দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই প্রথমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও বৈঠকে মুখোমুখি হলেন দিলীপ ঘোষ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বনাম বিজেপির রাজ্য সভাপতির বাকযুদ্ধ প্রতিদিনের। তবে সেটা দূর থেকে। কিন্তু এদিনই প্রথমবার নবান্নে কোনও সর্বদল বৈঠকে হাজির থাকলেন দিলীপবাবু। আর সেই উপস্থিতি টের পেল নবান্ন।
সর্বদল বৈঠকেও স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অভিযোগের গন্ধমাদন পর্বত পেশ করেন দিলীপ। আর তার জবাব দিতে মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও বেশি সরব হন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, সাংসদ সুব্রত বক্সি। সব মিলিয়ে তৈরি হয় তুমুল হইচই। একটা সময়ে পরিস্থিতি এমন হয় যেন বৈঠকে গলার জোরের প্রতিযোগিতা চলছে।
একই কাণ্ড ঘটে যখন বৈঠকে উপস্থিত বাম পরিষদীয় দলনেতা উমফানের ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তিনি স্পষ্টতই বলেন, ত্রাণের নামে লুঠ চলছে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন সুজনবাবু বলেন, উচ্চ প্রাথমিকে নিয়োগ বন্ধ, গ্রুপ ডি-তে নিয়োগ হচ্ছে না, জীবিকা সেবকরা ৩৮ মাস ধরে মাইনে পাচ্ছেন না, অথচ সরকারের নিজস্ব ঘর বাড়ি সাজাতে ৪০০ কোটি টাকা খরচ করছে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী তা নিয়ে আপত্তি করলে, পাল্টা গলা চড়ান সুজনবাবু।
রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে এই নিয়ে দু'বার সর্বদল বৈঠক ডাকলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী ৩০ জুন কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত আনলক ওয়ানের মেয়াদ শেষ হলে রাজ্য কোন পথে হাঁটবে তা নিয়েই মূলত আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে এদিন রাজ্যে পুলিশের আচরণ থেকে রেশন ব্যবস্থার দুর্নীতি সব অভিযোগ নিয়েই সরব হন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা মেদিনীপুরের সাংসদ দিলীপ ঘোষ। তুলে আনেন উমফানের ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও।
এদিন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও বাম নেতাদের তরফে মূলত সুজনবাবুই বলেন। তবে গলার জোরে সবাইকে ছাপিয়ে যান দিলীপ। কার্যত চুপ করেই থাকেন বৈঠকে হাজির অন্য দুই বিজেপি প্রতিনিধি জয়প্রকাশ মজুমদার ও মনোজ টিগ্গা।
এদিন অভিযোগের সুরে দিলীপ মুখ্যমন্ত্রীকে বলেন, এই রাজ্যে পুলিশের কাজই হয়ে গেছে বিজেপিকে আটকানো। লকডাউন থেকে উমফান সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বাঁধার মুখে পড়েছে বিজেপি কর্মী, নেতারা। আটকে দেওয়া হয়েছে বিধায়ক, সাংসদদেরও। এটা ঠিক হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। এই বক্তব্যের সময়ে বৈঠকে হাজির তৃণমূল কংগ্রেসের অন্য নেতারা জবাব দিতে গেলেও বারবার তাঁদের চুপ করাতে চান দিলীপ। বলেন, আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করছি। তিনিই জবাব দেবেন। আপনাদের কথা আমি শুনব না।
একাধিক বার একাধিক ইস্যুতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় সর্বদল বৈঠকে। তবে প্রত্যেকবারই সকলকে চুপ করানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি মন দিয়ে অভিযোগ শোনেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকী তিনি দিলীপ ঘোষের কাছে এটাও জানতে চান যে নির্দিষ্ট কোনও পুলিশ কর্তা বা কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে কিনা। জবাবে রাজ্য বিজেপি সভাপতি বলেন, কাকে বাদ দিয়ে কার নাম করব! জেলার সব পুলিশই তাই করছে।
এদিনই তৃণমূল কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষ তথা ফলতার বিধায়ক তমোনাশ ঘোষ মারা গিয়েছেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। করোনায় আক্রন্ত হয়েছিলেন মন্ত্রী সুজিত বসুও। দিলীপ এদিন বৈঠকে বলেন, একের পরে এক তৃণমূল নেতা, কর্মী করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাই বুঝিয়ে দেয় রাজ্যে ঠিক মতো লকডাউন মানা হয়নি। বিশেষ করে তৃণমূল নেতারা লকডাউন মানেননি। দিলীপ প্রশ্ন তোলেন, যে কাজ প্রশাসনের করার কথা রাজনীতির টানে সেই কাজ নেতারা করতে গিয়েই বিপদে পড়েছেন।
এদিনের বৈঠকে কেন্দ্রের সমালোচনাও করেছেন বামেরা। জানা গিয়েছে, তা নিয়ে শুরুতে কিছুটা উৎসাহিত ছিলেন তৃণমূলের নেতারা। কিন্তু তার পরই উমফানের ত্রাণের দুর্নীতি নিয়ে সরকারকে চেপে ধরেন বামেরা। শেষমেশ ঠিক হয় ত্রাণ থেকে যাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের সাত দিন সময় দেওয়া হবে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করার।
লকডাউন পর্বের গোটা সময়টাই রাজ্যের বিরুদ্ধে তোপ দেগে গেছেন দিলীপ ঘোষ। প্রতিদিন সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এদিন সর্বদল বৈঠকেও সেই সব প্রসঙ্গের কোনওটাই বাদ দেননি তিনি। কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্য লকডাউনের সময়ে সহযোগিতা করেনি বলেও এদিন সরব হন দিলীপ। আর তা নিয়ে তৈরি হয় উত্তপ্ত চাপানউতোর। তিনি বলেন, এই রাজ্যের বহু এলাকাতেই কেন্দ্রের নির্দেশ মতো লকডাউনের বিধি মানা হয়নি। আর তার ফলে রাজ্যের বিপদ বেড়েছে।
বাদ যায়নি পরিযায়ী শ্রমিক ফেরানোর প্রসঙ্গও। এসেছে উমফানের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে আসার কথাও। দিলীপ বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন, এই রাজ্যে অতীতে একদিনের নোটিসে দুর্গত এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর চলে আসার নজির নেই। সেটাও করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবু রাজ্য সরকার অসহযোগিতা করেছে।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে বিরোধী দলের প্রতিনিধি হিসেবে সব থেকে বেশি সরব ছিলেন দিলীপই। এদিন রাজ্যে লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর কথা মুখ্যমন্ত্রী বললেও প্রশ্ন তোলেন দিলীপ। বলেন, কী হবে লকডাউন বাড়িয়ে? এই রাজ্যে যেভাবে লকডাউন হচ্ছে তাতে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না।
এদিন বৈঠক থেকেই ঠিক হয় একটি সর্বদল কমিটি তৈরি করা হবে। দিলীপ ঘোষ এদিন ওই কমিটির মাথায় রাখার জন্য রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্রর নাম বলেন। যদিও তাতে রাজি হননি সুর্যবাবু। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী শাসকদলের কোনও প্রতিনিধিরই কমিটির মাথায় থাকা উচিত। শেষ পর্যন্ত সেই কমিটির মাথায় তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় থাকবেন বলে ঠিক হয়। সূর্যবাবু ও দিলীপবাবু অবশ্য ওই কমিটিতে থাকতে রাজি হন।
যে কোনও বৈঠকে অতিথি আপ্যায়নের ব্যাপারে কোনও ত্রুটি রাখেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকালই গেছে রথযাত্রা। সেই কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত এদিন বৈঠকের মেনুতে ছিল জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা। সঙ্গে অবশ্যই চা। তবে বিভিন্ন দলের বয়স্ক প্রতিনিধিরা কেউই তেমন ভাবে জিলিপি, পাঁপড়ের দিকে হাত বাড়াননি। দিলীপের প্লেট অবশ্য খালি হয়ে যায় মুহূর্তে।