দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার এবং ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ। ডিসেম্বরের এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বারবার বিরোধিতা করতে দেখা গেছে তাঁকে। তিনি তরুণr নেত্রী সফুরা জারগর। তিনিই আন্দোলনের মাধ্যমে দিল্লি হিংসায় ইন্ধন জুগিয়েছেন, এই অভিযোগে গত ১০ এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশ।
এই সময়ে সফুরা অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়। ৩ মাসের সন্তান পেটে নিয়েই জেল যেতে হয় আদতে কাশ্মীরের মেয়ে সফুরাকে। এর পরেই মানবিকতার কারণে ও স্বাস্থ্যের কারণে তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়াতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় বারবার। কিন্তু দিল্লি পুলিশ তার অবস্থানে অনড়। হাইকোর্টে তাদের বক্তব্য, কেবল অন্তঃসত্ত্বা বলেই যে কোনও অপরাধীকে জামিন দিতে হবে, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
এই নিয়ে তিন-তিন বার সফুরার আর্জি খারিজ করেছে দিল্লির পটিয়ালা হাউস আদালত। এখন মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। সেখানে জামিন খারিজ করার সপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সোমবার দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কারাবাস কোনও নতুন ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ১০ বছরে দিল্লির তিহাড় জেলে ইতিমধ্যেই ৩৯ জন মহিলা সন্তান প্রসব করেছেন। তাঁদের সন্তানের জন্মে কোনও অসুবিধা হয়নি, আইন আইনের পথে চলেছে। তাই কেবল গর্ভবতী বলেই কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ লঘু হয়ে যায় না, তাঁর জামিনও প্রাপ্য হয়ে যায় না।
চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা সফুরা এখন তিহাড় জেলে বন্দি রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন অর্থাৎ ইউএপিএ প্রয়োগ করা হয়েছে। দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্টের জামিন খারিজের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টে নতুন করে সফুরার জামিনের আর্জি জানিয়েছিলেন সফুরার আইনজীবী। সেখানেই সোমবার সফুরাকে নিয়ে রিপোর্ট জমা দেয় দিল্লি পুলিশ। তাতে বলা হয়, "অপরাধ করে গ্রেফতার হলে এবং জেলে বন্দি হলে কেউ গর্ভবতী বলেই যে মুক্তি দিতে হবে, এমন কোথাও বলা নেই সংবিধানে। জেল হেফাজতে থাকাকালীন অন্তঃসত্ত্বাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার সুবিধার কথা বলা রয়েছে।"
জামিয়া মিলিয়ার গবেষক সফুরা ‘জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটি’রও সদস্যা। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে লোকসভায় পাশ হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। তার পরেই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। রাজধানী দিল্লিও বিশাল প্রতিবাদের স্বাক্ষী থাকে। সেই সময়েই প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটির সদস্যরাও। সেই প্রতিবাদেই সামিল ছিলেন সফুরাও। এর পরেই ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে রাজধানী দিল্লি। কার্যত দাঙ্গা বেঁধে যায় বেশ কিছু অঞ্চলে। পুলিশের অভিযোগ, এই দাঙ্গায় একজন ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত সফুরা। এর পরেই ১০ এপ্রিল তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সফুরাকে সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে।
১৩ এপ্রিল অবশ্য জামিন পান সফুরা। কিন্তু আদালত চত্বর থেকে বেরোনোর আগেই ফের বন্দি করা হয় তাঁকে। ১৫ এপ্রিল পাঠানো হয় তিহাড়ে। এর পরেই অভিযোগ ওঠে, তিহাড় জেলে অসংখ্য বন্দি রয়েছে। জনবহুল এই কারাগারে এই অবস্থায় এক জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার থাকা রীতিমত চিন্তার বিষয়। ইতিমধ্যেই অনেক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমনই অবস্থায় ২০ এপ্রিল সফুরার বিরুদ্ধে দাঙ্গা, অস্ত্র দখল, হত্যার চেষ্টা, হিংসা ছড়ানো, রাষ্ট্রদ্রোহিতা নিয়ে প্রায় ১৮টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে!
যদিও সফুরার বিরুদ্ধে আনা ষড়যন্ত্র করে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগের এখনও কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি পুলিশ। এই অবস্থায় করোনা মহামারির আবহে অন্তঃসত্ত্বা সাফুরাকে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক বলে একাধিক জায়গা থেকে আবেদন আসছে। এমনকি বুদ্ধিজীবিরাও এই নিয়ে চিঠি দিয়েছিনে কেন্দ্রীয় সরকারকে। অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর বন্দি থাকা নিয়ে সরব হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াও।
কিন্তু এসব কোনও যুক্তিই শুনতে রাজি নয় দিল্লি পুলিশ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে জেলের মধ্যে তাঁদের প্রসবের সবরকম ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। তাদের কথায়, "গত ১০ বছরে ৩৯টি ডেলিভারি হয়েছে দিল্লির এই জেলে। ফলে সফুরা জারগারকে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে বা মুক্তি দিতে হবে, এমনটা কোনও যুক্তির কথা নয়। তার উপর সফুরার বিরুদ্ধে অভিযোগ মোটেই লঘু নয়, তাঁর কাজকর্মের জেরে প্রাণহানি এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।"
পুলিশ দাবি করেছে, সফুরার স্বাস্থ্যের বিষয়টি কোনও ভাবেই সমস্যার মুখে পড়ছে না। জেলের মধ্যে সফুরাকে আলাদা কুঠুরিতে রাখা হয়েছে। পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে তাঁকে, চিকিৎসক এসে নিয়মিত দেখেও যাচ্ছেন।