Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

'আবার যখের ধন' তাঁরই পরিচালনা, মাদার টেরিজার শেষযাত্রায় ভাষ্যপাঠও ছিল তাঁরই

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যারিটোন ভয়েস এবং উচ্চতম বাঙালি অভিনেতা হিসেবে প্রথমেই সবার নজর কাড়তেন জগন্নাথ গুহ। তিনি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক এবং ভয়েস আর্টিস্ট-- আরও অনেক সত্ত্বার সমন্বয়। তিনি ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র নির্মা

'আবার যখের ধন' তাঁরই পরিচালনা, মাদার টেরিজার শেষযাত্রায় ভাষ্যপাঠও ছিল তাঁরই

শেষ আপডেট: 23 February 2021 12:41

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ব্যারিটোন ভয়েস এবং উচ্চতম বাঙালি অভিনেতা হিসেবে প্রথমেই সবার নজর কাড়তেন জগন্নাথ গুহ। তিনি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক এবং ভয়েস আর্টিস্ট-- আরও অনেক সত্ত্বার সমন্বয়। তিনি ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র নির্মাতাও। আজ চলে গেলেন জগন্নাথ গুহ। করোনাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন আগে। করোনামুক্ত হওয়ার পর ফের ভুগছিলেন কিডনির সমস্যায়। উডল্যান্ডস হসপিটালে চলছিল ডায়লিসিস। সোমবার ডায়লিসিস নেওয়ার পরে আর শেষ রক্ষা হল না। চলে গেলেন অনন্তলোকে। স্ত্রী আগেই প্রয়াত। তার পর মানসিক ভাবে একাকীত্বে ভুগতেন অভিনেতা। টালিগঞ্জ পাড়ায় তিনি জগাদা বলেই বিখ্যাত ছিলেন। তিনি যুক্ত ছিলেন এসআরএফটিআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এবং তিনি শর্ট ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। প্রথমেই সকলের চোখে পড়ত তাঁর বিশাল উচ্চতা। সেই কারণেই টলিউডে তাঁকে পর্দায় নেগেটিভ চরিত্রেই বেশি দেখা গেছে। কিন্তু কী রসিক, বড় মনের মানুষ ছিলেন। অসম্ভব উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ। নব্বই দশকে কলকাতা দূরদর্শনে খুব অল্প বাজেটে তৈরি হয়েছিল ক্লাসিক ধারাবাহিক 'আবার যখের ধন', যার পরিচালক ছিলেন জগন্নাথ গুহ। সেটি আজও লোকে মনে রেখেছে। এখনকার 'চাঁদের পাহাড়' বা 'আমাজন অভিযান'-এর মতো আফ্রিকায় গিয়ে শ্যুট করার সাহস বা আর্থিক জোর কোনওটাই তখন ইন্ডাস্ট্রির ছিল না। স্টুডিও এবং বোলপুর অঞ্চল সেজে উঠেছিল আফ্রিকায় আর সেখানে মানিকবাবু চরিত্রের দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় যাকে সবচেয়ে ভয় পেতেন সে ছিল 'ঘটোৎকচ'। ঘটোৎকচ গরিলা সদৃশ দেখতে আবার কখনও এক দাঁত বার করা ভিলেনও। এই ঘটোৎকচের ভূমিকায় অভিনয় করেন জগন্নাথ গুহ নিজেই। শুধু তাই নয় হেমেন্দ্র কুমার রায়ের জন্মশতবর্ষে নির্মিত 'আবার যখের ধন'-এর মতো কিশোরসাহিত্যকে কম বাজেটেও কী দুর্দান্ত সেট ডিজাইন করে নব্বই দশকের কিশোর কিশোরীদের চোখের সামনে দূরদর্শনে তুলে আনেন পরিচালক জগন্নাথ গুহ! যে ধারাবাহিক আজও লোকে আগ্রহ নিয়ে দেখে পদে-পদে রোমাঞ্চিত হয়। অভিনেতাদের মুন্সিয়ানা বার করে আনা, নিখুঁত গবেষণা আর দুর্দান্ত সেট ডিজাইনে জগন্নাথ গুহ ছিলেন সবার আইডল। 'আবার যখের ধন' সিরিয়ালের পরিচালক হিসেবে তিনি আজ অনেকের কাছেই বিস্মৃত। কিন্তু 'আবার যখের ধন' তো ভোলার নয়। হবে না জগন্নাথ গুহর পরিপূরকও। আজ সেই ছোটবেলার 'আবার যখের ধন' সিরিয়ালের পরিচালক জগন্নাথ গুহ-সহ পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়-- সব অভিনেতাই প্রয়াত। এর পরে বহু ছবিতেই নেগেটিভ রোলে মাত করেছেন জগন্নাথ গুহ। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'পুরুষোত্তম' ছবিতেও মূল ভিলেনের রোল করেন জগন্নাথ গুহ। এছাড়াও ছবিতে প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী রায় তো ছিলেনই। চিরঞ্জিতের সঙ্গে 'দাঙ্গা' ছবিতেও তাঁর ভিলেন উপস্থিতি। তবে অন্য ধারার রোলও করেছেন। জগন্নাথ গুহর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য রচনা গুলির মধ্যে রয়েছে 'সলিউশন এক্স', 'মনোরমা কেবিন', 'ওগো প্রিয়তমা', 'বর বউ খেলা'। হিন্দি ছবির পাশাপাশি 'নেমসেক' এবং 'সিটি অফ জয়'-র মতো ছবিতেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। কাজ করেছেন অপর্ণা সেনের 'ঘরে বাইরে আজ' ছবিতে। অপর্ণা সেনের প্রতিটা ছবি হলে টিকিট কেটে দেখতেও যেতেন জগন্নাথ গুহ। জগন্নাথ গুহর চিত্রনাট্যে ও পরিচালনায় কাজ করেছেন এখনকার সিনিয়র আর্টিস্টরা, যারা তখন ছিলেন আশির নব্বইয়ের দশকে নবাগত নবাগতা। জগন্নাথ গুহর আশীর্বাদ পাওয়া দুই স্বনামধন্য শিল্পী, অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী ও শঙ্কর চক্রবর্তী জগন্নাথ গুহ ভাগ করে নিলেন তাঁদের স্মৃতি।

'জগাদা ভিলেন ব্র্যান্ডের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, একজন পরিপূর্ণ অভিনেতা পরিচালক': পাপিয়া অধিকারী

আমি তখন ছোট, একদম নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে। 'ইনফোকম' বলে একটা হাউস ছিল ওখানে প্রচুর টেলিফিল্ম হত। সেখানে জগন্নাথদার পরিচালনায় অনেক কাজ করেছি। সমরেশ বসু, মুন্সী প্রেমচাঁদের লেখা কাহিনি নিয়ে ধারাবাহিক করেছিলাম জগাদার ডিরেকশনে। তারপর জগাদার সঙ্গে এত বন্ধু হয়ে গেল যে আমার বিয়েতে জগাদা আর বৌদির আসা ,আমার বাড়িতে বা জগাদার বাড়িতে অনেক আড্ডা। জগাদাকে কিন্তু ভিলেন বলে স্ট্যাম্প দেওয়া উচিত নয়। আমাদের এখানে একটা খোপে ফেলে দেওয়া হয় শিল্পীকে। কিন্তু জগন্নাথদার অসম্ভব পাণ্ডিত্য ছিল। আমি যেহেতু সাহিত্যের ছাত্রী ছিলাম তাই সাহিত্য, বিদেশি ছবি, নাটক, থিয়েটার, বড় বড় পরিচালকদের নিয়ে আড্ডা দিতেন জগাদা। উনি ছিলেন জ্ঞান ও শিক্ষার প্রাণশক্তি। অনেক বলতেন, অনেক কিছু জানতেন। বলতেন 'থালাতে বেশি ভাত থাকে আর দামি তরকারি বাটিতে থাকে অল্প, তেমনি মূর্খ মানুষদের সংখ্যা ঐ ভাতের মতো বেশি। দামি তরকারির মতো বুদ্ধিমান মানুষদের জায়গা এ জগতে কম।' আমি বলতাম 'তোমার মতো মানুষরা?' বলতেন 'হ্যাঁ ধরে নে ধরে নে।' নতুন যাঁরা ছবি করছেন তাঁদের কাছেও কিন্তু জগন্নাথদার সঙ্গে আড্ডাটা ছিল খুব একটা শিক্ষনীয় ব্যাপার। আমাদের এখানকার ক্লাসিক ছবির সাথে বিদেশি ক্লাসিক ছবির সম্পর্ক নিয়ে কী অদ্ভুত সুন্দর আলোচনা হত। আমরা খুব আড্ডা মারতাম। সেগুলো আজ কোলাজের মতো সব ভেসে উঠছে। জগাদার স্ত্রী অসুস্থ হলে বৌদিকে হুইলচেয়ারে করেও জগাদা নিয়ে আসতেন সব আড্ডাচক্রে। ওঁর গুণের মধ্যে আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হল নান্দনিক শিল্প নির্দেশনা। সিনেমায় যাকে বলে আর্ট ডিরেকশন। নন্দনবোধটা ওঁর ভিতরে খুব ছিল।

জগাদা আমায় বলেছিলেন, 'জানিস তো ক্যাবিনেট অফ ডঃ ক্যালিগরি (Cabinet of Dr. Caligari) জার্মান ছবিতে অত আগে সাদা-কালো ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে কাগজের উপর এঁকে তার উপর আলো ছায়া ফেলে কী অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ তৈরি করেছেন। জার্মান ছবির টাকা তখন অত ছিল না বড় সেট করবার মতো, তাই ছবি করার জন্য কম খরচায় বহু মূল্যের নান্দনিকতা।' আমি নিজেও ব্ল্যাক অ্যানড হোয়াইট ছবিতে কাজ করেছি। তো জগাদা কত অল্প বাজেটের টেলিফিল্ম এভাবে করেছেন। দুটো মানুষ সোফায় বসে আছেন কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি এঁকে, আলোছায়া ফেলে দারুণ করে দিতেন। আজকে সবটাই মনে পড়ে যাচ্ছে জগাদার চলে যাবার খবর শুনে। কী আড্ডাই না মারতাম আমরা এবং পুরোটাই থিয়েটার ও সিনেমা সংক্রান্ত। পরচর্চা নয় বড়চর্চা হত আমাদের আড্ডায়।

'আমি সিরিয়াল করেছিলাম প্রথম  জগাদার হাতে': শঙ্কর চক্রবর্তী

আমার কাছে পরিচালক জগন্নাথ গুহ আগে। কারণ আমি সিরিয়াল করেছিলাম প্রথম ওঁর হাতে। 'মুন্সি প্রেমচাঁদের গল্প' ধারাবাহিকে 'ভেন্নো' বলে একটা গল্পে আমি অভিনয় করেছিলাম জগন্নাথদার পরিচালনায়। তখন দূরদর্শনে দেখানো হত 'মুন্সি প্রেমচাঁদের গল্প'। আমার এটা ছিল ছয় এপিসোডের একটা গল্প। তখন প্রথম পরিচয়। তারপর অনেক কাজ করেছি দূরদর্শনে এবং জি বাংলাতে। ভাল লাগছে না, সকালে খবরটা পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেছে।

Shankar Chakraborty News in Bengali, Videos & Photos about Shankar Chakraborty - Anandabazar.com

ভীষণ প্রাণখোলা উচ্ছল মানুষ ছিলেন। সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। ওঁর বাড়ি ম্যাডক্স স্কোয়ারে, সেখানে উনি সবার সঙ্গেই দেখা করতেন। নতুনদের সঙ্গেও সরাসরি নিজেই দেখা করতেন। ওঁর কাছে ছিল সবার অবারিত দ্বার। প্রচুর শিখেছি ওঁর থেকে। আমাকে হাঁটা শিখিয়েছিলেন, কীভাবে সঠিক পদ্ধতিতে হাঁটতে হয়। এছাড়াও ওঁর ইংরেজি সাহিত্যের উপর ভীষণ দখল ছিল। ইংরেজি ধারাভাষ্যকার হিসেবেও জগন্নাথদার খুব নাম ছিল। ইংরেজি উচ্চারণ ভীষণ ভাল ছিল এবং অসম্ভব ভাল কণ্ঠস্বর, যেটা ভীষণই দুর্লভ। মাদার টেরিজা যেদিন মারা যান তখন দূরদর্শনে যে ইংরেজি ধারাভাষ্য হয়েছিল সেটা জগন্নাথ গুহর কণ্ঠ ছিল। মানুষ হিসেবেও খুব দিলদরিয়া ছিলেন। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ওঁর বাড়িতে পার্টি চলত, কত মানুষ আসতেন।  সেই জগাদা একটু অন্যরকম হয়ে গেছিলেন বৌদি চলে যাওয়ার পর। একা হয়ে গেছিলেন। জগাদা চলে গেলেন, সেটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। জগাদা ভাল থেকো।

```