দ্য ওয়াল ব্যুরো: চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে এক শিঙের গণ্ডার প্রায় অবলুপ্তির পথে। কাজিরাঙা অভয়ারণ্যে প্রথমবার মিলিটারি বা ফৌজি নামানো হচ্ছে এবার। চোরাশিকারিদের হাত থেকে গণ্ডারদের বাঁচাতে, সেই মিলিটারিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে একে ৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেলও। মোট ৮২ জন মিলিটারির একটি টিম থাকছে গণ্ডারদের রক্ষা করতে। এ বছরও এখনও পর্যন্ত তিনটি গণ্ডার চোরাশিকারিদের হাতে মারা গেছে। আর যাতে এই ঘটনা না ঘটে তাই এই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই মিলিটারি গ্রুপকে বলা হচ্ছে, ‘স্পেশাল রাইনো প্রোটেকশন ফোর্স’।
অসমের কাজিরাঙা অভয়ারণ্যে বহু মানুষ আসেন শুধুমাত্র এই একশৃঙ্গ গণ্ডার দেখতে। আর সেই গণ্ডারের সংখ্যাই দিন দিন কমে যাচ্ছে। চোরাশিকারিরা পয়সার লোভে এই শিঙ কেটে নেয়, পাচার হয় চিন বা তার আশেপাশের জায়গা গুলোতে। কারণ সেখানকার মানুষরা মনে করেন, মানুষের নখ, চুলে যে প্রোটিন আছে, সেটাই গণ্ডারের শিঙে থাকে। চিন এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মানুষরা বিশ্বাস করেন, এই শিঙ থেকে ক্যানসারের ওষুধ থেকে শুরু করে জীবনের যে কোনও অভিশাপ কেটে যেতে পারে। এই শিঙ-এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি, কারণ তাঁরা মনে করেন, এই শিঙ থেকেই যৌবন ধরে রাখার ওষুধ তৈরি করা যায়!
বর্ষার জন্য আমরা যাঁরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে আছি, আমরা হয় তো জানিও না, এই বর্ষারই চোরাশিকারিদের অনেকটা সুবিধা করে দেয়। ঘাস অনেকটা লম্বা হয়ে ওঠে এসময়ে, সাথে বন্যাও হয়। কাজিরাঙায় থাকা গণ্ডারের খুব কাছে সহজেই পৌঁছে যায় চোরাশিকারিরা। তাঁরা এমন পোশাক পরে আসে, যে অত সবুজের মাঝে আলাদা করে বোঝা যায় না। এমনকি বন্যার জল বেড়ে যাওয়ায় এই অভয়ারণ্যের বাইরের দিকে চলে আসে বন্যপ্রাণীরা। ফলে সুবিধা হয় শিকারিদের। ইতিমধ্যেই ইউনেসকো ঘোষণা করেছে সারা বিশ্বে থাকা একশৃঙ্গ গণ্ডারের দুই তৃতীয়াংশই থাকে এই কাজিরাঙায়। তাই এক একটা শিঙের জন্য গরিব মানুষগুলোর মুখের কাছে যখন ১ লক্ষ ৫০ হাজার ডলার বা এক কিলো শিঙ-এর বদলে ৬০ হাজার ডলারের লোভ তুলে ধরা হয়, তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে হলেও কাজিরাঙায় পৌঁছে যান গণ্ডার মারতে।
এই অভয়ারণ্যেরই একজন রেঞ্জার বলছেন, “আমরা এই শিকার আটকাতে সবসময়েই তটস্থ থাকি। এই বর্ষাতেও আমরা সবসময়ে জঙ্গলেই থাকি, এমন কি ঘুমোইও জঙ্গলের মাঝেই। নজর রাখি চারপাশে। চোরাশিকারি এসেছে, বুঝতে পারলেই আমরা ব্যবস্থা নি। আলাদা আলাদা দলে ভাগ করে থাকি আমরা। ফলে কোথাও সমস্যা হচ্ছে শুনলে যে দল কাছে থাকি, তারা আগে পৌঁছে যাই সেখানে। বর্ষায় জল বেড়ে গেলে আমরা নৌকো করে এক একটা জায়গায় পৌঁছে দেখি সেখানে প্রাণীগুলো ঠিক আছে কি না। ”
২০১৮-র সুমারি অনুযায়ী, ৮৫০ স্কোয়ার কিলোমিটারের এই অভয়ারণ্যে এখন সব মিলিয়ে ২৪১৩ টি বন্যপ্রাণী রয়েছে। গণ্ডারের সংখ্যা লক্ষণীয় ভাবে কমে গেছে এখানে। ২০১৪-এ এখানে ২৭ টি গণ্ডারের মৃত্যু হয়েছে চোরাশিকারিদের হাতে, ২০১৫-এ সেই সংখ্যাটা ১৬ এ দাঁড়িয়েছে। তবে ২০১৭-এ ৭ এবং ২০১৮ তে সেটা ৬ এ এসে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই রেঞ্জার্সদের তৎপরতা কাজ করেছে অনেকটাই। চোরাশিকারিরা কোথাও থেকে সাহায্য তো অবশ্যই পায়, নইলে আর তারা কী করে গণ্ডারদের গতিবিধি জানবেন।
১৯০৮-এ ব্রিটিশ ভাইসরয় এই জায়গায় বেড়াতে গিয়ে কোনও হাতি, বাঘ, চিতাবাঘ দেখতে পেলেও, গণ্ডার দেখতে না পেয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তারপরই তৈরি হয় এই অভয়ারণ্য। ১৯১০ থেকেই চোরাশিকার অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে তারপরেও এই ঘটনা আটকানো যায়নি পুরোটা। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেসন অফ নেচার’ (IUCN) ইতিমধ্যেই কাজিরাঙার গণ্ডারদের লাল তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ তারা আজ প্রায় অবলুপ্তির পথে চলেছে।
এখন দেখার , ‘স্পেশাল রাইনো প্রোটেকশন ফোর্স’ এই লুপ্তপ্রায় একশৃঙ্গ গণ্ডারদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে!