দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফাঁসি হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের। তার পরেই সামনে এল তার অজ্ঞাতবাসের কথা। দীর্ঘ ২২ বছর আলি আহমেদ পরিচয়ে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় লুকিয়ে ছিল সে। ঘর বেঁধেছিলেন কলকাতার পার্কস্ট্রিটে। শুধু তাই নয়, তাঁর ভারতীয় পাসপোর্টও ছিল। তৈরি করেছিলেন আধার কার্ডও। সেইসঙ্গে ৩৩ বছরের ছোট জরিনা বিবিকে বিয়ে করে রীতিমতো 'সুখে' সংসার করছিল মাজেদ। তার ছ'বছরের কন্যাসন্তানও রয়েছে। সুদের ব্যবসা ও টিউশনি করে বেশ কাটাচ্ছিল জীবন। সব দিক থেকে অন্য মানুষ হিসেবে নিজের আসল পরিচয় মুছে ফেলেছিল সে। মুশকিলটা হল, বাংলাদেশে ফোন করতে গিয়ে। সেই সূত্রেই ধরা পড়ে গেল এত বছর ধরে আত্মগোপন করে থাকা খুনি মানুষটি।
আশ্চর্যের বিষয় হল, ১০ বছরের বিবাহিত স্ত্রী জরিনাও টের পাননি এসবের বিন্দুবিসর্গ। দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, তাঁর ৭৩ বছরের বৃদ্ধ স্বামী আদতে আত্মগোপন করে থাকা এক খুনি! ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখে পার্কস্ট্রিটের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় আলি আহমেদ। ওষুধ কিনতে বেরিয়ে আর ফেরেনি। ফোনও সুইচড অফ। জরিনা কিছু বুঝতে না পেরে স্থানীয় থানায় নিখোঁজ ডায়েরিও করান। একেবারেই সাধারণ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যা করা উচিত।
কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজিদের গ্রেফতারির খবর পেয়ে। কারণ সে খবরের সঙ্গে যে ছবি ছাপা হয়েছে, তা তো তাঁর ঘরের মানুষের! আলি আহমেদ বলে যাঁর সঙ্গে ১০ বছর ধরে বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি! এই মানুষটারই ফাঁসি হবে! সমস্ত ঘটনা জানার পরে কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে যান তিনি। অসুস্থও হয়ে পড়েন। জ্ঞান হারাতে থাকেন বারবার।
জরিনা পরে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আলি আহমেদের যখন ৬৪ বছর বয়স, তখন সে বিয়ে করেছিল জরিনাকে। জরিনার বয়স তখন ৩১। উলুবেড়িয়ার গ্রামের মেয়ে তিনি। বছর কয়েক আগে প্রথম বিয়ে হলেও, বিধবা হন অল্প সময়ে। কোলে তখন ছোট সন্তান। ফিরে আসেন বাপের বাড়িতে। গরিব পরিবারে কোনও রকমে দিন গুজরান। প্রতিবেশীর সূত্রে সম্বন্ধ আসে আলি আহমেদের। বাড়ির লোকজন দেরি করেননি। জরিনাকে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে দেন ৬৪ বছরের আলি আহমেদের সঙ্গেই। ভাল করে খোঁজখবর নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি কেউ।
জরিনা বলেন, "ও খুব চুপচাপ থাকত। একেবারেই বেশি কথা বলত না। বিয়ের পরে আমি কয়েক বার ওর গ্রামের কথা জানতে চেয়েছিলাম, জানতে চেয়েছিলাম বাড়িতে কে কে আছেন। ও রেগে যেত। আর বেশি কিছু কখনও বলিনি আমি। বিয়ের আগে বাড়িতে জেনেছিল, ও ধর্মীয় মানুষ এবং ভালই রোজগার করে। আর কোনও খোঁজ না নিয়েই আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় সাততাড়াতাড়ি। আমি বিয়ের পর থেকেই দেখছি, নিয়ম করে পাঁচ বার নমাজ পড়ত ও। সমস্ত ধর্মীয় আচার পালন করত মন দিয়ে। কথা বলত না বিশেষ।"
আলি আহমেদের আসল পরিচয় জানার পরে সাড়া পড়ে গিয়েছে উলুবেড়িয়ায় জরিনার বাড়ির এলাকাতেও। কেউই ভাবতে পারছেন না, তাঁদের চেনা মেয়েটি এত বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর খুনির সঙ্গে ঘর করেছে!
জরিনার দাদা নাজিমুদ্দিন মল্লিক বলেন, "আমরা খুব গরিব, সে জন্যই বাড়ির মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাই। কী যে ভুল হয়েছিল... আমার বোনের কপালটাই খারাপ। ওর প্রথম স্বামী মারা যান অসুখে ভুগে। বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল বোন। বছর দুয়েকের মধ্যেই সম্বন্ধ এল আর একটা। পাত্রের বয়স বেশি, কিন্তু পেশায় শিক্ষক। রোজগার ভাল। এই শুনে আমরাও আর তেমন সময় নিইনি। ৮ তারিখের কাগজে আসল খবর জেনে আমাদের হাড় হিম হয়ে গেছে।"
১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট শেখ মুজিবর রহমানকে বাড়ির ভিতরে ঢুকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও মেরে ফেলা হয়। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের গবেষক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ডঃ কুন্তল মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘বাংলার ধনুক’ বইতে লিখেছিলেন, গান্ধীজিকে হত্যার পর মুজিবের হত্যাই একুশ শতক পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে নৃশংস রাজনৈতিক হত্যা।
জিয়াউর রহমানের আমলে তাঁর খুনিদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে সরকারি চাকরিতে উচ্চ পদে বসানো হয়েছিল সেই খুনিদেরই। আবদুল মাজেদ তার ব্যতিক্রম ছিল না। ক্যাপ্টেন মাজেদ হয়ে সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্তা হিসেবে যোগ দেয় সে। তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় ফেরার পরে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়। বিপদ বুঝে সে সময় গা ঢাকা দেয় একদা সেনাবাহিনীর কর্তা আবদুল মাজেদ।
এর পরে বিচারে অভিযুক্ত সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদকে ফাঁসি দেওয়া হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি।
মাজেদ এপার বাংলায় ভালই ছিল একরকম। সম্পূর্ণ ভাবে বদলে ফেলেছিল পরিচিতি। ২০০৭ সালে একটি পাসপোর্ট বানায় সে। বানায় আধার কার্ডও। তার পরে ঠিক তথ্য দিয়ে আরও একটি পাসপোর্ট বানায় ২০১৭ সালে। সবেতেই নাম-পরিচয় আহমেদ আলির। দুটো পাসপোর্টেই অবশ্য স্ত্রীর নাম রয়েছে সালেহা বেগমের, যিনি ১৯৪৭ সালে জন্মেছেন বলে লেখা রয়েছে। তবে এত কিছু করেও শেষরক্ষা হল না। গত মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছে সে।
২১ ফেব্রুয়ারি পার্কস্ট্রিটের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরে, ডায়েরি পেয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সিসিটিভি-তে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠে পড়েছে মাজেদ। সঙ্গে ছিল আরও চার জন। সন্দেহ ঘনায় তখনই। বেরিয়ে আসে নানা সূত্র। জানা যায়, কলকাতায় থাকার সময় প্রতিদিন দু'টি নম্বর থেকে সে নিয়মিত ফোন করে বাংলাদেশে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের অনুমান, বাংলাদেশে থাকা মাজেদের পরিবারের সদস্যদের ফোনে নিয়মিত আড়ি পাতত গোয়েন্দারা।
৬ এপ্রিল, সোমবার মধ্যরাতে ঢাকার গাবতলী এলাকা থেকে মাজেদকে গ্রেফতার করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ। পরের দিন তাকে আদালতে তোলা হয়। মুজিবের খুনিদের মধ্যে যারা অধরা তাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায়, যখনই ধরা পড়ুক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। মাজেদকে আদালতে তোলা হলে ঢাকা আদালতের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফাঁসির সাজা বহাল রাখেন। এরপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানায় মাজেদ। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবন সেই আর্জি খারিজ করে দেয়। তারপরই ফাঁসির দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে আদালত।
বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী শনিবার ১২টা এক মিনিটে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয় মাজেদকে।