দ্য ওয়াল ব্যুরো, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: কনকচূড় ধানের খই, খেজুর গুড় আর গাওয়া ঘিয়ের মনকাড়া স্বাদ। এ সবই মিলেমিশে একাকার। সেই কবে মিলিয়ে দিয়েছিলেন যামিনীখুড়ো। বাঙালির শীতকালের দখল নিতে তারপর আর সময় লাগেনি বিশেষ।
জয়নগরের মোয়াকে নিয়ে যেমন রোম্যান্টিকতার শেষ নেই, তেমনই শেষ নেই গল্প কথারও। জয়নগর এলাকার বহরু গ্রামের জনৈক যামিনীখুড়ো পরিবারের এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজের খেতের কনকচূড় ধানের খই ও নলেন গুড় গাওয়া ঘিয়ে পাক দিয়ে তৈরি করেছিলেন মোয়া। সে মোয়া খেয়ে ধন্য ধন্য করে উঠেছিলেন অভ্যাগতরা। সেই নাকি শুরু।
পরবর্তীতে জয়নগরের মোয়া প্রস্তুতকারকরা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে শুরু করেন এই মোয়া তৈরি। তবে জয়নগর এলাকার বাসিন্দা পূর্ণচন্দ্র ঘোষ ওরফে বুঁচকিবাবু আর নিত্যগোপাল সরকারকেই জয়নগরের মোয়ার বাণিজ্যিক বিপণনের পথিকৃৎ বলে ধরা হয়। সালটা ১৯২৯। বুঁচকিবাবু এবং নিত্যগোপালবাবু তৈরি করেন মোয়া তৈরির কারখানা। খোলেন দোকানও। তারপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া।
কিন্তু ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই জয়নগরের মোয়ার মান নিয়ে এখন শুধুই হতাশা এই মোয়ার আসল কারবারীদের। তার কারণও একাধিক। মোয়ার মানের সঙ্গে আপস করতে না পেরে এখন অনেকটাই পিছু হটছেন তাঁরা।
রসনা সিক্ত করা জয়নগরের মোয়ার প্রধান উপাদানই হল কনকচূড় ধানের খই, নলেন গুড় ও গাওয়া ঘি। এছাড়াও ক্ষীর, পেস্তা, কাজুবাদাম, কিসমিস ও পোস্ত ব্যবহার করা হয়। জেলার কুলপি, কাকদ্বীপ ও নামখানা সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ১৫০ একর বিঘা জমিতে কনকচূড় ধানের চাষ হয়। নলেন গুড়ের উৎস খেজুর গাছ। শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন শিউলিরা। সব চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের রস পাওয়া যায় জিরেন কাঠ থেকে। এই জিরেন কাঠ হল যে খেজুর গাছকে কয়েকদিন বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে এমন গাছ। জিরেন কাঠ থেকে রস সংগ্রহ করে তিন দিন রাখা হয়। সেই রস ঢিমে আঁচে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় উৎকৃষ্ট মানের সুগন্ধী গুড়। যা কিনা নলেন গুড় নামে বিখ্যাত। এই সবকিছু ঠিকভাবে মিললে তবেই নাকি মেলে মোয়ার আসল স্বাদ। কিন্তু এই উপাদানগুলিই এখন দুর্লভ হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে।
জয়নগরের মোয়া শুধুমাত্র কনকচূড় ধানের খই দিয়েই তৈরি করার নিয়ম যা এখন আর তেমনভাবে মেলে না। খেজুর গাছের সংখ্যাও কমে গেছে। এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সেই কারণে এই মোয়া তৈরিতে সব নকল জিনিস ব্যবহার করা হয়। জয়নগরের মোয়ার সেই ঐতিহ্যকে হাতিয়ার করে বাজার দখল করেছে সস্তা দামের নকল জয়নগরের মোয়া। যার ফলে জয়নগরের মোয়ার ঐতিহ্যই হারিয়ে যেতে বসেছে। তাঁরা বলেন, ‘‘শীত পড়তেই রাজ্যের বিভিন্ন বাজার হাটে এবং শহরের দোকানে বড় বড় সাইনবোর্ড লেখা হয় ‘এখানে আসল জয়নগরের মোয়া পাওয়া যায়।’ কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোয়ায় নলেন গুড়ের পরিবর্তে থাকে রাসায়নিক সুগন্ধী। কনকচূড় ধানের বদলে অন্য কোনও সস্তা ধানের খই। ফল যা হওয়ার তাই। স্বাদে আকাশ-পাতাল ফারাক। অসাধু ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে নকল জয়নগরের মোয়া তৈরি হচ্ছে খোদ এই মোয়ার জন্মের প্রাণ কেন্দ্র জয়নগর ও তার পাশাপাশি ক্যানিং, বাসন্তী, গোসাবা, মথুরাপুর, বারুইপুর, সোনারপুর-সহ প্রায় সর্বত্র। সুন্দর প্যাকেটে এই নকল মোয়া পাড়ি দিচ্ছে দেশের অন্যান্য রাজ্যে।
আসল জয়নগরের মোয়া প্রস্তুতকারীদের মতে নকল জয়নগরের মোয়ার স্বাদ, আসল মোয়ার ধারে কাছেও নয়। তাছাড়াও সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ার কারণে এই নকল মোয়া বাজার দখল করে নিচ্ছে। সেই কারণে সাধারণ ক্রেতারা প্রকৃত জয়নগরের মোয়ার স্বাদ পাচ্ছেন না। ঐতিহ্যবাহী প্রকৃত জয়নগরের মোয়ার সুনাম নষ্ট হচ্ছে। নাম ধরে রাখলেও সবার অলক্ষ্যে উধাও হচ্ছে মোয়ার সেই আসল স্বাদ।