দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা ১৯৯৭। কাশ্মীরের তৎকালীন সরকারের নিমন্ত্রণে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকরা পৌঁছলেন জম্মু। উদ্দেশ্য, জম্মু শহর থেকে কিছু দূরে কোট বালওয়াল জেল ঘুরে দেখা। সে জেলের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল। কারণ ধৃত জঙ্গিদের ঠাঁই হয় সেখানেই।
সাংবাদিক ইফতিখার গিলানি-ও ছিলেন সেই দলে। তিনিই সেই দিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন, আজ ২২ বছর পরে। দেশের বর্তমান টানাপড়েনের আবহে, এই দিনটির কথা বিশেষ কারণে, বিশেষ করে মনে পড়েছে তাঁর।
জেলের করিডর দিয়ে হাঁটছিলেন ইফতিখার ও অন্য সাংবাদিকেরা। হঠাৎই এক জন মোটাসোটা মৌলবি হাত নেড়ে ডাকাডাকি করতে শুরু করেন তাঁদের। গরাদের ও-পার থেকে। ওঁর চলাফেরায় একটু সমস্যা ছিল, বোঝা যাচ্ছিল দেখে। ওই মৌলবি সাংবাদিকদের উদ্দেশে দাবি করেন, তিনিও তাঁদেরই মতো এক জন ছিলেন, তিনি লেখক ছিলেন।
যদিও সাংবাদিকেরা তখন অন্য দুই ডাকসাইটে জঙ্গিকে দেখতেই বেশি উৎসাহী ছিলেন। তারা হল হারকত উল আনসারের দুই কম্যান্ডার নাসরুল্লা মনসুর খান লঙ্গরিয়াল ও সাজ্জাদ খান আফগানি। তাই সেই মুহূর্তে ওই মৌলবির কথায় গুরুত্ব না দিয়ে, তখন এগিয়ে গিয়েছিলেন অন্য জঙ্গিদের কুঠুরির দিকে।
[caption id="attachment_84304" align="aligncenter" width="660"]

সাংবাদিক ইফতিখার গিলানি।[/caption]
কিন্তু আজ ইফতিখারের মনে হচ্ছে, ওই দিন ওই লেখক মৌলবিটির সঙ্গে কিঞ্চিত বাক্যালাপ করলে মন্দ হতো না। কারণ ওই লেখকের নাম মৌলানা মাসুদ আজ়হার। এই মুহূর্তে দেশের সব চেয়ে আলোচিত নাম।
মজার বিষয় হল, এই গোলগাল, অল্প খুঁড়িয়ে হাঁটা, আপাত দৃষ্টিতে অন্য জঙ্গিদের তুলনায় কম 'নিরীহ', 'লেখক' মানুষটিকে যে সে দিন যে শুধু সাংবাদিকেরাই পাত্তা দেননি, তা নয়। একই ভুল করেছিল ইনটেলিজেন্স এজেন্সিও। তাঁদের চোখেও তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ঠেকেছিল এই জঙ্গি। তাই তেমন জোরদার মামলাই কোনও দিন রুজু হয়নি মাসুদের নামে। শাস্তি তো দূরের কথা। শেষমেশ ১৯৯৯-এর ডিসেম্বরে বিমান হাইজ্যাক করে যাত্রীদের পণবন্দি বানিয়ে আজহারকে ছাড়িয়ে নেয় জইশ জঙ্গিরা।
আসলে মাসুদ আজহারকে কাশ্মীরে পাঠানো হয়েছিল বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে। ১৯৯৪ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল লঙ্গরিয়াল। সে গ্রেফতার হওয়ায় আফগানি পাগলের মতো ক্ষেপে গিয়েছিল। এতোটাই যে প্রথমে শ্রীনগরের ইলাহি বাগে সেনা ক্যাম্পে হামলা করল সে। তার পর মেজর ভূপেন্দ্র সিংহকে কিডন্যাপ করে নিয়ে লঙ্গরিয়ালকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাল। এ ব্যাপারে এক সেনা কর্তা যখন তার সঙ্গে আলোচনায় বসলেন, তখন তাঁকেই মেরে দিল। আফগানির এহেন পাগলামি দেখে, সীমান্তের ওপারে জঙ্গি নেতারাই উদ্বেগে পড়ে গেল। কারণ, তখন নাশকতার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে দক্ষিণ কাশ্মীরে নেটওয়ার্ক বিস্তারে অগ্রাধিকার দিচ্ছিল তারা। এই অবস্থায় ভারতে তথা কাশ্মীরে এসে আফগানিকে বোঝানোর জন্য মাসুদ আজহারকেই বেছে নেয় পাকিস্তানে মৌলবাদী জঙ্গি নেতারা।
১৯৯৪ সালের ২৯ জানুয়ারি, পর্তুগিজ পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশের ঢাকা থেকে দিল্লি এসেছিল মাসুদ। ধোপদুরস্ত ফর্মাল জামাকাপড়, হাল্কা দাড়ি গালে। ঝকঝকে দেখতে। যদিও খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাসপোর্ট দেখেছিলেন ইমিগ্রেশন অফিসারেরা। আর পরে জানা যায়, এই চেকিং পর্বে বেশ নার্ভাস ছিল মাসুদ। যদিও ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে দিল্লির চাণক্যপুরীর অশোকা হোটেলে ওঠে সে।
ফেব্রুয়ারির ন'তারিখে যখন শ্রীনগর পৌঁছল মাসুদ, তখন চেহারা পুরো বদলে গেছে। সেই ঝকঝকে পাশ্চাত্য ফর্মাল পোশাকের বদলে পরনে তার কুর্তা-পাজামা। মাথায় ফেজ টুপি। সকলে জানলেন, সবে হজ করে ফিরেছে বোধ হয় এই 'ভদ্রলোক'।
এর পরে বেশ গুছিয়ে শুরু হল 'কাজ'। শ্রীনগরে তার যত লোকজন চেনাজানা ছিল, সকলকে এক জায়গায় করে ফেলল মাসুদ। শুরু হল অপারেশনের পরিকল্পনা। সামনে পরিচয় হজ-ফেরত মৌলবি হিসেবে, পেছনে তখন চলছে ধ্বংসের ব্লুপ্রিন্ট। প্রশিক্ষণ শিবিরে মাসুদ জঙ্গিদের বোঝাতে লাগল তারা যেন পরিকল্পনা অনুযায়ীই পা ফেলে। কোনওরকম অতিরিক্ত অ্যাজভেঞ্চারিজমের প্রয়োজন নেই।
মাসুদের গ্রেফতার
সবকিছু প্ল্যানমাফিকই চলছিল। হঠাৎ একদিন আফগানি মাসুদকে পরামর্শ দেয়, অনন্তনাগের জামিয়া মসজিদে শুক্রবার নমাজের পর যেন উত্তেজক বক্তৃতা দেয় মাসুদ। সে রাজি হয়ে যায়। তারা রওনা হয় অনন্তনাগের উদ্দেশ্যে। মাসুদ, আফগানি ছাড়াও গাড়িতে ছিল দক্ষিণ কাশ্মীরে হরকতের স্থানীয় কম্যান্ডার সিকন্দরের ডেপুটি রইস। পরে জেরায় নাকি তারা জানিয়েছিল, মাঝপথে তাদের গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। তার পর তারা নাকি একটা অটো নিয়ে অনন্তনাগের উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু অনন্তনাগে পৌঁছোনোর কিছু আগে বিএসএফ তাদের পথ আটকায়। তারা রইসকে চিনতে পেরে যায়। বাধা পেয়ে রইস প্রথমে গুলি ছোড়ে। তার পর গ্রেনেড ছুড়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। কিন্তু ধরা পড়ে যায় মাসুদ ও আফগানি।
পরে জেরার সময় মাসুদকে বাঁচানোর চেষ্টা করে আফগানি। বলে, মাসুদ নিরপরাধ। ও এক জন ধর্মপ্রাণ মৌলবী। আসলে মাসুদকে তারা কিডন্যাপ করেছে। কিন্তু জেরার মুখে পড়ে মাসুদই সব বলে দেয়।
এর পরে অবশ্য মাসুদকে মুক্ত করার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছে হরকত জঙ্গিরা। কখনও বিদেশি পর্যটককে অপহরণ করে পণবন্দি করে রেখেছে, কখনও সেনা ছাউনিতে হামলা চালিয়েছে।
শেষমেশ ১৯৯৯ আজহারকে মুক্ত করার জন্য বিমান অপরহরণ করে জঙ্গিরা। আইসি ৮১৪। সেটিকে তারা নিয়ে যায় কন্দহরে। সবটাই হয় পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। যাত্রীদের পণবন্দি রেখে মুক্তি দাবি করা হয় মাসুদ আজহারের। ওমর শেখ সঈদ, মুস্তাক আহমেদ জারগার নামে দুই জঙ্গি সহ আজহারকে পৌঁছে দেওয়া হয় কন্দহরে।
সে ঘটনার মাস খানেক আগে কোট বালওয়াল জেল থেকে পালানোর সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় আফগানি। তবে যাকে ঘিরে গোটা কাহিনীর সূত্রপাত, সেই লঙ্গরিওয়ালকে ছাড়ানোর চেষ্টা জঙ্গিরা করেনি। আরও ২০ বছর জেল খাটে সে। তার পর ২০১১ সালে মারা যায়।
ইফতিখার-সহ সে দিনের সেই সাংবাদিকেরা আজ বিস্মিত! নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দেওয়া সেই মৌলবির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এত বড় মাস্টারমাইন্ড! যাকে সামনে থেকে দেখেও আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবেনইনি কেউ! এই আপাত-নিরীহ চেহারাটাই কাল হল বলে মনে করছেন অনেকে। এই নিরীহ স্বভাবেই মুক্তি আদায় করে নেয় মাসুদ।
যার ফল, ২০ বছর ধরে তৈরি হওয়া জইশ-ই-মহম্মদ!