতে নয়, শরীর ভালো রাখতেও সাইকেল চালানোর পক্ষে সওয়াল করেন চিকিৎসকরা।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'