
শেষ আপডেট: 30 May 2023 16:06

সোমবার দুপুরে সাগরদিঘির কংগ্রেস বিধায়ক বাইরন বিশ্বাস তৃণমূলে যোগ (Bayron Biswas TMC Joining) দেওয়ার পর থেকেই দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া মূলত দেখা যাচ্ছে। বাইরনকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন অনেকে। আবার বাংলায় বিরোধীরা কেউ কেউ তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলছেন। তাঁরা বলছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল ঠিক করল না। বাইরনকে এভাবে ভাঙিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনওভাবেই নৈতিক নয় (Opinion Column On Bayron Biswas TMC Joining)।
মঙ্গলবার সকালে টুইট করে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ আবার অভিযোগ করেছেন যে বাইরনকে লোভ দেখিয়ে ভাঙিয়ে নিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। এভাবে কখনওই বিরোধী ঐক্য মজবুত করা যাবে না।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলকে শুধু দোষ দিলে ভুল মূল্যায়ন হবে। মুর্শিদাবাদে সাংগঠনিক দিক থেকে তৃণমূল ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। সুতরাং স্বাভাবিক নিয়মেই তৃণমূল চেষ্টা করবে তার পথ নিষ্কণ্টক রাখা। সেক্ষেত্রে সাগরদিঘির উপনির্বাচনে জিতে মাত্র মাস তিনেকের মধ্যেই কংগ্রেস বিধায়ক যদি স্বেচ্ছায় জোড়াফুলের পতাকা হাতে নিতে চান, তাহলে তৃণমূল আপত্তি করবে কেন?

বড় কথা হল, এখানে সবাই রাজনীতি করতে এসেছে। কেউ স্বেচ্ছাসেবী শিবির লাগিয়ে বসেনি। বাইরনের জয়কে কংগ্রেস ও সিপিএম একটা মডেল হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। তারা বোঝাতে চেয়েছিল, কংগ্রেস ও সিপিএম জোটবদ্ধ হলে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসানো যায়। বাইরনকে তৃণমূলে টেনে অভিষেক হয়তো সংখ্যালঘুদেরও বোঝাতে চাইলেন, তাদের ভোট বাম বা কংগ্রেসকে দিয়ে লাভ নেই। সেই ঘুরে ফিরে তৃণমূলেই আসবে। সুতরাং, সংখ্যালঘু ভোট সরাসরি তৃণমূলের দিকে থাকলেই মঙ্গল। বাংলায় জোড়াফুলই পারবে পদ্মকে ঠেকাতে।
এখানে জয়রাম রমেশের মায়া কান্নাকে গুরুত্ব দিয়েও লাভ নেই। বাংলায় তৃণমূল সরকারের অন্যতম বিরোধী দল হল কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী উঠতে বসতে মুখ্যমন্ত্রী ও শাসক দলের সমালোচনা করছেন। এহেন পরিস্থিতিতে তৃণমূল গন্ধরাজের তোড়া হাতে বসে থাকবে তা ভাবা বৃথা। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বৃহত্তর বিরোধী জোটের সঙ্গে এই স্থানীয় স্তরে রাজনীতিকে তাই গুলিয়ে ফেললে চলবে না। বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের বিষয়টিকে এই স্থানীয় রাজনীতির থেকে বিচ্ছিন্ন করেই দেখতে হবে। কারণ, জাতীয় স্তরে বিজেপিকে রুখে দেওয়ার আগ্রহ কংগ্রেসের যতটা রয়েছে, তৃণমূলেরও হয়তো ততটাই রয়েছে।

এই দলবদলের ঘটনায় আসলে নায়ক বাইরন বিশ্বাসই। নৈতিকতার প্রশ্ন করা যেতে পারে তাঁকেই। তাঁর কথায় এক প্রকার ছল ও চাতুরিও সোমবার প্রকট ভাবে ধরা পড়েছে। বাম-কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময়ে এই বাইরন শাসকদল সম্পর্কে কী না বলেছেন। অথচ সোমবার কোনওরকম কুণ্ঠা না দেখিয়ে দাবি করেছেন, কংগ্রেস-সিপিএমের কোনও অবদানই ছিল না। তিনি নিজের যোগ্যতায় জিতেছেন। শুধু তা নয়, বাইরন কোনওরকম লজ্জা বা শরম না দেখিয়ে বলেছেন, একুশের ভোটে তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার আগ্রহ ছিল তাঁর। তা না পেয়ে কংগ্রেসের টিকিটে সাগরদিঘিতে লড়েছেন। তার পর এখন তৃণমূলে যোগ দিলেন।
বাইরনই মুর্শিদাবাদের প্রথম কোনও কংগ্রেস বিধায়ক নন যিনি তৃণমূলে যোগ দিলেন। ষোলো সালের ভোটে এই মুর্শিদাবাদে জোট করে ২২ টা আসনের মধ্যে ১৮ টি আসনে জিতেছিল বাম-কংগ্রেস। তার মধ্যে সম্ভবত বহরমপুরের কংগ্রেস বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তী ছাড়া একে একে কংগ্রেসের বিধায়করা সবাই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তা সে আবু তাহের হোক বা অপূর্ব সরকার কিংবা আখরুজ্জামান হোক বা জাকির হোসেন। কিন্তু একে একে কেন কংগ্রেস ছেড়ে দিয়েছেন তাঁরা? কংগ্রেস কি সত্যিই দুর্বল হয়ে গিয়েছে?
জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের দুর্বলতা প্রকট হলেও মুর্শিদাবাদের স্থানীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস কিন্তু কম মজবুত নয়। মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস দুর্বল থাকলে বামেদের সঙ্গে জোট করে এই আসনগুলো জিততে পারতো না। সাগরদিঘিতেও শাসক দলের প্রার্থীকে সাড়ে ২৩ হাজার ভোটে হারিয়ে লজ্জায় ফেলতে পারত না। ঘটনা হল, ছোট দলে থেকে (জাতীয় স্তরে কংগ্রেস বড় দল হলেও বাংলায় তৃণমূলের তুলনায় শক্তি অনেক কম) লড়াই করার মানসিকতাই হারিয়ে যাচ্ছে (The mentality of fighting is going away from the small force)। সবাই চাইছে রাতারাতি বড় দলের জার্সি গায়ে তুলতে। এই বাইরন যদি কংগ্রেসে থেকে যেতেন তাহলে অবধারিত ভাবেই তাঁকে প্রতিদিন তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করতে হত। যেহেতু তৃণমূল শাসক দল, তাই অনেকের আশঙ্কামতো স্থানীয় শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়তে হত বাইরনকে। তা ছাড়া মুর্শিদাবাদে বাইরনের বিবিধ ব্যবসাও রয়েছে। সামনে পঞ্চায়েত ভোট আসছে, তার পর লোকসভা ভোট। তাতেও প্রচুর ঘাম ঝড়াতে হত বাইরনকে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ছোট দলে এই পরিশ্রমে আগ্রহ আর নেই। লড়াইয়ে উৎসাহ নেই। রাতারাতি বড় দলে যোগ দিয়ে সুবিধার জীবন কাটাতে চাইছেন তাঁরা। তাতে বিশেষ যে মর্যাদা বাড়ছে তা নয়। কেউ বড় জোর একটা কমিটি বা কমিশনের চেয়ারম্যান হয়ে নীল বাতির গাড়ি পেয়েছেন, কেউ বা এমন দফতরে প্রতিমন্ত্রীর চাকরি পেয়েছেন যেখানে আদতে কোনও কাজই নেই। অথচ সাগরদিঘিতে বাইরন ছোট দলের হয়ে যে লড়াইটা করেছিলেন, তার জন্যই বাংলার মানুষ চিনেছিল তাঁকে। এর পর হয়তো তাঁর আর কোনও প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না। বরং হয়তো অনেকের মনে এটা থেকে যাবে যে বাইরন কংগ্রেস, সিপিএম এবং সাগরদিঘির জনাদেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তিনি একজন চরম সুবিধাবাদী দলবদলু রাজনীতিক। মতাদর্শ আঁকড়ে থাকা কোনও রাজনৈতিক কর্মী নন।