
শেষ আপডেট: 1 December 2019 13:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো, উত্তর দিনাজপুর: কালিয়াগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনের ফলাফল দেখে অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। এই ছ’মাস আগে হওয়া লোকসভা ভোটে যে বিধানসভায় বিজেপি এগিয়ে ছিল ৫৬ হাজারের বেশি ভোটে, সেই আসন কিনা জিতে গেল তৃণমূল! অনেকেই বলেছিলেন, তাহলে কি নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে বাংলায়?
ওই ঘটনার পর তেরাত্তির কাটতে না কাটতেই বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ। এবং তা দেখা গেল সেই উত্তর দিনাজপুর জেলাতেই। এই প্রথম বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে অভিষেক ঘটল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন তথা মিমের। হেমতাবাদের হাইমাদ্রাসা পরিচালন সমিতির ভোটে প্রার্থী দিল আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল। শুধু তাই নয়, এই ভোটে বিজেপি প্রার্থীই দিল না। শোনা গেল, গেরুয়া শিবিরের লোকজন চোরাগোপ্তা প্রচার করে বলছে, বিজেপির সব ভোট বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থীকে দেওয়া হোক।
গত দেড় মাস ধরেই বাংলার রাজনীতিতে আলোচনায় চলে এসেছে মিমের নাম। মিম আসলে হায়দরাবাদের দল। সেখানকার নিজামের হাত ধরেই এই দল গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পর। আদতে কট্টর মুসলিমদের দল হিসেবেই পরিচিত ওয়াইসির পার্টি। বাংলা লাগোয়া বিহারের কিষাণগঞ্জ আসন জয়ের পরেই দ্য ওয়াল-এ লেখা হয়েছিল, তৃণমূলের চিন্তা বাড়িয়ে বিহারে খাতা খুলে ফেলল মিম। চিন্তা যে সত্যিই শাসক দলের বেড়েছে তা বোঝা গিয়েছে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতাতেও। দলের কোর কমিটির বৈঠকে দলীয় নেতাদের পইপই করে দিদি বুঝিয়েছিলেন, “মিম হইতে সাবধান। ওরা কিন্তু বিজেপির বি টিম।”
অনেকের মতে, বাংলায় সংখ্যালঘু ভোটই তৃণমূলের ভিত্তি। লোকসভা তো বটেই, তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনও তা প্রমাণ করেছে। কিন্তু শাসক দলের অনেকেরই আশঙ্কা, যদি মিম বাংলায় পা রাখে, এবং তৃণমূলের বাক্সে থাকা সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসায়, তাহলে অনেক হিসেব ওলটপালট হয়ে যাবে।
হেমতাবাদের ভোগ্রাম হাইমাদ্রাসায় ৬টি আসন। পাঁচটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে মিম। অনেকে বলছেন, এটাকে শুধুমাত্র মাদ্রাসার নির্বাচনের পরিসরে ভাবলে চলবে না। এর একটা বৃহত্তর প্রেক্ষাপট রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, হেমতাবাদ একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে মিম যদি মাদ্রাসা কমিটির ভোটে ভাল ফলাফল করে এবং শাসক দলের প্যানেল যদি সত্যি সত্যিই পরাজিত হয়, তাহলে এটাকেই বাংলার মডেল করে তুলতে ঝাঁপাবে ওয়াইসির দল।
কোচবিহার শহর ছেয়ে গিয়েছিল মিমের পোস্টারে। তাতে লেখা ছিল, ‘ইনতেজার অব খতম, মিশন ওয়েস্ট বেঙ্গল।’ তারপর এ মাসের মাঝামাঝি কোচবিহার সফরে গিয়ে দলীয় কর্মীসভায় মমতা বলেছিলেন, “ওরা বিজেপির কাছে টাকা নেয়। সংখ্যালঘুরা ভুল করবেন না। ওদের বাড়ি হায়দরবাদে। এখানে নয়।”
শুধু তাই নয়, হেমতাবাদের এই ভোটে দেখা গেল বিজেপি প্রার্থীই দিল না। স্থানীয় এক নেতা সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট বলে দিলেন, “এনআরসির জন্য সবাই উল্টোদিকে চলে গিয়েছে। প্রার্থী করার লোকই খুঁজে পাচ্ছি না।” তবে তৃণমূলের অভিযোগ, বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপি আঁতাত করেছে। সিপিএম-কংগ্রেসের আবার পাল্টা বক্তব্য, তৃণমূলের বিক্ষুব্ধরাই মিমের প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়ছে। সব মিলিয়ে একটা মাদ্রাসা পরিচালন সমিতির নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়ে গেল উত্তরবঙ্গে। অনেকের মতে, এটাই হয়তো আগামী দিনের বাংলার রাজনীতির ভবিতব্য হতে চলেছে।