
শেষ আপডেট: 16 July 2022 06:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো, হুগলি: লাল রঙের হোর্ডিং (Hoarding)। তাতে সুস্পষ্ট সাদা হরফে লেখা, 'লাইন মারতে শিখুন!' সাবওয়ের মাথায় সাতসকালে এমন দৃশ্য দেখেই চক্ষু চড়কগাছ! কিছুটা এগোতেই আবার চমক। এবার স্টেশনের ঠিক সামনে। দ্বিতীয় হোর্ডিংয়ের বক্তব্য, 'লাইনে ঢুকতে টিপুন!' শুধু স্টেশনের সামনেই নয়, ব্যান্ডেল (Bandel) স্টেশনের আশপাশ, এমনকী চুঁচুড়ার বহু জায়গায় এমন সব হোর্ডিং দেখে হতভম্ব আমজনতা।
কোনওটায় লেখা, 'লাইনে ঢুকুন দাদা!' তো কোনওটায় আবার এককাঠি এগিয়ে লেখা, 'নিখরচায় লাইন মারুন!' শুক্রবার সকালে রাতারাতি এমনই হোর্ডিংয়ে ছেয়ে গেল ব্যান্ডেল স্টেশন চত্বর। শুধু ব্যান্ডেলই নয়, একই হোর্ডিংয়ে ছেয়ে গেছে চুঁচুড়া, এমনকী বারাসাতও। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, কোনও কিছুর বিজ্ঞাপনী চমক। টিজার আর কী। কিন্তু কীসের টিজার, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে যারই বিজ্ঞাপন হোক, নজরে পড়তেই অনেকেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, এই ধরনের বিজ্ঞাপন ঠিক শালীন নয়।
ঠিকই কথা। চটুল আড্ডায় এই জাতীয় শব্দবন্ধ অপরিচিত না হলেও বাঙালির চিরাচরিত মার্জিত সংস্কৃতিতে ঠাঁই নেই এমন সব শব্দের। তাতেই তৈরি হচ্ছে বিতর্ক। হলই বা বিজ্ঞাপনী চমক, কিন্তু তার ভাষা কি শালীনতার মাত্রা ছাড়াতে পারে? বেশিরভাগেরই উত্তর, 'না।' শহরের সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের দাবি, এই ধরণের 'ডাবল মিনিং' জোক হোয়াটসঅ্যাপে 'নন ভেজ' মেসেজ হিসাবে বন্ধুদের মধ্যে চলতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্য রাস্তার বড় মাপের হোর্ডিংয়ে এমন দ্বৈত অর্থপূর্ণ শব্দ? 'রাস্তা দিয়ে সব বয়সি মানুষ যায়, ছোটরা কী শিখবে?' প্রশ্ন স্থানীয়দের।
এই ধরনের ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়, দাবি ব্যান্ডেলে নাট্য চর্চার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত রঞ্জন রায়ের। বিজ্ঞাপন হবে সুস্থ রুচির, এমনটাই মনে করেন তিনি। 'আমি একজন নাটকের জগতের ব্যাক্তি হিসাবে, একজন মানুষ হিসাবে, একজন পিতা হিসাবে এর তীব্র নিন্দা করছি। বেশ কিছু দিন ধরে সমাজের ভাষার পরিবর্তন হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও মুখের ভাষা বদলে গেছে। তার প্রভাব পড়ছে সমাজে। বর্তমান প্রজন্ম জানে না কোথায় কোন ভাষা ব্যবহার করতে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় নজর দেয় না, পাশ দিয়ে কোনও মা তার মেয়ে বা ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে। এটা যদি বিজ্ঞাপন হয়ে থাকে, তবে সব মানুষের এর প্রতিবাদ করা উচিত,' দাবি রঞ্জনবাবুর।
'আমি বাংলা ভাল করে পড়তে পারি না। তবে পড়ে ভাবছি, আমি ঠিক পড়তে পারছি কিনা!' এতখানিই হতবাক ব্যান্ডেল গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রীতু সিং। তাঁর আরও দাবি, 'মনে হয়েছে এই ধরনের শব্দ ব্যবহার না করাই ভাল। একটা স্টেশন বা সাধারন মানুষের যাতায়াত যেখানে, সেখানে মহিলা বাচ্চাদের মধ্যে প্রভাব পড়বে। এমন কিছু করা উচিত নয়, যাতে সমাজের ভাবনা খারাপ হয়ে যায়। আশা করব কোনো বিজ্ঞাপন দেবার আগে ভাবা হবে।'
গতকালই লোকসভার সচিবালয় অসাংবিধানিক শব্দের নতুন তালিকা প্রকাশ করেছে। তা নিয়ে তোলপাড় হয়েছে রাজধানী দিল্লি। তার মধ্যেই হুগলি জেলার জনবহুল জায়গায় এমন হোর্ডিং নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। তবে এই প্রথমবার নয়। এর আগেও একাধিক বিজ্ঞাপনী প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে একই ধরনের কৌশল। সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গাপুজোর বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেন। সারা শহর ছেয়ে গিয়েছিল একটি হোর্ডিংয়ে, যাতে লেখা- 'এত বড়! সত্যি?' সেবারেও চমকেছিল বাঙালি। পরে জানা গিয়েছিল, বিশালকার দুর্গাপ্রতিমার টিজার সেটি। তবে সফল হয়েছিল বটে এহেন চমক। সেবার উপচে পড়া ভিড় হয়েছিল দেশপ্রিয় পার্কের পুজোয়। আশির দশকেও একটি সর্ষের তেলের বিজ্ঞাপনের পোস্টার পড়েছিল, যেখানে লেখা ছিল, 'মাত্র ২৮ টাকায় গলানো সোনা কিনুন।'
তবে বিতর্ক থাকুক বা না থাকুক, এই ধরনের প্রচারের চমক যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ঠিক যেমন বিতর্ক সত্বেও চোখে পড়ার একদিনের মধ্যেই ব্যান্ডেলের আমি-আদমির মুখে মুখে ঘুরছে নয়া এই হোর্ডিংয়ের কথা।