দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিষ্যুদবার তখন সকাল ন’টার আশপাশ। প্রথম রাউন্ড গণনার শেষে হাজার খানেক ভোটে এগিয়ে গিয়েছিলেন খড়্গপুর সদর বিধানসভার বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থী চিত্তরঞ্জন মণ্ডল। ও মা! সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সিপিএমের এক যুবনেতা ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছিলেন, “আমরা ফিরছি!”
কথায় বলে বাতি নিভে যাওয়ার আগে একবার দপ করে জ্বলে ওঠে। সেটাই বোধহয় হয়েছিল খড়্গপুর সদরের ক্ষেত্রে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, ভোট বাক্সে আর রক্তক্ষরণ নয়, এবার রক্তশূন্যতার পথে বাম-কংগ্রেস!

মনে পরে সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখের কথা? গোটা আলিমুদ্দিন স্ট্রিট উঠে এসেছিল প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে। গান্ধীজির জন্মের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে কংগ্রেসের কর্মসূচির সূচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাম নেতাদের। সূর্য মিশ্র, বিমান বসুর মতো সিপিএম নেতারা তো বটেই, লোকসভা ভোটের সময়ে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার ব্যাপারে যে বাম শরিকরা নাক কুঁচকেছিলেন, সেই আরএসপির মনোজ ভট্টাচার্য, ফরওয়ার্ড ব্লকের নরেন চট্টোপাধ্যায়, সিপিআইয়ের স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়রাও চলে গিয়েছিলেন বিধান ভবনে। লোকসভা ভোটের সময়ে জোট হব হব করেও হয়নি। আলোচনার মাঝেই এক তরফা প্রার্থী ঘোষণা করেছিল বামেরা। জোট ভেস্তে যাওয়ার পর, ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির পাদদেশে বসে বিমান বসু প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের উদ্দেশে বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই কোনও টাকা পয়সার লেনদেন হয়েছে!”
অনেকের মতে লোকসভায় বিজেপির ধাক্কা খেয়ে সব ছেড়ে উপনির্বাচনে জোটের রাস্তায় ছুটেছিলেন সোমেন-বিমানরা। ১৬-র ভোটে জোট করেও রোখা যায়নি তৃণমূলকে। সে সময়ে অনেকে বলেছিলেন, বাংলার রাজনীতিতে ভোটের আগের জোট কখনও সাফল্য পায়নি। এখানে রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে মোর্চা তৈরি না হলে তা মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে না। এটাই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের নির্যাস। তাই বাম-কংগ্রেস টুকটাক যৌথ কর্মসূচিও নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু তাতেও বিপর্যয় ঠেকানো গেল না। এই ছ’মাস আগে লোকসভাতেও যা ভোট পেয়েছিল বাম-কংগ্রেস, সেটাও কার্যত অর্ধেক হয়ে গেল। ২০১৬-র বিধানসভার সঙ্গে তুলনা করলে যে কোনও বাম বা কংগ্রেস সমর্থকেরই রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
দেখে নিন ২০১৬-র বিধানসভা, ১৯-এর লোকসভা আর এই উপনির্বাচনের পরিসংখ্যান

উপরের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, বাংলায় বাম-কংগ্রেসকে এখন রক্তশূন্যতা গ্রাস করেছে। ১৬-র বিধানসভায় আসন সমঝোতা হয়েছিল বাম-কংগ্রেসের। কিছু জায়গায় জোট হয়েছিল কোমর বেঁধে। কিছু জায়গায় একেবারেই গা-ছাড়া। অনেকে বলেন, এই সে দিনও সিপিএমের কর্মীরা ৭২-এর আধা ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের কথা তুলে কংগ্রেসিদের আক্রমণ করতেন। কংগ্রেস কর্মীরা উলুবেরিয়ায় হাতের পাঞ্জা কেটে নেওয়ার কথা তুলে তোপ দাগতেন সিপিএমের বিরুদ্ধে। তাঁরা কী ভাবে একসঙ্গে জোট বাঁধবে!
কিন্তু দু’দলের বাংলার নেতারাই কর্মীদের বুঝিয়েছিলেন, ও সব এখন অতীত। এখন একটাই টার্গেট, সেটা তৃণমূল। তারপর কংগ্রেস জোট রাখতে চাইলেও সিপিএম সরে গিয়েছিল। বলা ভাল প্রকাশ কারাটের নেতৃত্বাধীন পলিটব্যুরোর ডিভিশন বেঞ্চ কলকাতায় এসে বিমান-সূর্যদের এমন ধমক দিয়েছিল, আর ট্যাঁ ফোঁ করতে পারেনি আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। এমনকি বাংলা থেকে সীতারাম ইয়েচুরিকে কংগ্রেসের সমর্থনে রাজ্যসভায় যাওয়াও আটকে দিয়েছিল কারাট শিবির। অনেকে বলেন, সিপিএমের এই কালীদাস হওয়ার জন্যই জোটের বারোটা বেজে গিয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, ১৬-র ভোটের পরেও যদি মাঠে ময়দানে বাম-কংগ্রেস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকত, তাহলে বিজেপি অন্তত ফাঁকা জায়গাটা পেত না।
তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিজেপির কাছে ভিক্ষা চাওয়া বন্ধ করুক সিপিএম-কংগ্রেস। করিমপুর, খড়্গপুর সদর এবং কালিয়াগঞ্জের বুথওয়াড়ি ফলাফল না দেখেও এটা স্পষ্ট, বাম-কংগ্রেস লোকসভায় যা ভোট পেয়েছিল, সেখান থেকেও ভোট ক্ষয়েছে। শুধু তাই নয়, লোকসভায় যেমন বামের ভোট রামের দিকে চলে গিয়েছিল, এবার সেই ভোট তৃণমূলের দিকে গিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উপনির্বাচন বুঝিয়ে দিল, বাম-কংগ্রেস এখন বাংলায় শুধু ক্ষয়িষ্ণু নয়। একেবারে প্রান্তিক শক্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘সাইনবোর্ড পার্টি।’