দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমান ভারতীয় দলে তাঁকে বলা হচ্ছে ইয়র্কারের রাজা। ছয়টি ডেলিভারির মধ্যে অন্তত তিনটি তিনি বিপক্ষ ব্যাটসম্যানের পায়ের কাছে বল ফেলে ব্রিবত করার চেষ্টা করবেনই।
ভারতীয় ক্রিকেটে যে নতুনদের জয়গান শুরু হয়েছে, সেই দলের তিনিও সদস্য, চেন্নাইয়ের বাঁহাতি পেসার থাঙ্গারাজু নটরাজনকে ঘিরে আবেগের স্রোত বইছে। ২৯ বছর বয়স হতে পারে, কিন্তু তাঁকে সেই ভাবে দেশের ক্রিকেটে ব্যবহার করা হয়নি। সেই নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
আইপিএলেও তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। যখনই সুযোগ পেয়েছেন, প্রমাণ করেছেন দাপিয়ে। কেউ যেন বলতে না পারেন, ওই তো সুযোগ পেল, কিছু করতে পারল না।
সালেম থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে চিন্নাপামাট্টি গ্রামে দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নটরাজনের। বাবা পাওয়ার মিলে ও মা মাংসের দোকানে কাজ করে কোনওক্রমে সংসার চালাতেন। ২০১১ থেকে পেশাদার হওয়ার মানসিকতা নিয়ে লড়াই শুরু। ছোটবেলায় বই, খাতা কেনার সমস্যা ছিল। পড়াশুনো করার ইচ্ছে থাকলেও সেইভাবে হয়ে ওঠেনি।
ক্রিকেট খেলার জন্য প্রাথমিক চাহিদা বলতে থাকে ভালমানের জুতো, একটি ক্রিকেট ব্যাট। কিন্তু সেটি কেনার সামর্থ্য ছিল না নটরাজনের পরিবারের। সেই কারণেই ছোট বয়স থেকেই পাড়ায়-পাড়ায় খেপ খেলে বেড়াতেন ছেলেটি। খেলার সরঞ্জাম কেনারও উপায় ছিল তাঁদের।
অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের কোনও ক্রিকেট না খেলে সরাসরিই তামিলনাড়ুর হয়ে ২০১৪ সালে রঞ্জি খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এরকম সাধারণত দেখা যায় না সচরাচর। একেবারে সিনিয়র দলে অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে তাঁর।
কিন্তু রঞ্জি অভিষেকের পরেই প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর বোলিং অ্যাকশন নিয়ে। তিনি বোলিং করলেই ঘরোয়া আম্পায়াররা নো ডাকতেন। নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই শুরু সেখান থেকেই। ত্রুটি শুধরে ফিরে আসেন নটরাজন, ২০১৭ সালে তাঁকে কেনে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। খেলতে খেলতেই কনুইয়ের অস্ত্রোপচার করাতে হয় তাঁকে।
তামিলনাড়ু প্রিমিয়ার লিগে ভাল খেলার সুবাদে তাঁকে দলে নেয় সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। ওই দলে সেইসময় ছিলেন মুরলীধরন। তিনি পরামর্শ দেন নটরাজনকে, কিভাবে তাঁর বোলিং অ্যাকশনকে ঠিক করে তিনি ফিরে এসেছিলেন, সেটি মুরলী বলেন চেন্নাইয়ের উঠতি তারকাকে। তারপর তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ভুবনেশ্বর কুমারও। পেস বোলিংয়ের খুঁটিনাটি শেখান ভুবি। তাঁকে পরিশীলিত করেন।
নটরাজনও চেন্নাইয়ের পেস ফাউন্ডেশনে ছিলেন, তবে তাঁকে সহায়তা করেছে হায়দরাবাদ দলের গ্রুমিং, আইপিএলের দৌলতে তাঁর কাছে বিদেশী তারকাদের বোলিং করার বিষয়টি ভালই রপ্ত হয়ে যায়।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়াগামী চারজন নেট বোলারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, তারপর ৯ নভেম্বর বরুণ চক্রবর্তীর চোটের জেরে তাঁর বদলি হিসেবে টি-২০ স্কোয়াডে সুযোগ, নেটে ভাল পারফরম্যান্সের জেরে ওডিআই স্কোয়াডেও অন্তর্ভুক্তি।
আর ডিসেম্বরের শুরুতেই মেন ইন ব্লু-র জার্সিতে জোড়া অভিষেক। ২ ডিসেম্বর ওডিআই অভিষেকে ২ উইকেট, তার ঠিক দুদিন বাদে ৪ ডিসেম্বর টি২০ অভিষেকে ৩ উইকেট। সীমিত ওভারে পারফরম্যান্সের সুবাদেই ৯ ডিসেম্বর টেস্ট সিরিজের জন্য নেট বোলার হিসেবে অস্ট্রেলিয়াতেই তাঁকে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
উমেশ যাদবের চোটের জেরে নতুন বছরের শুরুতেই টেস্ট স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তি। আর ১৫ জানুয়ারি টেস্ট অভিষেক। প্রথমদিনে ২টি সহ প্রথম ইনিংসে ৩ শিকার। যার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে শতরানকারী মার্নাস লাবুশেনের উইকেট।
নটরাজনের যে স্বপ্নের দৌড় শুরু হয়েছে, তাতে করে তাঁকে ঘিরেও আবেগ বৃত্ত বাড়ছেই, কে এলে কে থাকবেন, সেই অঙ্কের মধ্যেও তিনি ইংল্যান্ড সিরিজেও দলে রয়েছেন। যে এত কষ্ট করে উঠে এসেছেন, তাঁকে আটকায় কার সাধ্যি।