
শেষ আপডেট: 8 May 2019 06:32
করবেনই বা কেন! হেমা বলছেন, "খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র-- এই তিনটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রধানতম প্রয়োজনীয় জিনিস। এক সময় পৃথিবীতে বিদ্যুৎ ছিল না। তখনও মানুষ বেঁচেছিল সুন্দর ভাবে। আমি এখনও ম্যানেজ করতে পারি সে ভাবেই। কোনও অসুবিধা হয় না।"
তবে হেমা একা নন। তাঁর সঙ্গে রয়েছে একটি কুকুর, দু'টি বিড়াল, একটি বেজি এবং অসংখ্য পাখি। হেমা জানালেন, তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। কিছুই বা কেউ-ই আলাদা করে তাঁর নিজের নয় এই পৃথিবীতে। তিনি যে বাড়িটায় এবং যে জায়গাটা জুড়ে থাকেন, সেগুলি আসলে প্রকৃতিরই সম্পদ, যার মালিক ওই না-মানুষ প্রাণীগুলি। "সবই তো প্রকৃতির, সবই ওদের। আমি কেবল দেখাশোনা করি।"-- বলেন তিনি।
পুণের সাবিত্রীবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বটানিতে পিএইচডি করেছিলেন হেমা। তার পরে দীর্ঘ কয়েক বছর পড়িয়েছেন পুণেরই গারওয়ারে কলেজে। কিন্তু বটানি কেবল তাঁর পড়ার বা পড়ানোর বিষয় ছিল না, বটানিই তাঁর জীবন ছিল। তাই তো বরাবরই ছোট্ট এক কুঁড়েতে বাস করেন হেমা। সেই কুঁড়ে ঘিরে রেখেছে অসংখ্য গাছ। গাছ ভরা পাখিরা তাঁর সারা দিনের সঙ্গী। সন্ধে হলেই সে কুঁড়েতে জ্বলে মাটির পিদিম। গাছে ঘেরা থাকায়, গ্রীষ্মের তাপ প্রবেশ করে না ঘরের ভিতর। আক্ষরিক অর্থেই যেন 'ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়' তাঁর।
তবে এরকম আরণ্যক জীবন কাটালেও, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে তিনি বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁর লেখা বেশ কিছু বই বটানি-জগতের পাঠ্য। এখনও দিনভর অবসরে খাতা-কলম নিয়ে সময় কাটান তিনি। লেখেন প্রকৃতির বিষয়ে একের পর এক বই। অনেকেই বলেন, প্রকৃতির প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে হেমার মতো জ্ঞান খুব কম মানুষেরই আছে। তিনি যেন কথা বলতে পারেন গাছেদের সঙ্গে, প্রাণীদের সঙ্গে।
হেমা বলছিলেন, "আমায় সবাই বোকা বলে। পাগল বলে। হয়তো আমি পাগলই। কিন্তু কিছু এসে যায় না তাতে আমার। আমি অনেকের চেয়ে অনেক ভাল আছি। এবং আমার যেমন খুশি তেমন বাঁচার অধিকারও আছে।" তিনি আরও বলেন, "আমি কখনও অনুভবই করিনি, যে আমার জীবনে বিদ্যুতের কোনও প্রয়োজন আছে। আমায় অনেকেই জিজ্ঞেস করে, আমি কী করে আছি বিদ্যুৎ ছাড়া। আমি তাদের পাল্টা প্রশ্ন করি, তারা কী করে সব জানার পরেও এত বিদ্যুৎ-নির্ভরশীল হয়ে আছে?"
কী জানার কথা বলছেন হেমা? বলছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কথা। প্রকৃতির ফুসফুস কালো হয়ে যাওয়ার কথা। এত দূষণ, এত ক্ষতি জেনেও কী ভাবে মানুষের মতো বুদ্ধিমান একটি প্রজাতি জেনেশুনে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত, তা বুঝতে পারেন না হেমা। "আমি বলছি না, সকলকে আমার মতো করে ভাবতে হবে বা বাঁচতে হবে। কিন্তু কই, কোনও সচেতনতা তো দেখি না কারও মধ্যে!"-- বলেন তিনি।
"এই পাখিরা আমার বন্ধু। রোজ জানলায় এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। আমায় সবাই বলে, আমি এই বাড়-জমি বিক্রি করে দিই না কেন। বলে, আমি অনেক টাকা পেতে পারি এগুলো বিক্রি করলে। কিন্তু বিক্রি করে দিলে এই গাছ-পাখিগুলোর দেখাশোনা কে করবে? তা ছাড়া আমি তো এদের ছেড়ে অন্য কোথাও যেতেই চাই না। আমি তো এদের সঙ্গেই খুব ভাল আছি।"-- ভাল থাকার সহজপাঠ আরও সহজ করে বুঝিয়ে দেন হেমা।
তবে প্রকৃতি রক্ষার জন্য মানুষদের আলাদা করে কোনও বার্তা দিতে চান না হেমা। তিনি বলেন, "আমি আর কী শেখাব, আমি তো এখনও শিখছি।" তাঁর শেখার মূলমন্ত্র হিসেবে, উচ্চারণ করেন গৌতম বুদ্ধের বিখ্যাত উক্তি। "নিজের বেঁচে থাকার পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।" যেমনটা খুঁজে নিয়েছেন হেমা, প্রকৃতির মাঝে।