বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম: পাহাড়ের ঢালে বেলপাহাড়ির শিমূলপাল, ঢাঙ্গীকুসুম, কালিডাঙা, বিরমাদলের মতো আরও বহু গ্রাম। কান পাতলেই সেখান থেকে ভেসে আসে পাথরের গায়ে ছেনি হাতুড়ির ছন্দোবদ্ধ শব্দ। আসলে গ্রামগুলি যে শিল্পীদের। পাথর শিল্পীদের।
অতীতে পাহাড় থেকে পাথর আনার ক্ষেত্রে নানান সমস্যায় পড়তে হত। কিন্তু এখন পাথর শিল্পীদের জন্য পাহাড় থেকে পাথর আনায় কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। পাথরের থালা, বাটি, গ্লাস, চাকি, নানা দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করে দিব্যি কাটত দিন। বড় শহর থেকে আসতেন ব্যবসায়ীরা, শিল্পীদের ঘর থেকে দাম দিয়ে কিনে নিয়ে যেতেন তাঁদের নানা শিল্পকর্ম। বেলপাহাড়িতে ঘুরতে আসা মানুষজনও কিনে নিয়ে যেতেন শিমূলপাল, বিরমাদলের শিল্পীদের হাতে তৈরি নানান সামগ্রী।
কিন্তু করোনা আসতেই অন্ধকারের গ্রাসে গোটা তল্লাট। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে থমকে গিয়েছে বেলপাহাড়ির পাথর শিল্পীদের জীবন। বন্ধ হাট বাজার, মাল কিনতে আসছে না ব্যবসায়ীরা। গ্রামে ঘুরে ঘুরে ফেরি করাও বন্ধ। কপালগুণে কোনওদিন যদিও বা ক্রেতা মেলে তখন তৈরি করা পাথরের জিনিসপত্র জলের দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এই আকালে অনেকেই পেটের দাবিতে পেশা বদলে নিয়েছেন। তাই কান পাতলেও ছেনি-হাতুড়ির গান বড় একটা আর শোনা যায় না এখন। ঢাঙ্গীকুসুম গ্রামের সাত থেকে আটটি পরিবার ও শিমূলপালে পাঁচটি পরিবার পাথরের কাজ করছে। কালিডাঙায় একটি মাত্র পরিবার এখনও টিকিয়ে রেখেছেন পাথরের কাজ। বাকিরা সবাই সরছেন অন্য পেশায়।
https://www.youtube.com/watch?v=5VuhbK3Yemo&feature=youtu.be
পাথরশিল্পী মনসা মিস্ত্রি, সনু মিস্ত্রিরা জানান, প্রত্যেকবার দুর্গাপুজোর আগে তাঁদের বেশ ভালো আয় হয়। পাথরের তৈরি জিনিসের বিক্রি বহু গুণ বেড়ে যায়। কলকাতা, বাঁকুড়া, বীরভূম, দুর্গাপুর, সবং এবং ঝাড়খণ্ডের টাটা থেকে পুজোর আগে ব্যবসায়ীরা এসে পাথরের জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যান। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য গত কয়েকমাসে কোনও ব্যবসায়ীর দেখা নেই। তাই কীসের ভরসায় ছেনি-হাতুড়ি ঠুকে পাথরে প্রাণ দেবেন তাঁরা?
পাথর শিল্পীদের সংগঠনের সভাপতি নব মিস্ত্রী বলেন, লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে পাথরের তৈরি জিনিসের বিক্রি প্রায় বন্ধ। পেটের তাগিদেই এখানকার শিল্পীরা এখন অন্য কাজ করছেন। আমিও অনেক জিনিস তৈরি করা বন্ধ করে দিয়েছি। কেবলমাত্র অর্ডার পেলে তৈরি করছি। তাও হাতে গোনা দু’একটি। কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। জমি জায়গা নেই যে চাষ করব। রেশনের চাল না পেলে বাড়ির উনুনও জ্বলত না।’’