
শেষ আপডেট: 23 February 2021 12:41
টালিগঞ্জ পাড়ায় তিনি জগাদা বলেই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি যুক্ত ছিলেন এসআরএফটিআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এবং তিনি শর্ট ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। প্রথমেই সকলের চোখে পড়ত তাঁর বিশাল উচ্চতা। সেই কারণেই টলিউডে তাঁকে পর্দায় নেগেটিভ চরিত্রেই বেশি দেখা গেছে। কিন্তু কী রসিক, বড় মনের মানুষ ছিলেন। অসম্ভব উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ।
নব্বই দশকে কলকাতা দূরদর্শনে খুব অল্প বাজেটে তৈরি হয়েছিল ক্লাসিক ধারাবাহিক 'আবার যখের ধন', যার পরিচালক ছিলেন জগন্নাথ গুহ। সেটি আজও লোকে মনে রেখেছে। এখনকার 'চাঁদের পাহাড়' বা 'আমাজন অভিযান'-এর মতো আফ্রিকায় গিয়ে শ্যুট করার সাহস বা আর্থিক জোর কোনওটাই তখন ইন্ডাস্ট্রির ছিল না। স্টুডিও এবং বোলপুর অঞ্চল সেজে উঠেছিল আফ্রিকায় আর সেখানে মানিকবাবু চরিত্রের দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় যাকে সবচেয়ে ভয় পেতেন সে ছিল 'ঘটোৎকচ'। ঘটোৎকচ গরিলা সদৃশ দেখতে আবার কখনও এক দাঁত বার করা ভিলেনও। এই ঘটোৎকচের ভূমিকায় অভিনয় করেন জগন্নাথ গুহ নিজেই।
শুধু তাই নয় হেমেন্দ্র কুমার রায়ের জন্মশতবর্ষে নির্মিত 'আবার যখের ধন'-এর মতো কিশোরসাহিত্যকে কম বাজেটেও কী দুর্দান্ত সেট ডিজাইন করে নব্বই দশকের কিশোর কিশোরীদের চোখের সামনে দূরদর্শনে তুলে আনেন পরিচালক জগন্নাথ গুহ! যে ধারাবাহিক আজও লোকে আগ্রহ নিয়ে দেখে পদে-পদে রোমাঞ্চিত হয়। অভিনেতাদের মুন্সিয়ানা বার করে আনা, নিখুঁত গবেষণা আর দুর্দান্ত সেট ডিজাইনে জগন্নাথ গুহ ছিলেন সবার আইডল। 'আবার যখের ধন' সিরিয়ালের পরিচালক হিসেবে তিনি আজ অনেকের কাছেই বিস্মৃত। কিন্তু 'আবার যখের ধন' তো ভোলার নয়। হবে না জগন্নাথ গুহর পরিপূরকও। আজ সেই ছোটবেলার 'আবার যখের ধন' সিরিয়ালের পরিচালক জগন্নাথ গুহ-সহ পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়-- সব অভিনেতাই প্রয়াত।
এর পরে বহু ছবিতেই নেগেটিভ রোলে মাত করেছেন জগন্নাথ গুহ। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'পুরুষোত্তম' ছবিতেও মূল ভিলেনের রোল করেন জগন্নাথ গুহ। এছাড়াও ছবিতে প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী রায় তো ছিলেনই। চিরঞ্জিতের সঙ্গে 'দাঙ্গা' ছবিতেও তাঁর ভিলেন উপস্থিতি। তবে অন্য ধারার রোলও করেছেন।
জগন্নাথ গুহর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য রচনা গুলির মধ্যে রয়েছে 'সলিউশন এক্স', 'মনোরমা কেবিন', 'ওগো প্রিয়তমা', 'বর বউ খেলা'। হিন্দি ছবির পাশাপাশি 'নেমসেক' এবং 'সিটি অফ জয়'-র মতো ছবিতেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। কাজ করেছেন অপর্ণা সেনের 'ঘরে বাইরে আজ' ছবিতে। অপর্ণা সেনের প্রতিটা ছবি হলে টিকিট কেটে দেখতেও যেতেন জগন্নাথ গুহ।
জগন্নাথ গুহর চিত্রনাট্যে ও পরিচালনায় কাজ করেছেন এখনকার সিনিয়র আর্টিস্টরা, যারা তখন ছিলেন আশির নব্বইয়ের দশকে নবাগত নবাগতা। জগন্নাথ গুহর আশীর্বাদ পাওয়া দুই স্বনামধন্য শিল্পী, অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী ও শঙ্কর চক্রবর্তী জগন্নাথ গুহ ভাগ করে নিলেন তাঁদের স্মৃতি।
আমি বলতাম 'তোমার মতো মানুষরা?' বলতেন 'হ্যাঁ ধরে নে ধরে নে।'
নতুন যাঁরা ছবি করছেন তাঁদের কাছেও কিন্তু জগন্নাথদার সঙ্গে আড্ডাটা ছিল খুব একটা শিক্ষনীয় ব্যাপার। আমাদের এখানকার ক্লাসিক ছবির সাথে বিদেশি ক্লাসিক ছবির সম্পর্ক নিয়ে কী অদ্ভুত সুন্দর আলোচনা হত। আমরা খুব আড্ডা মারতাম। সেগুলো আজ কোলাজের মতো সব ভেসে উঠছে। জগাদার স্ত্রী অসুস্থ হলে বৌদিকে হুইলচেয়ারে করেও জগাদা নিয়ে আসতেন সব আড্ডাচক্রে।
ওঁর গুণের মধ্যে আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হল নান্দনিক শিল্প নির্দেশনা। সিনেমায় যাকে বলে আর্ট ডিরেকশন। নন্দনবোধটা ওঁর ভিতরে খুব ছিল।


মানুষ হিসেবেও খুব দিলদরিয়া ছিলেন। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ওঁর বাড়িতে পার্টি চলত, কত মানুষ আসতেন। সেই জগাদা একটু অন্যরকম হয়ে গেছিলেন বৌদি চলে যাওয়ার পর। একা হয়ে গেছিলেন। জগাদা চলে গেলেন, সেটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। জগাদা ভাল থেকো।