দ্য ওয়াল ব্যুরো: আশঙ্কা ছিলই। সত্যি হল।
করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট প্রজাতিও তার নতুন উপ-প্রজাতি তৈরি করে ফেলল গত কয়েকমাসের মধ্যেই। ভোলবদলে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের নতুন রূপ এখন ‘ডেল্টা প্লাস’। কতটা সংক্রামক সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে বড় উদ্বেগের কারণ একটা রয়েছে। তা হল, এই নয়া প্রজাতি নাকি কোভিডের অন্যতম ভরসাযোগ্য থেরাপি মনোক্লোনাল ককটেল অ্যান্টিবডির প্রভাবও নষ্ট করে দিতে পারে। তবে সবটাই এখনও গবেষণার স্তরে রয়েছে।
ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট থেকে কীভাবে এল ডেল্টা প্লাস?
করোনার ডবল ভ্যারিয়ান্ট (বি.১.৬১৭) প্রজাতির একটি উপ-প্রজাতি হল ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট (বি.১.৬১৭.২)। এই ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট আবার বিভাজিত হয়ে এবং জিনের গঠন বিন্যাস বদলে নতুন আরও একটি প্রজাতি তৈরি করে ফেলেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে ডেল্টা প্লাস (AY.1) ।
ভাইরোলজিস্টরা বলছেন, সার্স-কভ-২ ভাইরাসে র্যান্ডম মিউটেশন হয়, অর্থাৎ খুব দ্রুত জিনের বিন্যাস বদলে ফেলতে পারে। এই বদলটা ঘটতে থাকে পর পর। তাই একটি প্রজাতি থেকে কম সময়ের মধ্যেই চেহারা বদলে অন্য প্রজাতি তৈরি করে ফেলতে পারে। গত বছর করোনা অতিমহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ার পরে এখনও অবধি বহু প্রজাতি তৈরি করে ফেলেছে এই ভাইরাস, যার কয়েকটি সুপার-স্প্রেডার। সার্স-কভ-২ হল আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) ভাইরাস। এর শরীর যে প্রোটিন দিয়ে তৈরি তার মধ্যেই নিরন্তর বদল হচ্ছে। এই প্রোটিন আবার অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে সাজানো। ভাইরাস এই অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলোর কোড ইচ্ছামতো বদলে দিচ্ছে। কখনও একেবারে ডিলিট করে দিচ্ছে। এইভাবে বদলের একটা চেইন তৈরি হয়েছে। তাই ডবল ভ্যারিয়ান্ট থেকে ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট, আবার ডেল্টা থেকে ডেল্টা প্লাসে বদলটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে।

ডবল ভ্যারিয়ান্ট মানে হল দুবার জিনের বিন্যাস বদলাচ্ছে, দুটি মিউটেশন হচ্ছে যাদের নাম--
E484Q এবং L452R। এই বদল মানে হল অ্যামাইনো অ্যাসিড তার একটা অবস্থানে বদলে গিয়ে অন্য অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড বসিয়ে দিচ্ছে। যেমন--
E484Q মিউটেশন মানে হল
‘E’ অ্যামাইনো অ্যাসিড তার ৪৮৪ নম্বর অবস্থানে বদলে গিয়ে
‘Q’ কোড নিয়েছে। এইভাবে বদলটা চলতে থাকছে। ডবল ভ্যারিয়ান্টের তিনটি শাখা--বি.৬১৭.১, বি.১.৬১৭.২ ও বি.১.৬১৭.৩। এর মধ্যে ডেল্টা বা বি.১.৬১৭.২ ভ্যারিয়ান্টে চার রকম বদল হচ্ছে, মানে চার বার অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড বদলে যাচ্ছে।
আর নতুন ডেল্টা প্লাসে K417N মিউটেশন হচ্ছে, অর্থাৎ k অ্যামাইনো অ্যাসিড তার ৪১৭ নম্বর জায়গায় বদলে গিয়ে N অ্যামাইনো অ্যাসিডে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বদলের কারণে নতুন প্রজাতি ডেল্টা প্লাস আরও কিছুটা সংক্রামক হবে এটা আশা করাই যায়।
কোথায় পাওয়া গেছে ডেল্টা প্লাস?
গ্লোবাল রেসপিরেটারি জিনোমিক ডেটা তথা ‘গ্লোবাল ইনিসিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা’ (GISAID)-এর রিপোর্ট বলছে, ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়ান্টের ৬৩টি জিনোম (জিন) খুঁজে পাওয়া গেছে যার মধ্যে অ্যামাইনো অ্যাসিডের ওই বদলটা হচ্ছে। ভারতে ৭ জুনের পর থেকে ছ’জন কোভিড রোগীর নমুনায় পাওয়া গিয়েছে ডেল্টা প্লাস প্রজাতি।
ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকাতেই এখনও অবধি এই নতুন প্রজাতির খোঁজ বেশি মিলেছে। কানাডা, জার্মানি ও রাশিয়ায় একজনের নমুনায়, নেপালে দু’ জনের, সুইৎজারল্যান্ডে চার জনের নমুনায়, পোল্যান্ডে ন’জন, পর্তুগালে ১২ জন ও জাপানে ১৪ জন রোগীর নমুনায় এই নয়া প্রজাতি পাওয়া গেছে।
কতটা সংক্রামক?
ভারতে নীতি আয়োগের সদস্য (স্বাস্থ্য) ডক্টর ভি কে পল বলছেন, ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের মতো ডেল্টা প্লাসকে এখনও উদ্বেগজনক কোভিডের প্রজাতি বলে নিশ্চিত করেননি বিজ্ঞানীরা। এই প্রজাতির খোঁজ সবেমাত্র পাওয়া গেছে। ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট তার রূপ বদলেছে এটা নিশ্চিত, তবে তার উপ-প্রজাতি কতটা প্রাণঘাতী এ ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণার পরেই জানা যাবে। তার আগে এতটা আতঙ্কের কোনও কারণ নেই বলেই দাবি করেছেন তিনি।