দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঙালি পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযাত্রী দলের নারায়ণ সিং-এর দেহ মাকালু থেকে উদ্ধার করে এনেছিলেন দক্ষ শেরপাদের একটি দল। শুক্রবার বিকেলে সেই দলেরই এক শেরপা নিমা শিরিংয়ের মৃত্যুর খবর আসায় স্তম্ভিত নেপালের শেরপা গোষ্ঠী।
কাঠমাণ্ডুর পর্বতারোহণ আয়োজক সংস্থা জানিয়েছে নিমা শিরিং নামের ওই শেরপা ঠিক কী কারণে মারা গেলেন, তা নিশ্চিত নয়। উদ্ধারকারী দলটি ফিরে এলেই তা সঠিক ভাবে জানা সম্ভব হবে। তবে মনে করা হচ্ছে, প্রচণ্ড ক্লান্তি এবম উচ্চতাজনিত অসুস্থতা একসঙ্গে ঘটার ফলেই হয়তো অকালে প্রাণ হারালেন তিনি।
আরও পড়ুন: শেরপার দল রওনা দিল মাকালুর দিকে, খোঁজ কি মিলেছে দীপঙ্করের! উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছে বাঙালি
চলতি মাসের ১৬ তারিখে মাকালু শৃঙ্গ ছুঁয়ে নামার পথে ক্যাম্প ফোরে পৌঁছনোর খানিক আগে নিখোঁজ হয়ে যান ৫২ বছরের দীপঙ্কর। শেরপারা আন্দাজ করেছিলেন, পথেই কোনও বিপদের মুখে পড়েছেন তিনি। সে দিন ও তার পরের দিন আশপাশে খোঁজ করেও দীপঙ্করের কোনও খোঁজ পাননি তাঁরা।
আরও পড়ুন: শেরপা নেই, আবহাওয়া খারাপ! উদ্ধারকাজ নিয়ে টানাপড়েন, তুষাররাজ্যেই কি হারিয়ে গেলেন দীপঙ্কর!
ওই দিনই ক্যাম্প ফোরে পৌঁছনোর পথে মৃত্যু হয় ভারতীয় সেনার অভিযাত্রী দলের এক সদস্য, ৩৫ বছরের নারায়ণ সিংয়ের। হাই অলটিটিউড সিকনেসে প্রাণ হারান তিনি। পর্বতারোহণ আয়োজক সংস্থার তরফে জানানো হয়েছিল, দীপঙ্করকে খোঁজার ও নারায়ণকে উদ্ধার করার জন্য দল পাঠানো সম্ভব নয়, কারণ পর্যাপ্ত শেরপা নেই। বেশির ভাগ শেরপাই কোনও না কোনও আরোহণে বা কোনও উদ্ধারকাজে ব্যস্ত আছেন। আবহাওয়াও পরিষ্কার ছিল না, হেলিকপ্টার পাঠানোর মতো।
দীপঙ্কর নিখোঁজ হওয়ার পরে, তাঁর পর্বতারোহণ আয়োজক সংস্থা ‘সেভেন সামিটস ট্রেক’ শেষমেশ ২১ মে উদ্ধারকারী কপ্টার পাঠিয়েছিল মাকালুতে নিখোঁজ পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষের খোঁজে। কপ্টারটি
ক্যাম্প-৪ এর ওপরে সাদা বরফের মধ্যে একটি কালো স্পট দেখতে পায় বলে জানায়।
আরও পড়ুন: মাকালুর নীচে বরফে একটি কালো স্পট দেখেছে কপ্টার, ওখানেই কি পড়ে আছেন দীপঙ্কর!
উদ্ধারকারী দলের অনুমান ছিল , ওই কালো স্পটটিই হয়তো দীপঙ্কর! তাই ২১ মে রাতেই সাত শেরপার একটি অভিজ্ঞ দলকে ছাং দাওয়া শেরপার নেতৃত্বে একটি দলকে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এজেন্সির তরফে। কপ্টারের চিহ্নিত এলাকায় পায়ে হেঁটে দীপঙ্করকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায় দলটি।
শেষমেশ আট দিন পরে, আজ, শুক্রবার সকালে মাকালুর ক্যাম্প-ফোর এলাকায় কঠিন অভিযান চালিয়ে সাত শেরপার উদ্ধারকারী দলটি খুঁজে পায় বাংলার অন্যতম অভিজ্ঞ পর্বতারোহী দীপঙ্করের দেহ। তার পরেই বিকেলে খবর আসে, ওই উদ্ধারকারী দলেরই অন্যতম এক দক্ষ শেরপা নিমা শিরিংয়ের মৃত্যুর খবর।
আরও পড়ুন: হিমালয়ে যেন মৃত্যুমিছিল! মাকালু ও এভারেস্টে প্রাণ হারালেন এক সেনা-সহ দুই ভারতীয় আরোহী
অন্য দিকে এভারেস্টের পথে মৃত্যু হয়েছে আরও তিন ভারতীয় পর্বতারোহী। শুক্রবারই নেপাল পর্যটন দফতরের আধিকারিক মীরা আচার্য জানিয়েছেন: পুনের বাসিন্দা ২৭ বছরের নিহাল আশপাক ভগবান, মুম্বইয়ের বাসিন্দা ৫৪ বছরের অঞ্জলি শরদ কুলকার্নি এবং ওড়িশার বাসিন্দা ৪৯ বছরের কল্পনা দাস গত দু'দিনে প্রাণ হারিয়েছেন এভারেস্ট অভিযানে।
তাঁরা তিন জনেই শিখর থেকে নামার সময়ে মারা যান বলে খবর। মীরা আরও জানিয়েছেন, ১২০ জনেরও বেশি পর্বতারোহী বৃহস্পতিবার পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিলেন। কিন্তু ৮৮৫০ মিটার উচ্চতায় ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়েন তাঁরা ওঠার আগে ও পরে। তার ফলে অনেকেই ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েন। জল শেষ হয়ে যায় অনেকের। অক্সিজেনের অভাবে ভোগেন। তাতেই মৃত্যু হয় কয়েক জনের।
আরও পড়ুন: বহু আরোহী, সময় কম! এভারেস্ট ছোঁয়ার পথে বাংলার পিয়ালি, রাত পোহালেই আসবে খবর
নিহালের অভিযান সংস্থা পিক প্রোমোশন হাইকিং এজেন্সি–র কর্মী কেশব পোড়েল জানান, নামার সময়ে পর্বতারোহীদের অতিরিক্ত ভিড়ে আটকে পড়েন নিহাল। ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরে, জলের অভাবে তিনি মারা যান। অঞ্জলির অভিযান সংস্থা অরুণ ট্রেকস্ অ্যান্ড এক্সপেডিশনসের অফিসার লাপকা শেরপা জানান, এভারেস্টের সাউথ কলে ক্যাম্প ফোরে নামার সময় দুর্বলতার কারণে মৃত্যু হয় অঞ্জলির। তবে কল্পনার মৃত্যুর কারণ এখনও জানা যায়নি।
এ বছর নেপাল সরকার মোট ৩৭৯ জন পর্বতারোহীকে এভারেস্টে ওঠার অনুমতি দেয়। মার্চ থেকে শুরু হয়েছে অভিযানের মরসুম। এত বেশি আরোহীর কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যাও এ বছর বেশি এভারেস্টে। শুধু এভারেস্টে নয়। কাঞ্চনজঙ্ঘাতেও প্রাণ হারিয়েছেন তিন অভিযাত্রী, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুই বাঙালি কুন্তল কাঁড়ার ও বিপ্লব বৈদ্য। মাকালুতেও মারা গেলেন আর এক বাঙালি দীপঙ্কর ঘোষ এবং ভারতীয় নারায়ণ সিংহ।
আরও পড়ুন: আমরা চার জনেই মরে যেতাম! রুদ্রপ্রসাদের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠল পাহাড়চুড়োর আতঙ্ক
আর এক বাঙালি পর্বতারোহী, চন্দননগরের পিয়ালি বসাক এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে ২২ তারিখে শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করলেও, ট্র্যাফিক জ্যামের কারণে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। শেষমেশ অভিযান বাতিল করে নেমে আসেন তিনি। অসুস্থ বোধ করায়, ক্যাম্প টু পর্যন্ত নামলেও সেখান থেকে হেলিকপ্টারে কাঠমাণ্ডু ফেরানো হয় তাঁকে।
আরও পড়ুন: দীর্ঘতম ট্র্যাফিক জ্যাম! এভারেস্টের ৫০০ মিটার নীচে ব্যালকনি থেকে ফিরতে হল পিয়ালিকে, ফের চেষ্টা আজ
এই বছরে এভারেস্টের আবহাওয়া সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কঠিন এবং খারাপ বলে জানা গিয়েছে কাঠমাণ্ডুর আবহাওয়া অফিস থেকে। বেশ জোরে হাওয়া চলছে। তুষারঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সপ্তাহটাই ছিল মন্দের ভাল। তাই সোমবার, ২০ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে আরোহণ। মঙ্গলবার, ২১ তারিখ এভারেস্ট ছুঁয়েছেন মোট ১২২ জন মানুষ। ২২ তারিখেই সব চেয়ে ভাল আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় ওই দিন সামিট ছোঁয়ার কথা ছিল ২৯৭ জনের। তাঁদেরই এক জন আমাদের পিয়ালি। ২৩ তারিখে ওঠার কথা ১৭২ জনের। ২৪ তারিখ রাখা ছিল অল্টারনেট ডেট হিসেবে। এই তিন দিনে কারও পক্ষে সম্ভব না হলে তাঁরা চেষ্টা করবেন। ২৪-এর পরেই বন্ধ হয়ে যায় উইন্ডো।
এভারেস্ট আরোহণ করা অভিযাত্রীরা বলছেন, এত জন একসঙ্গে আরোহণ করা সত্যিই খুব মুশকিল। কারণ চুড়োয় জায়গা খুবই কম। চুড়োয় ওঠার আগে যে হিলারি স্টেপ পেরোতে হয়, সেখানটাও বড্ড বেশি সরু। একসঙ্গে অনেক জন পার হওয়া যায় না। এক জন এক জন করে নামেন বা ওঠেন। রীতিমতো ‘ট্র্যাফিক জ্যাম’ হয়ে যায় সেখানে। আর সেই জ্যামই বড় সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন...
https://www.four.suk.1wp.in/mountain-news-renowned-mountain-climber-dipankar-ghosh-dies-on-makalu-his-body-recovered/