দ্য ওয়াল ব্যুরো, উত্তর দিনাজপুর: রোজই তাঁকে নিয়ে ব্যস্ততা থাকে ওয়ার্ডে। অসুস্থদের চিকিৎসা, দেখভাল, সবকিছুর ফাঁকেই পূজা কী খাবে, কখন ঘুমোবে? খোঁজ রাখেন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাঁকে ঘিরে হাসপাতালের মধ্যেই এক অন্য দুনিয়া।
সেই পূজার আজ ছ’মাস। নিয়ম মেনে হাসপাতালের ওয়ার্ডের মধ্যেই হল তার অন্নপ্রাশন। নতুন জামা পরিয়ে পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যাসিট্যান্ট সুপার ডাক্তার অভিক মাইতি পায়েস খাইয়ে দিলেন পূজাকে। মাথায় ধান দূর্বা দিয়ে পূজার মঙ্গল চাইলেন সবাই।
রায়গঞ্জের ‘মুক্তির কান্ডারী’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভবঘুরে এক মানসিক ভারসাম্যহীন সন্তানসম্ভবা মহিলাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে ভর্তি করে গিয়েছিল রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই একটি শিশুকন্যার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। কয়েকদিন প্রসূতিবিভাগে নজরে রেখেছিলেন সবাই। কিন্তু একদিন নিজের শিশুকে হাসপাতালে ফেলে রেখেই বেপাত্তা হয়ে যান তিনি। তারপর থেকে হাসপাতালেই বড় হচ্ছে সেই শিশু। এখন এই হাসপাতালের ডাক্তার নার্স সবার নয়নের মণি সে। সবাই আদর করে নাম রেখেছে পূজা। সদ্যোজাত শিশু এখন বসতে পারে, কাছের জনদের দেখলে মুখ ভরে ওঠে হাসিতে।
পূজার মুখে ভাতের অনুষ্ঠান ঘিরে এদিন সকাল থেকেই হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের ব্যস্ততা ছিল নজরে পড়ার মতো। ফুলে মালায় সাজানো হয়েছিল গোটা ওয়ার্ড। বাড়ি থেকে পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে এনেছিলেন পূজার আত্মজনরা। তারপর মুখে ভাত দেওয়ার পালা। হাসপাতালের দুই অ্যাসিট্যান্ট সুপার ডাক্তার অভিক মাইতি ও সৌম্যশিস রাউত পায়েস খাইয়ে দিলেন তাকে।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নার্স তানিয়া সাহা জানালেন, হাসপাতালের সবাই নিজেদের সাধ্যমত দেখভাল করেন পূজার। তিনি বলেন, ‘‘এবার ছ’মাসে পা দিয়েছে সে। অন্নপ্রাশন না হলে তো কিছুই খেতে পারবে না। তাই আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে ওর মুখেভাতের অনুষ্ঠান করলাম আজ।’’ উৎসবে যেন কোনও ঘাটতি না হয় সে দিকে খেয়াল রেখেছিলেন সবাই।
হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট সৌম্যশিস রাউত বলেন, ‘‘শিশুটির ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা ভাবনা করে ইতিমধ্যেই জেলা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এলেই পূজাকে তুলে দেওয়া হবে কমিটির হাতে।’’
তাদের আত্মজনকে যে একদিন ছেড়ে দিতে হবে জানেন হাসপাতালের প্রত্যেকে। তবুও মন সায় দেয় না। যে ক’দিন হাসপাতালে থাকবে সে সে ক’দিনতো কোলে পিঠে আরও একটু বড় করে ফেলা যাবে তাকে।