দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অতি পরিচিত শব্দ ছিল শ্বেতপত্র বা হোয়াইট পেপার। সরকারকে চাপে ফেলা বা বিরোধীদের জবাব দেওয়ার জন্য শ্বেতপত্র প্রকাশের হিড়িক ছিল নয়ের দশকের শেষ দিকে। তা চলতি শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্তও চলেছে। সময়ের নিয়মে রাজনীতির গতিপথ বদল করে, কত শব্দ তাতে হারিয়ে যায়। শ্বেতপত্রেরও যেন তাই হয়েছিল। বহুদিন পর তাকে ফেরালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সদ্য বাণিজ্য সম্মেলন (Bengal Global Business Summit 2023) শেষ হয়েছে। তা থেকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে যখন বিরোধীরা খোঁটা দিচ্ছেন, তখন জবাব দিতে শ্বেতপত্র ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন নেতাজি ইনডোরে তৃণমূলের সাংগঠনিক সভা ছিল। সেই সভায় শ্বেতপত্র ঘোষণার কথাটি একপ্রস্থ বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে নবান্নে মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, বাণিজ্য সম্মেলন নিয়ে সাত দিনের মধ্যে শ্বেতপত্র তৈরি করে ফেলতে হবে।
মমতার নির্দেশ, তাঁর মেয়াদে এখনও পর্যন্ত যে ক'টি বাণিজ্য সম্মেলন হয়েছে তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে সেই শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। অর্থাৎ ওই হোয়াইট পেপার শুধু এ বছরের বাণিজ্য সম্মেলনে সীমিত থাকবে না, তাতে এ যাবৎ সবকটি সম্মেলনের খতিয়ান থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর এও নির্দেশ, ওই হোয়াইট পেপার ‘ওয়াটার টাইট’ হতে হবে। অর্থাৎ ত্রুটিমুক্ত এবং টু দ্য পয়েন্ট। যাতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কেউ না পায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতার এই পদক্ষেপ পুরোপুরি রাজনৈতিক। তাঁর উদ্দেশ্য বিরোধীদের জবাব দেওয়া এবং রাজ্যের মানুষকে বোঝানো তৃণমূল সরকার যে শিল্পায়নের চেষ্টা করছে তা কতটা আন্তরিক।
বস্তুত হোয়াইট পেপার তথা শ্বেতপত্র নিয়ে অনেকের ধারণাই স্পষ্ট নয়। ব্যাপারটা মোটেই সাদা কাগজ নয়। আসলে তা হল একটি খতিয়ান। অতীতে বাজপেয়ী জমানায় যখন ঘন ঘন রেল দুর্টঘনা ঘটছিল, তখন রেলমন্ত্রী নীতীশ কুমার রেলওয়ে সেফটি নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিলেন। সেও ছিল বিরোধাীদের জবাব দেওয়ার একটা হাতিয়ার।
আবার মনমোহন সিংহ জমানায় লালকৃষ্ণ আডবাণী কালো টাকা তথা ব্ল্যাক মানি নিয়ে হোয়াইট পেপার প্রকাশের দাবি তুলেছিলেন। সুধীন্দ্র কুলকার্নির পরামর্শে আডবাণী নিজেও একটা রিপোর্ট তৈরি করে ফেলেছিলেন। তবে প্রণব মুখোপাধ্যায়রা আডবাণীর দাবি মানতে চাননি।
কেন্দ্রে মোদী সরকার গঠনের পর আডবাণী সেই শ্বেতপত্রের কথা আর কখনও তোলেননি। কালো টাকা বন্ধের জন্য সরকার নোটবন্দি করলেও তার ফল পাওয়া গেছে কিনা তা নিয়েও শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি ওঠেনি।
বুধবার বাণিজ্য সম্মেলনের শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এ বছরের বাণিজ্য সম্মেলনে ১৮৮টি মউ সাক্ষরিত হয়েছে। তাতে প্রস্তাবিত লগ্নির মোট পরিমাণ ৩ লাখ ৭৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, যে টার্গেট দিয়ে এবারের শিল্প সম্মেলন শুরু হয়েছিল, তার চেয়ে প্রস্তাবিত লগ্নির পরিমাণ শুধু অনেক বেশি তাই নয়, তা গতবারের রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। ২০২২ সালের সম্মেলনে ১৩৭টি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার ফলে ৩.৪২ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নির প্রস্তাব এসেছিল। মমতার কথায়, "আমাদের স্বপ্নপূরণ হল। অনেকে স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু সকলের স্বপ্ন পূরণ হয় না। তাই এবারের সম্মেলন খুবই ইতিবাচক ভাবে শেষ হল।"