দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাতেও কি এবার ভিলওয়াড়া মডেল শুরু হতে পারে? সেরকমই ইঙ্গিত মিলেছে নবান্ন সূত্রে। জানা গেছে, যে সমস্ত গ্রামে ও এলাকায় কোভিড পজিটিভ কেস ধরা পড়েছে, সেই গ্রামগুলো সিল করে দিতে পারে সরকার। অর্থাৎ ওই সমস্ত গ্রামে কারও প্রবেশ ও সেখান থেকে বেরোনো পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
শোনা গেছে, কোথায় কোথায় এমন হবে তা মোটামুটি ভাবে চিহ্নিত করে ফেলেছে নবান্ন। সূত্রের খবর, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুুর, কালিম্পং-সহ বিভিন্ন জেলায় বিশেষ গ্রাম ও এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে সব জায়গাতেই প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে ভিলওয়াড়া মডেল।
বস্তুত, গতকালই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, "সারা রাজ্যের হটস্পটগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।" শুধু মুখে বলাই নয়, মানচিত্রে দাগ দেওয়া ছবিও দেখিয়ে ছিলেন তিনি সকলকে। তার পরে গতকাল রাতেই স্বাস্থ্য ভবনের তরফে ঘোষিত হয়, রাজ্যের হটস্পটগুলি চিহ্নিত করতে, সেখানে সংক্রমণের ধরন খুঁজে বার করতে, কী কী পদক্ষেপ করা যেতে পারে তা ঠিক করতে, ন'জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিশেষ একটি ডেটা অ্যানালাইসিস কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তার পর থেকেই অনেকে মনে করেছিলেন, সার্বিক লকডাউনে খানিকটা শিথিলতা এনে, বিশেষ জায়গাগুলি বা হটস্পটগুলির দিকে তীক্ষ্ণ ও তীব্র নজর দিতে চায় সরকার। সে ক্ষেত্রে ভিলওয়াড়া মডেলের কথাই মনে এসেছে সকলের। কারণ এভাবে কোনও এলাকাকে সংলগ্ন এলাকার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে অর্থাৎ আইসোলেট করতে পারলে তবেই সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকানো যাবে। তবে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ভবন বা নবান্নের তরফে কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি। তাই এখনই বিভ্রান্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
কী ঘটেছে ভিলওয়াড়ায়?
ভারতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার একদম প্রথম দিকে রাজস্থানের ভিলওয়াড়া জেলায় হু হু করে বেড়েছিল আক্রান্তের সংখ্যা। প্রথমে এক চিকিৎসকের হঠাৎই করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে ২০ তারিখ। জানতে পারার পরেই সেই চিকিৎসক যাঁদের চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁদের সকলেরই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে গেছিল স্বাভাবিক ভাবেই। সেই কারণে সঙ্গে সঙ্গে গোটা এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করা হয় এলাকাবাসীর তরফেই। জানিয়ে দেওয়া হয়, ভিলওয়াড়ায় করোনা ছড়িয়ে পড়েছে একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে। কারণ ওই হাসপাতালেই চিকিৎসা করতেন চিকিৎসক। ফলে অনেকেই মনে করেন, ওই চিকিৎসকের থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছে একাধিক ভিলওয়ারাবাসীর মধ্যে। এলাকা থেকে যাতে আর বাইরে না বেরোয়, সেই চেষ্টা শুরু করেন সকলে মিলে।
তাঁরা নিজেরাই খোঁজখবর নিয়ে খুঁজে বার করেন, মোট ১৭ জনের মধ্যে এখনও পর্যন্ত করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আন্দাজ করা যাচ্ছে। ওই ১৭ জনকেই আলাদা করে কোয়ারেন্টাইন করে দেওয়া হয় তাঁদের নিজের নিজের বাড়িতে। তার পরে পরীক্ষা করলে করোনা পজিটিভ মেলে তাঁদের। কিন্তু কোয়ারেন্টাইন সুষ্ঠু ভাবে পালন করার জন্য তাঁদের থেকে এলাকার অন্য কারও দেহে সংক্রমণ ঘটেনি আর। এই অবস্থাতেই লকডাউন করে দেওয়া হয় গোটা ভিলওয়ারা। প্রধানমন্ত্রীর জনতা কার্ফুর ঘোষণার আগেই কিন্তু নিজেদের ঘরের ভিতরে বন্দি করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তাঁরা। কারও আসাও বন্ধ করে দেন।
গ্রাম লকডাউন করার পরে প্রশাসনকে জানাতেই এলাকার সমস্ত বাড়িতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও সাহায্য করেছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা উপদেশ দিয়েছে। বহু মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে রান্না করা খাবার, যাতে তাঁদের কোনও ভাবেই বাড়ি থেকে বেরোতে না হয়।
এই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজস্থানের স্বাস্থ্য দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রোহিত কুমার সিং। তিনি জানিয়েছেন, রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রঘু শর্মা এর নাম দিয়েছেন ‘ভিলওয়ারা মডেল।’ রোহিত কুমার সিং জানিয়েছেন, এই জেলায় করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তেই প্রশাসন কড়া হাতে তা সামলানো শুরু করে দিয়েছিল। সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পুরো জেলায় লকডাউন হয়ে গিয়েছিল। কেউ যাতে বাড়ির বাইরে না বের হয়, সেদিক নজর রাখা হচ্ছিল।
করোনা রুখতে ভিলওয়াড়া মডেলের কথা বিশেষভাবে বলেছিলেন ক্যাবিনেট সচিব রাজীব গৌবাও। দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণার সময় কীভাবে সচেতনতা গড়ে তোলা যায় তার উদাহরণ দিতে বারে বারেই এই মডেলের কথা উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যাঁর বুদ্ধি ও দক্ষতায় ভিলওয়াড়া প্রায় করোনার প্রকোপ মুক্ত সেই আইএএস অফিসার রাজেন্দ্র ভাট এখনও লড়াই করছেন নিজের জেলাকে সবরকম ভাবে সুরক্ষিত রাখতে। ৫৬ বছরের আইএএসের কথায়, “আজ অবধি নতুন সংক্রমণের খবর নেই। ঘরে ঘরে সকলেই বিপদমুক্ত। আশা করছি ১ মে-র মধ্যে গোটা ভিলওয়াড়াকে ভাইরাস-মুক্ত ঘোষণা করতে পারব।”
এই পথেই কি হাঁটবে বাংলা? উত্তর সময়ই দিতে পারবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে এই ভিলওয়াড়া মডেলের কোনও তুলনা নেই।