
শেষ আপডেট: 9 May 2023 13:13
চৈতালী চক্রবর্তী
আজ এখানে, কাল সেখানে জনসভা করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। কখনও দিনে, কখনও সন্ধেবেলা মাইক হাতে বক্তৃতা দিতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে। দু’সপ্তাহ ধরে নাগাড়ে বকতে বকতে গলা ভেঙেছে অভিষেকের। রীতিমতো বসে গেছে গলা।
রাজনীতিকরা প্রায়ই এই সমস্যায় ভোগেন। শুধু তাঁরা নন, গায়ক, শিক্ষক থেকে বাসের কন্ডাকটর— অনেককেই পেশার কারণে খুব বেশি কথা বলতে হয়, কিংবা চেঁচামেচি করে হাঁকডাক করতে হয়। তাঁদের যখন তখন গলা ভাঙতে পারে বা স্বরে বদল আসতে পারে (laryngitis)। এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, গলাকে ঠিক রাখার সহজ উপায় কী, তা সবিস্তারে বললেন ডাক্তারবাবুরা।
গলা বসে গেলে বা গলা ভেঙে গেলে গার্গল করাটা একেবারে ঠিক নয়, জানালেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ইএনটি স্পেশালিস্ট ডা. সুমিত কুমার বসু। ডাক্তারবাবু বলছেন, “ঠান্ডা লেগে বা সর্দি হলে গলার স্বর বদলে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু যদি ওষুধেও না সারে তখনই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সর্দি-কাশি সেরে যাওয়ার পরেও যদি দেখেন দীর্ঘ সময় ধরে কণ্ঠস্বর আগের মতো হচ্ছে না তাহলে ডাক্তার দেখিয়ে নিতে হবে”। পেশার কারণে যাঁদের জোরে বা চেঁচিয়ে কথা বলতে হয় তাঁদের এমন সমস্যা বেশি হয়। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ল্যারিনজাইটিস (Laryngitis)।
কারও কারও ক্ষেত্রে বিষয়টি ক্রনিক, সারা বছরের। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় অন্তর গলার স্বর বসে যায়। এটি যদি ক্রনিক হয়, তবে ভয়েস থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তাঁদের পরামর্শ মতো থেরাপি করালে উপকার পেতে পারেন। আর যদি কয়েকদিনের নাগাড়ে কথা বলা বা চেঁচামেচির কারণে গলা ভেঙে যায় বা বসে যায় তাহলে বারে বারে ভেপার নিতে হবে।
ডাক্তারবাবু বলছেন, “গলা ভেঙে গেলে অনেকেই গরম জলে নুন দিয়ে বা বেটাডিন দিয়ে গার্গল করেন। গলা বসার দাওয়াই কিন্তু গার্গল করা নয়। বরং গার্গল করলে গলা আরও বেশি বসে যেতে পারে। তাই গরম জলের স্টিম নেওয়াটা বেশি দরকারি। দিনে দুই থেকে তিনবার গরম জলে স্টিম নিলেই ধীরে ধীরে গলা স্বাভাবিক হবে”। ডা: সুমিত কুমার বসু জানাচ্ছে, এরই সঙ্গে গলাকে আরামও দিতে হবে। কিছুদিন কথা কম বলতে হবে, চেঁচামেচি একদম বন্ধ রাখতে হবে। বিশ্রামই হল গলা ঠিক রাখার আদর্শ উপায়।

গলা ভেঙে যাওয়া বা বসে যাওয়ার সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভোগেন কিছু পেশার মানুষ। কলকাতার আমরি হাসপাতালের অভিজ্ঞ ইএনটি সার্জন ডা. চন্দন চক্রবর্তী বুঝিয়ে বললেন, গলা কেন ভাঙে এবং গলাকে ঠিক রাখার উপায় কী!
ডাক্তারবাবু বলছেন, “আইনজীবী, ডাক্তার, গায়ক, এমনকি ট্রেনের হকারদেরও এই সমস্যা হতে পারে। আমরা কথা বলি ভোকাল কর্ডের সাহায্যে। তারও একটা ক্ষমতা আছে, সহনশীলতার মাত্রা আছে। এই মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই বিপদটা হয়। কণ্ঠই যাঁদের জীবিকার সম্বল, তাঁদের কণ্ঠের ব্যবহারে সংযত হওয়া আবশ্যিক”।
তাঁর কথায়, “গলার ব্যবহার কতটা করতে হবে, কী মাত্রা অবধি কথা বলা উচিত তা খেয়াল করেন না অনেকেই। বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা জনসভা করার সময় এতটাই উচ্চস্বরে ও নাগাড়ে কথা বলে যান যা পরবর্তী সময়ে গিয়ে তাঁদের গলার জন্যই বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। প্রায়ই দেখা যায়, জনসভা করে বেরনোর পরে গলা ভেঙে গেছে বা বসে গেছে, ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরোচ্ছে। এর কারণই হল একটানা উচ্চস্বরে কথা বলা”।
গলার স্বর নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা ভোগেন বাস কন্ডাকটররা। ডা: চন্দন চক্রবর্তী বলেন, “বাসের কন্ড্যাকটররা একটা নির্দিষ্ট স্বরে উচ্চমাত্রায় কথা বলতে বলতে সেইরকমই আওয়াজ বেরোয় তাঁদের গলা দিয়ে। গলার স্বরে তখন কোনও সুর থাকে না, কর্কশ-ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ বেরোতে থাকে। গলার স্বাভাবিক স্বরের এই বদলটা হয় উচ্চস্বরে দিনের পর দিন চেঁচিয়ে যাওয়ার কারণে”।
তাঁর কথায়, বুঝতে হবে, আমাদের ল্যারিংক্স বা স্বরযন্ত্রের অবস্থান স্পর্শকাতর জায়গায়। বাইরে থেকে এটি দেখা যায় না। আপার এয়ারওয়ে এবং লোয়ার এয়ারওয়ের সংযোগস্থলে থাকে দু’টি ভোকাল কর্ড। এর পরে শুরু হয় ট্র্যাকিয়া বা শ্বাসনালি, যা ফুসফুসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ স্বরযন্ত্রের কারণে আমরা কথা বলতে পারি। শ্বাসনালির দরজায় এর অবস্থান হওয়ায় সুস্থভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচলের সঙ্গে ভোকাল কর্ডের সম্পর্ক রয়েছে। গলার স্বর পাল্টে যাওয়া মানে ভোকাল কর্ডের ছন্দে সমস্যা হচ্ছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর দেওয়াল মোটা হয়ে যায়। আবার অনেক সময় ভোকাল কর্ডের গায়ে ছোট ছোট নডিউল জমতে থাকে। তখন গলার স্বরে বদল আসে, গলা ভেঙে যেতে থাকে। দীর্ঘ সময় এটা চলতে থাকলে এবং গলার কোনও বিশ্রাম না হলে, তখন বিপদ ঘনাতে পারে। গলা পাকাপাকিভাবে খারাপও হয়ে যেতে পারে। গায়কদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়, রাজনীতিকও পার পান না।
গলার স্বর পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হল ল্যারেনজাইটিস। এটি দু’প্রকার হতে পারে। অ্যাকিউট এবং ক্রনিক। অ্যাকিউট ল্যারেনজাইটিস সাধারণত ঠান্ডা লেগে হয়। ঠান্ডা-গরম লেগে যাওয়া, বেশি এসিতে থাকা আবার হঠাৎ করে খুব জোরে চেঁচিয়ে কথা বলতে গিয়ে গলা বসে যাওয়ার কারণে এটা হতে পারে। তখন গলাকে বিশ্রাম দিতে হয় ও ভেপার নিতে হয়।
পেশার কারণে জোরে বা বেশি কথা বলতে হয় যাঁদের, তাঁদের ল্যারেনজাইটিস ক্রনিক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় ভোকাল কর্ডে ফ্লুইড জমতে শুরু করেছে। একে ডাক্তারি ভাষায় বলে ইডিমা। তখন গলাকে বিশ্রাম দিতে হয় এবং কিছু ওষুধপত্র দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
গলাকে বিশ্রাম দিয়ে, অ্যান্টি-বায়োটিক বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেয়েও যদি স্বাভাবিক স্বর ফেরত না আসে, সে ক্ষেত্রে বুঝতে হবে অন্য কোনও গুরুতর সমস্যা হচ্ছে। তখন দেরি না করে ইএনটি বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নেওয়াই ভাল। ইএনটি-র ডাক্তারবাবুরা গলায় ক্যামেরা ঢুকিয়ে এন্ডোস্কোপ বসিয়ে ল্যারিংক্সের জায়গাটি পরীক্ষা করে দেখেন। যদি দেখা যায় ছোট ছোট মুসুর দানার মতো নডিউল জমেছে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ওষুধেও যদি সুরাহা না হয় তাহলে মাইক্রো ল্যারিঞ্জিয়াল সার্জারি (Microscopic Laryngeal Surgery) করতে হয়। অপারেশন করে বাদ যাওয়া মাংসপিণ্ডগুলোর বায়োপসি করেও দেখে নেন ডাক্তারবাবুরা। বায়পসি রিপোর্ট যদি ম্যালিগন্যান্ট আসে তখন ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হয়। সেক্ষেত্রে রেডিওথেরাপিই বেশি করা হয়। তবে সেটা খুব জটিল পর্যায়ে গিয়ে।
অপারেশন করার পরেও নিয়ম মানতে হয়। গলাকে বিশ্রাম দিতে হয়, ডাক্তারবাবু যেমন বলে দেবেন তেমনভাবে কথাবার্তা বলতে হবে, ভোকাল কর্ডে খুব বেশি চাপ দেওয়া যাবে না, চেঁচামেচি একেবারেই করা যাবে না।
গলাকে ঠিক রাখার সবচেয়ে ভাল উপায় হল গলাকে বিশ্রাম দেওয়া। পেশার কারণে যদি বেশি কথা বলতে হয় বা উচ্চস্বরে কথা বলতে হয়, তাহলে গলাকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিশ্রাম দিতেই হবে। সেই সঙ্গে ভেপার নিয়ে যেতে হবে। ধূমপান, মদ্যপানে রাশ টানতে হবে। এইসব বদভ্যাস না থাকলে সবচেয়ে ভাল। হজমের গন্ডগোল থাকলেও অতিরিক্ত অম্লতার জন্য গলায় প্রভাব পড়ে। তাই গলা ভাল রাখতে বদহজমের সমস্যা দূর করা প্রয়োজন।