
শেষ আপডেট: 26 April 2019 10:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে-র দিনে একাধিক জনপ্রিয় গির্জা এবং একাধিক হোটেলে ভয়াবহ ধারাবাহিক বোমা হামলার পরে এখনও থমথম করছে গোটা শ্রীলঙ্কা। ইতিমধ্যে ঘটনার জন্য দায় স্বীকার করেছে ভিডিও প্রকাশ করেছে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী।
দেশের সরকারও প্রথম থেকেই জানিয়েছিল, দেশের চরমপন্থী ইসলাম সংগঠন 'ন্যাশনাল তওহিদ জামাত' এই হামলার পেছনে রয়েছে। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীরও যোগসাজশ আছে বলে জানিয়েছিল তারা।
কিন্তু ইসলামপন্থী সংগঠনের নাম আসার পর থেকেই ভয়-ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে, যারা সেখানে ধর্মীয় ভাবে সংখ্যালঘু। এর মধ্যে যে সব এলাকায় হামলা হয়েছিল, তার একটি জায়াগা নিগম্বো থেকে বহু মুসলমান সরে পড়েছেন পাল্টা হামলার আশঙ্কায়। অত্যাচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়ে অনেক মুসলিম বলছেন, তাঁরা এখন একটি ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্যে আছেন। কোনও রকম অপরাধ না করেও, শুধু নির্দিষ্ট ধর্মপালনের 'অপরাধে' তাঁরা সকলের সন্দেহভাজন। সূত্রের খবর, নিগম্বোর এই মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় অংশই আহমদীয়া সম্প্রদায়ের। তাঁদের অনেকেই আপাতত একটি স্থানীয় মসজিদে আশ্রয় নিয়েছেন, যার সুরক্ষার দায়িত্বে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকারের তরফে। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহও স্বীকার করেছেন, যে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের অনেকে বিনা কারণে হামলার শিকার হচ্ছেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে অনুরোধ করেছেন, কোনও অবস্থাতেই উত্তেজনা না ছড়াতে, কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানাতে। আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে।
পরিসংখ্যান বলছে, শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যা দু'কোটি ১০ লক্ষ, যার মধ্যে ১০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। নিগম্বোর প্রায় ছ'শো আহমদীয়া ফায়জুল মসজিদে আশ্রয় নিয়েছেন। এটি শ্রীলঙ্কায় আহমদীয়াদের পাঁচটি মসজিদের একটি। তাঁরা যে সব বাড়িতে থাকতেন, তার অধিকাংশেরই মালিক ক্যাথলিক খ্রিস্টান। সেই মালিকেরাও তাঁদের ভাড়াটেদের জন্য নিজের বাড়ি নিরাপদ মনে করছেন না অনেকেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুসলমান বলেন, "আমার বাড়ি সেবাস্তিয়ান গির্জার কয়েকটি রাস্তার পরেই। হামলার পরে বাড়ির মালিক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন নিজেই। আমায় তিনি বলেন নিরাপদ কোনও জায়গায় চলে যেতে। প্রশ্ন করেছিলাম, আমি তো কিছু করিনি, তা হলে আমি কেন পালাব! ওঁর কাছে উত্তর ছিল না।"
জানা গেছে, নিগম্বো শহরের সেবাস্তিয়ান গির্জায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনার পর থেকেই ওই এলাকার মুসলিমদের নানা ভাবে হুমকি দিচ্ছেন স্থানীয় বৌদ্ধরা ও খ্রিস্টানরা। গত বুধবার কলম্বোর কাছের এই বন্দরনগরী ছেড়ে পালিয়েছেন কয়েকশো মুসলিম। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই মুসলিমদের প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এক মুসলিম প্রৌঢ়া জানাচ্ছেন, রবিবারের ঘটনার পর থেকে তিনি এখনও ঠিকঠাক ঘুমোতে পারেননি। তিনি বলেন, "আমি জানি, সারা পৃথিবীর মানুষ মুসলমানদের ওপর ক্ষিপ্ত। যাঁরা ঘৃণা করেন, তাঁরা এখন আরও বেশি ঘৃণা করবেন। কিন্তু আমাদের কী দোষ! আমরা তো স্বপ্নেও ভাবি না কারও ক্ষতি করার কথা! আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গাদাগাদি করে থাকছি। আমরা বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছি। জানি না, আর কখনও এ দেশের মাটিতে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারব কি না।"
শ্রীলঙ্কার মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমি আহমেদ বলেন, "আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। পুরো মুসলিম সম্প্রদায় এই হামলা চালায়নি। চালিয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা। আর সন্ত্রাসবাদীদের একমাত্র ধর্ম সন্ত্রাস।"
গত পাঁচ বছর ধরে ব্যবসার সূত্রে কলম্বোতে থাকেন বাংলাদেশের নাগরিক খালেকুজ্জামান সোহেল। তিনি বলেন, "আমরা যতটা না আতঙ্কগ্রস্ত তার চেয়ে বেশি লজ্জিত এবং দু:খিত। আমরা বিশ্বাসই করতে পারছি না, যে আমাদের ধর্মেরই কেউ এই দেশের ভেতরে এই ধরনের হামলা করতে পারে।"
কলম্বোতে মুসলিম সংগঠন ন্যাশনাল শুরা কাউন্সিলের একজন কর্মকর্তা আজমান আব্দুল্লাহ-ও বলেন একই কথা। "আমরা ক্ষুব্ধ, ব্যথিত। তার উপরে নানা ধরণের গুজব শোনা যাচ্ছে। হুমকি আসছে তবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের খ্রিষ্টান ভাইয়েরা বুঝতে পারছেন যে শ্রীলঙ্কায় বসবাসকারী সাধারণ মুসলিমরা কোনও ভাবেই তাদের ক্ষতি চায় না। এখানে সব সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করেন। কোনও সমস্যা নেই। তবে শুধু মুসলমান হিসেবে নয়, এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন।"
শ্রীলঙ্কায় ধর্মের দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধরা। আর দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে সে দেশের কট্টরপন্থী বৌদ্ধরা মুসমানদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। জারি হয়েছিল জরুরি অবস্থাও। ফলে রোববারের হামলায় মুসলিম সংগঠনের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক মুসলিম উৎকণ্ঠায় পড়েছেন।
