শঙ্খদীপ দাস
টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির কথা মনে পড়ে?
ইউপিএ জমানায়, মনমোহন সিংহ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, স্পেকট্রাম দুর্নীতির। বলা হয়েছিল, টুজি স্পেকট্রামের লাইসেন্স কিছু বেসরকারি টেলিকম সংস্থাকে পাইয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন টেলি যোগাযোগ মন্ত্রী এ রাজা। তার ফলে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল কোষাগারে!
নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি তখন বলেছিল, লুঠ হয়েছে লুঠ! পেটোয়া কোম্পানিকে লাইসেন্স পাইয়ে দিয়ে এ রাজা ঘুষ নিয়েছেন। চোদ্দর ভোটে বলতে গেলে সেই এক অস্ত্রেই তারা বধ করেছিল কংগ্রেসকে।
পাঁচ বছর পর সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ফের ফিরে এলো ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ভূত।
সোমবার সন্ধ্যাতেই জানা গিয়েছে, সরকারের আর্থিক ঘাটতি মেটাতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার ভাঁড়ার থেকে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকারকে। কেন তা দেবে? বলা হচ্ছে, গত আর্থিক বছরে সরকারের কম কর আদায় হয়েছিল। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য দেওয়া হচ্ছে, ১ লক্ষ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এরই পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে খরচের জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আরও দিচ্ছে ৫২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
সরকারের একটি সূত্রের বক্তব্য, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের থেকে এই টাকা আদায়ের জন্য গত বছর থেকেই উঠে পড়ে লেগেছিল অর্থমন্ত্রক। তখন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ছিলেন অরুণ জেটলি। এমনকি এই টানাপোড়েন কাটাতেই সরকার তাঁদের পছন্দের আমলা শক্তিকান্ত দাসকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর করেছিল বলে অনেকের মত।
মোদী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারের ওই চাহিদা মেটাতেই সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। অর্থনীতিকরাও অনেকে এ ব্যাপারে সরব। তাঁদের বক্তব্য, এই ঘটনা প্রমাণ করে মোদী সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গলদ রয়েছে। নোটবন্দি, তাড়াহুড়ো করে পণ্য পরিষেবা কর ব্যবস্থা চালু করা- এ সবের মধ্যে যতটা নাটুকেপনা ছিল, ততটা দূরদৃষ্টি ছিল না। তারই খেসারত দিতে হচ্ছে এখন।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, পাঁচ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির কথা বলে এখন হিন্ডেলিয়ামের বাটি নিয়ে ভিক্ষা করতে বেরিয়েছে মোদী সরকার। আর রাহুল গান্ধী রাখঢাক না করে বলেছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে টাকা চুরি করছে মোদী সরকার। অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে কী করবেন ভেবেই পাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী। বাস্তব হল, এই বিপর্যয় তাঁরা নিজেরাই তৈরি করেছেন। তাঁর কথায়, এ যেন ডিসপেনসরি থেকে কেউ ব্যান্ড এইড কিনে এনে নিজের ক্ষতের উপর লাগাচ্ছে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, স্পেকট্রাম কাণ্ডকে এখন আর কেলেঙ্কারি বলা যায় কিনা প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, এ ব্যাপারে তদন্তে এ রাজা, কানিমোজি—কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় নি। সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। কিন্তু তাতে কী! ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বিতর্কের অভিঘাত ছিল জোরদার। জাতীয় স্তরে এটা প্রমাণ করে ছেড়েছিল যে কেন্দ্রে দুর্নীতিপরায়ণ সরকার চলছে।
কিন্তু এ বার? রাহুল গান্ধী চুরির অভিযোগ তুললেও খাতায়-কলমে অবশ্য এখনও বলা যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে যে কথাটা বিরোধীরা বাজারে চাড়িয়ে দিতে চাইছেন, তা হল অর্থনীতিকে ম্যানেজ করতে পারছেন না মোদী বাহিনী। আচ্ছে দিনের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে অর্থনীতিতে ধারাবাহিক ভাবে ডাহা ফেল তাঁর সরকার। শিল্পে উৎপাদন কমে গিয়েছে। নতুন বিনিয়োগ নেই। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। উপরি বেসরকারি ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ ছাঁটাই হচ্ছে। আর্থিক বৃদ্ধির হারও খুবই হতাশাজনক।
অনেকের মতে, এই পরিস্থিতি মোদী সরকারকে যে চাপে ফেলে দিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। কখনও কাশ্মীর, কখনও চিদম্বরম করে মানুষের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বিজেপি। কিন্তু শাক দিয়ে আর কতদিন মাছ ঢাকা যাবে?
এই সব সাত পাঁচ আলোচনা যখন চলছে। তখন ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকার আরও একটি রহস্য সামনে চলে এসেছে। কেন্দ্রে দ্বিতীয় বার সরকার গঠনের পর নতুন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন সংসদে বাজেট পেশ করেন। তাতে দেখা যায় যে ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকার হিসাবের গরমিল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের অর্থনীতিবিদ রথীন রায় সবার প্রথমে সেই গরমিলের কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখান। তিনি বলেন, সরকার বাজেটে যে রাজস্ব আদায়ের কথা বলেছে, আর্থিক সমীক্ষার তুলনায় তা ৩ শতাংশ বেশি। হিসাব করে দেখা যায়, ৩ শতাংশ মানে প্রায় ১ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকা।
সেই প্রসঙ্গ সামনে এনে এখন অনেকে বলছেন, তা হলে কি বাজেটে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ঘাটতি লুকোনোর চেষ্টা হয়েছিল? এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে টাকা নিয়ে তা মেটানো হচ্ছে?
এ ব্যাপারে প্রশ্নের মুখে পড়ে মঙ্গলবার নির্মলা সীতারমন বলেন, “অদ্ভুত তো! এ সব কথা কেন বলা হচ্ছে? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর বিমল জালানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এই অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন তোলা মানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।” সরকারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে অভিযোগও খারিজ করে দিতে চান তিনি।