দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: এবার করোনার থাবা ঝুলন উৎসবেও। গোটা দেশে লাগাতার লকডাউনের পরেও আটকানো যায়নি সংক্রমণ। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। তাই ফের শুরু হয়েছে লকডাউন। তবে আর টানা নয়। যখন যেমন দরকার তেমনই লকডাউন চলছে বিভিন্ন জায়গায়। তাই এবার রথের পর বর্ধমানের লক্ষীনারায়ণ জিউ মন্দিরে বন্ধ হল ঝুলন উৎসবও। রীতি মেনে শুধু পুজো হবে। কিন্তু উৎসব হবে না। গোটা শহরেই কোভিডের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাই শহরের লক্ষীনারায়ণ জিউ, রাধাবল্লভ মন্দির ও সর্বমঙ্গলা পাড়া যেখানে যেখানে ঝুলনের আড়ম্বর হয়, মেলাও বসে, সে সব জায়গায় এ বার সব বন্ধ।
একই অবস্থা গোটা পূর্ব বর্ধমান জেলাতেই। ঝুলন উৎসব স্থগিত হয়ে যাওয়ায় হতাশ দক্ষিণ দামোদরের বাসিন্দারাও। আষাঢ় মাসে রথযাত্রার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় দক্ষিণ দামোদরের খণ্ডঘোষ ব্লকের মেটেডাঙা গ্রামে ফ্রেন্ডস ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী ঝুলন উৎসবের প্রস্তুতি। আমন ধান রোপণের পরেই এই উৎসবে মেতে ওঠেন এলাকার মানুষজন। রাখী পূর্ণিমার দু'দিন আগে থেকে ঝুলন উৎসব শুরু হয়। শ্রাবণ মাসের শুক্লা দশমী তিথিতে ভরা বর্ষায় অন্ধকারে আলোকমালায় সাজানো হয় ঝুলনের দোলনা। তিনদিনের এই উৎসবকে ঘিরে সেজে ওঠে গ্রামগুলি।
দক্ষিণ দামোদরের ঐতিহ্যবাহী ঝুলন উৎসবের সেই চেনা ছবি এবার আর দেখা যাবে না। ঝুলন কমিটির পক্ষ থেকে এবছর করোনা আবহে ২২তম বর্ষের ঝুলন উৎসব স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঝুলন উৎসবের অন্যতম উদ্যোক্তা রনি দালাল বলেন, ‘‘এই অতি মহামারির সময়ে সরকারি বিধিনিষেধ মেনে, হাজার হাজার দর্শনার্থীর স্বাস্থ্যের সুরক্ষার কথা ভেবে এই বছর ঝুলন উৎসব বন্ধ রাখা হয়েছে।'
২২ বছর ধরে চলে আসছে খণ্ডঘোষ থানার মেটেডাঙা গ্রামের ফ্রেন্ডস ক্লাবের পরিচালনায় ঝুলন উৎসব। বিষ্ণুপদ মিশ্র এই গ্রামে কচিকাঁচাদের নিয়ে প্রথম ঝুলন উৎসব শুরু করেন। নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ,প্যান্ডেল আর সং সাজিয়ে যে উৎসবের শুরু হয়েছিল তা ক্রমশ দক্ষিণ দামোদরের অন্যতম ঝুলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দর্শনার্থীরা দীর্ঘ পথ হেঁটে সমবেত হন ঝুলন উৎসবের মাঠে। মেটেডাঙা গ্রামের সব ধর্মের মানুষই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি জানান ‘‘এ বার ঝুলন উৎসব বন্ধ হওয়ায় আমরা হতাশ। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হত। মেলায় পসরা নিয়ে আসা দোকানদারেরা বিক্রিবাটা করে কিছু আয় করতেন। করোনার জন্য সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল।’’
মেটেডাঙা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জায়গায় ঝুলন উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসে প্রতিবার। দূরদূরান্ত থেকে দোকানদারেরা এসে দোকান সাজান। মেলায় পসরা নিয়ে আসেন সেখ সাজাহান, মিন্টু কাজিরা। তাঁরা বলেন, ‘‘এই সময় তেমন একটা অনুষ্ঠান থাকে না। ঝুলন থেকেই আমরা ব্যবসা শুরু করি। এবার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।’’ ঝুলন উৎসব বন্ধ হলেও রীতি মেনে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি পুজো হবে ছোট করে। ক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদক সুকোমল দালাল বলেন, ‘‘এই ঐতিহ্যবাহী ঝুলন উৎসব দীর্ঘদিনের। এই বছর এমন সংকটের সময়ে ঝুলন উৎসব করা বিপজ্জনক। আগামী বছরের অপেক্ষায় আমরা থাকব।’’
আউশগ্রামের বেলাড়ি গ্রামেও এবার ঝুলন উৎসব বন্ধ। বেলাড়ি গ্রামীণ পাঠাগার ও সূর্য সংঘের মধ্যে প্রতিবছর রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলতো। দর্শক টানায় কারা বেশি এগিয়ে। সেইজন্য একেবার সাম্প্রতিক ঘটনা ঝুলন মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা হত। কিন্তু এবার উৎসবের রঙ ফিকে এখানেও।