দ্য ওয়াল ব্যুরো: পর পর তিন জন।
তিন জনই ছিলেন খয়রাশোলের তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লক সভাপতি। এবং প্রত্যেককেই নৃশংস ভাবে খুন করা হল। অশোক ঘোষ, অশোক মুখোপাধ্যায় এবং রবিবার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সোমবার দুপুরে দুর্গাপুরের হাসপাতালে মৃত্যু হল দীপক ঘোষের।
কেন এই খুন? শুধুই কি রাজনৈতিক আক্রোশ? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কিছু?
খয়রাশোলে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে একটাই শব্দ। কয়লা।
আসানসোল থেকে যে কোলিয়ারি এলাকার শুরু, তার বিস্তৃতি একেবারে ঝাড়খণ্ড পর্যন্ত। এর মাঝেই বীরভূমের খয়রাশোল। অবৈধ কয়লা খাদানের কাঁচা পয়সাই কাল ডেকে আনছে এ অঞ্চলের। এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
গোটা অঞ্চল জুড়ে কোটি কোটি টাকার খেলা। স্থানীয়দের অনেকেরই অভিযোগ সরকারে আসার পর থেকে কয়লার কন্ট্রোল চলে যায় তৃণমূলের হাতে। অনেকের মতে ব্ল্যাক ডায়মন্ডের হিস্সা নিয়েই খয়রাশোলে খুনোখুনি অব্যহত।
২০১২ সালের অগস্ট মাসে খুন হন তৃণমূলের তৎকালীন ব্লক সভাপতি তথা সদ্য নিহত দীপক ঘোষের দাদা অশোক ঘোষ। সে ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল শাসক দলেরই বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা অশোক মুখোপাধ্যায়ের। অশোক ঘোষের মৃত্যুর পর খয়রাশোলের ব্লক সভাপতি হন, তাঁরই খুনে অভিযুক্ত অশোক মুখোপাধ্যায়। অভিযোগ, ঘোষ গোষ্ঠী টার্গেট করে ফেলে মুখোপাধ্যায়কে। খয়রাশোল থেকে ঘরছাড়া হয়ে যান তিনি। পরিস্থিতি এমনই যে, তৃণমূলের জমানায় তৃণমূলের তাড়া খেয়ে তৃণমূল নেতাই নাকি ঘরছাড়া!
সেই একটাই শব্দ। কয়লা। বছরখানেক এ দিক ও দিক থাকার পর খয়রাশোলে ফেরেন অশোক মুখোপাধ্যায়। পরের দিন সকালেই চারটে বুলেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল তাঁর দেহ। তারপর থেকে দীপক ঘোষই ছিলেন খয়রাশোল ব্লকে অনুব্রত মণ্ডলের অন্যতম সেনাপতি। এ বার তিনিও।
তৃণমূলের জমানাতেই এই রমরমা? হঠাৎ করেই কি সাত বছরের মধ্যে বেআইনি কয়লা নিয়ে কাঁচা টাকার কারবার শুরু?
বর্ধমান এবং বীরভূমের কোলিয়ারি বেল্টের রাজনীতির খবর রাখা অনেকেই বলছেন, এর শুরুয়াত বাম জমানাতেই। সেই কেলেঙ্কারিতে একদা নাম উঠেছিল এক প্রাক্তন সিপিএম সাংসদের। স্থানীয়দের মতে, বাম জমানায়ও এই কারবার ছিল, কিন্তু খুনোখুনি ছিল না। কারন ওঁদের নির্দিষ্ট কয়েকজন নেতাই কয়লা কন্ট্রোল করতেন। এমনিতে সিপিএমের খোঁজ খবর রাখা অনেকেই বলেন, সরকারে থাকার সময় এই সব জেলায় পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীতে নির্দিষ্ট একজনকে ‘কয়লা দেখার’ দায়িত্ব দেওয়া হতো। আসানসোলে অনেকের অভিযোগ, তখন কালোর খেলা হতো সাদা-র আড়ালে!
কিন্তু কয়লা নিয়ে শাসক দলের মধ্যে কোন্দলের ব্যাপার স্যাপার এলাকায় আর গোপন নেই। প্রায় সবটাই খুল্লামখুল্লা। খোলা খাতার মতই।
যদিও জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল এসব অভিযোগ উড়িয়ে তোপ দেগেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে। জানিয়েছেন, "বিজেপি ঝাড়খণ্ড থেকে লোক আনিয়ে দীপক ঘোষকে খুন করিয়েছে।" হুঁশিয়ারির সুরে অনুব্রত আরও বলেছেন, "তৃণমূল হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।"
পাল্টা বিজেপি জেলা সভাপতি রামকৃষ্ণ রায়ের বক্তব্য, কয়লার পয়সার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েই নিজেদের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন দীপক ঘোষ। রামকৃষ্ণবাবু বলেন, “তৃণমূল আসার পর থেকেই দলীয় নেতারা খুন হচ্ছেন। পুলিশ ওদের। প্রশাসন ওদের। কেন এখনও একটাও খুনের কিনারা হলো না?”
কিন্তু স্থানীয়রা আতঙ্ক আর আত্মবিশ্বাস মিশিয়ে বলছেন, ক’দিন থমথমে থাকবে এলাকা। তারপর আবার যেই কে সেই। আবার কয়লার কারবার। আবার হয়তো......