
শেষ আপডেট: 26 January 2022 10:47
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এই বিবৃতি পড়ে মঙ্গলবার রাতেই রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ নন। তিনি বাংলার তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী এবং সিপিএমের শুধু একজন নেতা নন, এরাজ্যে পার্টির অন্যতম মুখ। বিবৃতি তাঁর নামে প্রচারিত হলেও ধরে নেওয়াই যায়, সেটি আসলে দলেরই সিদ্ধান্ত।
রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রত্যাখ্যান করা নিয়ে নানা মত আছে। কেউ কেউ যেমন, কোনও ধরণের পুরস্কার নেওয়ারই পক্ষপাতী নন। তাঁরা মনে করেন, এমনকিছু করেননি যার জন্য পুরস্কার বা সম্মান পেতে পারেন। এটাকে ঠিক রাষ্ট্রীয় সম্মানকে অসম্মান করা বলে না।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিবৃতি অনুযায়ী, তিনিও রাষ্ট্রীয় সম্মানকে অসম্মান করতে চেয়েছেন, এমনটা বলা যায় না। কিন্ত তাঁর বিবৃতি পড়ে মনে হল, তিনি পদ্ধতিগত প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ সরকারি ঘোষণার আগে তাঁর মতামত নেওয়া হলে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিতেন, সে প্রশ্নের জবাব তাঁর বিবৃতিতে স্পষ্ট নয়, একথা বলার অবকাশ রয়ে গিয়েছে।
এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পদ্মভূষণ সম্মান দেওয়ার জন্য বেছে নেওয়ার পিছনে গভীর রাজনীতি আছে। যেমন তারা গতবছর অসমের প্রয়াত নামজাদা কংগ্রেস নেতা তথা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈকেও রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করেছে। তাঁর পুত্র গৌরব গগৈ রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে সেই সম্মান গ্রহণ করেছেন।
রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল এবং বিরোধী দলের বিশিষ্টদের সম্মানিত করে মোদী সরকার বিজেপির প্রভাব বিস্তারে নয়া কৌশল নিয়েছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্মান প্রত্যাখ্যান করলেও নরেন্দ্র মোদী কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণ করে নিয়েছেন।
প্রশ্ন হল, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রত্যাখ্যানে সিপিএমের লাভ কোথায়? একজন রাজনীতিবিদ এবং বিশেষ করে তিনি যখন দেশের প্রধান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম মুখ, তখন রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণ–বর্জন নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত দলীয় রাজনীতির বাইরে হতে পারে না। সিপিএমের রাজনীতির নিরিখে মোদী সরকারের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের বিস্তর কারণ আছে।
নরেন্দ্র মোদী হলেন সেই প্রধানমন্ত্রী, যিনি ধর্মীয় বিভাজন তৈরিতে নিষ্ঠুরতম পদক্ষেপটি করেছেন সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চালু করে। সেই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলোনকারীদের পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধর্মীয় বিদ্বেষ উস্কে দিয়েছেন। তাঁর সময়ে সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নির্যাতিত। উত্তরাখণ্ডের ধর্মসংসদ থেকে যেভাবে মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের নিকেশ করার ডাক দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা সমস্ত নজির ছাপিয়ে গিয়েছে। এবারের পদ্মতালিকাতেও তার নিষ্ঠুরতার নজির তৈরি করেছেন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত কল্যাণ সিংকে মরনোত্তর পদ্ম সম্মানের জন্য নির্বাচিত করে। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার দিনে তিনিই ছিলেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। মসজিদ ভাঙার ঘটনায় উল্লসিত কল্যাণ তখন দেশভ্রমণে বেরিয়ে বলে বেড়াতেন, ‘অগর ঠিকাদারো কো দিয়া যাতা থা তো ছ’মাহিনা লগ যাতা থা। হামারা করসেবকোনে ছে’ঘণ্টা মে ধাঁচা (মসজিদ) তোড় দিয়া।’ এরপরও মোদী দাবি করবেন তাঁর সরকার সবার আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করেছে। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে মুসলিমদের প্রতি এত বড় অসম্মান, বঞ্চনার নজির আর কিছু হতে পারে কি?
জরুরি অবস্থার মতো অন্ধকারময় দুঃসহ জীবন ভারতবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার জন্য একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জানিয়েছিলেন, কী পরিস্থিতিতে কোন কোন মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর ভারতবর্ষে যে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে, তা নিয়ে কোনও সচেতন নাগরিকের কী কোনও সংশয় আছে?
আশ্চর্য হয়েছি, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পদ্মশ্রী প্রত্যাখ্যানের বিবৃতিতে এসবের কোনও নাম–গন্ধ নেই। ফলে আমার দৃষ্টিতে তাঁর এই সিদ্ধান্ত দিশাহীন, মূল্যহীন প্রত্যাখ্যান।
মঙ্গলবার রাতে বুদ্ধদেববাবুর বিবৃতিতে চোখ বোলানোর পর আমার মনে পড়ে গেল প্রয়াত জ্যোতি বসুর কথা। তাঁকে নিয়ে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৬ সাল। লোকসভা ভোটের পর সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল হিসেবে বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। সেই প্রথম দেশের ক্ষমতায় এল গেরুয়া বাহিনী।
আমি সেদিন আর পাঁচটা দিনের মতোই রাইটার্স বিল্ডিংসে ছিলাম। অন্যদিনের মতো সন্ধে ৬টা সাড়ে ৬টা নাগাদ জ্যোতিবাবু তাঁর চেম্বার থেকে বেরোলেন। রাইটার্স বিল্ডিংসে তখন মুখ্যমন্ত্রীর ঘর থেকে কয়েক পা দূরেই ছিল লিফট। জ্যোতিবাবু অফিস না ছাড়া পর্যন্ত সাংবাদিকরা রাইটার্সে থাকতেন। তিনি বাড়ি ফেরার মুখে এটা–ওটা প্রশ্ন করতেন তাঁকে। বেশিরভাগ দিনই তাঁর সঙ্গে থাকতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি জ্যোতিবাবুকে লিফটে এগিয়ে দিয়ে ফিরে যেতেন নিজের চেম্বারে।
জ্যোতিবাবুর একটা অভ্যাস ছিল, লিফটে ওঠার মুখে তিনি চশমা খুলে ধুতির খুঁটে মুছতেন। সেদিনও সেভাবেই তিনি লিফটে প্রবেশ করেছেন। দরজা বন্ধ হওয়ার মুখে আমি তাঁকে প্রশ্ন করি, জ্যোতিবাবু, বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ী আজ দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আপনি কী তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন?
স্বভাববিরুদ্ধভাবে জ্যোতিবাবু সেদিন লিফট থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, ‘শুভেচ্ছে! জানাইনি, জানাবোও না। অসভ্য, বর্বরদের একটা দল দেশের শাসন ক্ষমতায় এল।’ এই বলে তিনি চলে গেলেন। পরদিন সংবাদসংস্থা পিটিআই–এর এক সাংবাদিক রাইটার্সে এসে জানালেন, ‘জ্যোতিবাবুর বক্তব্য দেশের প্রথম সারির সমস্ত কাগজে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে।’
কথাটা জ্যোতিবাবু এরপর থেকে রাজনৈতিক সভা–সমিতিতেও বলতেন। ২০০০ সালে তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন, প্রধানমন্ত্রী তখন বাজপেয়ী। একদিন কলকাতায় এলেন প্রধানমন্ত্রী। জ্যোতিবাবু রাজভবনে গেলেন তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। রাজভবন থেকে ফিরে জ্যোতিবাবু সেদিন এক জনসভায় বাজপেয়ীর সঙ্গে তাঁর কথপোকথেনের খানিকটা ভাষণে উল্লেখ করেন। বাজপেয়ী কথায় কথায় জ্যোতিবাবুকে বলেন, ‘আপনি শুনলাম আমাদের অসভ্য, বর্বর বলেন। কেন এসব বলেন?’
জ্যোতিবাবু সভাতে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, হ্যাঁ আমি কথাটা বলি। তবে ব্যাক্তিগতভাবে কাউকে বলি না। আপনাদের দলকে বলি। এছাড়া আর কীই বা বলতে পারি। দিন–দুপুরে আপনাদের দল একটা প্রাচীন সৌধ (বাবরি মসজিদ) ভেঙে দিল। একাজ যারা করে, তাদের এছাড়া আর কী বলতে পারি?’
জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আডবাণী, বাজপেয়ীদের ব্যাক্তিগত সখ্য ছিল। তাই বলে তাঁদের দলকে কখনও রেয়াত করেননি। পূর্বসুরীর এইসব মন্তব্য, পদক্ষেপ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর অজানা ছিল না। সেই কারণেই পদ্মভূষণ প্রত্যাখ্যানে তাঁর বিবৃতিতে চোখ বুলিয়ে খুবই বিস্মিত হয়েছি।
কোনও সন্দেহ নেই মোদী সরকার কঠিন বল ছুঁড়েছিল। কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় সে বলেও ছয় মারা যেত। সেই ছয় বাংলায় তাঁর পার্টির সাধারণ কমরেডদের মধ্যে নতুন উন্মাদনা তৈরি করতে পারত। বিশেষ করে দিদি–মোদীর মধ্যে কে প্রধান প্রতিপক্ষ, এ প্রশ্নে কমরেডদের মধ্যে ধোঁয়াশাও কাটানো যেত। মঙ্গলবার রাতেই দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘তাঁর (বুদ্ধদেববাবুর) মস্তিষ্ক আগের চেয়ে সক্রিয়।’ অর্থাৎ বুদ্ধদেববাবু সচেতনভাবেই ওই বিবৃতি দিয়েছেন। সেই কারণে তাঁর বিবৃতি পড়ে আরও বিস্মিত হয়েছি।