দ্য ওয়াল ব্যুরো: মন্ত্রী, বিধায়কদের পর জেলাপরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রামসভা—ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যদের ভাতা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার জেলা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে নবান্ন সভাঘরে বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, এই ভাতা বাড়াতে রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত ২২০-২২৫ কোটি টাকা খরচ হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা শুনে বিরোধীরা অবশ্য বলছেন, এ দিয়ে কাটমানিও বন্ধ হবে না। দলের ভাঙনও থামবে না।
মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বলেন, “আমরা সবাই পঞ্চায়েতের সদস্যদের দোষ-গুণ দেখি। একবারও ভাবি না এরা কী ভাবে চলেন। অনেকের গাড়ি ভাড়াও থাকে না।” পাশে পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মমতা জানিয়েছেন- জেলাপরিষদের সভাপতিদের ৬হাজার ৬০০ টাকা থেকে ভাতা বেড়ে হল ৯ হাজার টাকা। সহসভাধিপতিদের ভাতা ৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে ৮ হাজার টাকা। জেলাপরিষদের কর্মাধক্ষ্যরা এতদিন পেতেন মাসিক ৪ হাজার টাকা। এ বার থেকে তাঁরা পাবেন ৭ হাজার টাকা। জেলা পরিষদের সাধারণ সদস্যদের ভাতা ১৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা। একই ভাবে বাড়ছে পঞ্চায়েত সমিতির সভাধিপতি, সহ সভাধিপতি, সাধারণ সদস্য, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, উপ প্রধান ও সাধারণ সদস্যদের ভাতাও।
কিন্তু ভাতা বৃদ্ধিতেও ভরপুর রাজনীতি রয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে। কাটমানি তিরে বিদ্ধ তৃণমূল। তার উপর চলছে দলের ভাঙন। নিজেই বলেছিলেন, কাটমানি ফেরত দাও। তারপর তা ব্যুমেরাং হচ্ছে দেখে গতকাল একুশের মঞ্চ থেকে বলেছেন, “কাটমানি চাইতে এলে বলো ব্ল্যাক মানি ফেরত দাও।” এ দিনের বৈঠকেও মুখ্যমন্ত্রী জেলা পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশে কাটমানির নাম না উল্লেখ করে বলেছেন, "কোনও কিছুর বিনিময়ে কোনো কাজ করবেন না।" রাজনৈতিকমহলের অনেকের প্রশ্ন, তাহলে কি কাটমানি রুখতে ভাতা বাড়িয়ে দিদি একটা চেষ্টা করলেন? নাকি দলের ভাঙন ঠেকাতে নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যদের বার্তা দিলেন, আমি তোমাদের পাশে আছি।
বাংলায় ৩৪ শতাংশ আসনে পঞ্চায়েতে ভোটই হয়নি। জেলা পরিষদ, সমিতি থেকে গ্রামসভার সিংহভাগের দখলই তৃণমূলের। সমালোচকদের অনেকে বলছেন, দলের নেতাকর্মীদের পাইয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করতেই এই ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। পর্যবেক্ষকদের অনেকে আবার এ-ও বলছেন, মমতা এই ভাতা বাড়িয়ে নিজের ইমেজ মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাইলেন। প্রশাসনের অনেকেই বলেন, নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যরা যে ভাতা পান তাতে তাঁদের এই বাজারে চলাটা মুশকিল। তাই অনেকেই অন্যপথে ঝোঁকেন। মমতা জনমানসে বার্তা দিতে চাইলেন, তিনি ভাতা বাড়িয়ে দিলেন। এরপর যদি পঞ্চায়েত সদস্যরা দুর্নীতি করেন, সেই দায় তাঁর নয়।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, “কাটমানি আর দলের ভাঙন রুখতে মুখ্যমন্ত্রী পঞ্চায়েত সদস্যদের ভাতা বাড়ালেন। আর ও দিকে প্রাথমিক শিক্ষকরা পড়ে রয়েছেন। যত দোষ মাস্টারদের।” বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু বলেন, “দিদিমণি যা-ই করুন, এ ভাবে কাটমানিও আটকাতে পারবেন না, আর দল ছাড়াও আটকাতে পারবেন না। যারা কাটমানি নেওয়ার নেবেই, যারা দল ছাড়ার ছাড়বেই। উনি কিচ্ছু করতে পারবেন না। সব হাতের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে।”
সমালোচকদের অনেকেই বলেন, তৃণমূল আসলে করে কম্মে খাওয়ার জায়গা। কিছু না পেলে সেখানে থাকবেন কেন তাঁরা! দিদির কাটমানি নিয়ে গ্রামে, মফস্বলে আক্রোশের মুখে তাঁর দলের নেতারাই। হয়তো বুঝে গিয়ে এখন ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে এই ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এর কী ফলাফল দাঁড়ায় সেটাই এখন দেখার।