
সঞ্জয়ের আইনজীবী সেঁজুতি চক্রবর্তী।
শেষ আপডেট: 21 January 2025 20:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরজি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায়কে (Sanjay Roy) যাবজ্জীবন কারাবাসের শাস্তি দিয়েছে শিয়ালদহ আদালত। সোমবার দুপুরে বিচারক অনির্বাণ দাস এই রায় ঘোষণা করার পরে জনমানসে আলোচনার ঝড় উঠেছে। একাংশ মানুষ তাঁর এই রায়কে স্বাগত জানালেও, ফাঁসির সাজা না হওয়া নিয়ে হতাশ অনেকেই।
তবে এসবের মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে সঞ্জয়কে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দুই মহিলা আইনজীবী, সেঁজুতি চক্রবর্তী এবং কবিতা সরকার। তাঁদের পেশাগত দক্ষতাও আলোচনার অবকাশ রাখে এই মামলায়।
সেই সরকারি আইনজীবী সেঁজুতি চক্রবর্তী (Sanjay Roy Lawyer Senjuti Chakraborty) এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ‘দ্য ওয়াল’কে। জানিয়েছেন এই মামলার খুঁটিনাটি, উত্তর দিয়েছেন বহু প্রশ্নের, এবং বলেছেন, তিনি ডেথ পেনাল্টির পক্ষে নন। ব্যাখ্যা করেছেন, ফাঁসির সাজাই কেন শেষ কথা হতে পারে না এধরনের অপরাধে।
এদিন সেঁজুতি জানান, ব্যক্তিগতভাবে কোনও আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি সঞ্জয়। তাই সরকারিভাবে আইনি সহযোগিতা করা হয়। কারণ আইনি সহায়তা প্রত্যকেরই পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘ফাঁসি চেয়ে কোর্টের বাইরে যে প্রতিবাদ চলেছে, তার সঙ্গে কোর্টের ভিতরের লড়াইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে হ্যাঁ পুরোটা ধরলে এই লড়াইটা সত্যিই কঠিন ছিল।’
ব্যক্তিগতভাবে সঞ্জয়কে কতটা কাছ থেকে দেখলেন বা বুঝলেন সেঁজুতি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রফেশনালি একজন আইনজীবী হিসেবে মক্কেলের সঙ্গে যেটুকু সম্পর্ক রাখতে হয়, সেটাই ছিল। মামলার স্বার্থে যেটুকু দরকার, সেটুকই চিনতে হয়েছে। তার ভিত্তিতে বলতে পারি, তিনি সব দিক থেকে আমাদের খুব ভাল ভাবে সহযোগিতা করেছেন।’
সোমবার সঞ্জয়ের সাজা ঘোষণার সময়ে বিচারক অনির্বাণ দাস মন্তব্য করেছেন, সঞ্জয়ের অপরাধ ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ নয়। কেন এমন বলেছেন তিনি?
এই প্রশ্নের উত্তরে সেঁজুতি বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্টের গাইডলাইনে বলে দিয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে ফাঁসি দেওয়া যায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ফাঁসি থেকে দূরে থাকতে হয়। পুনর্বাসনের জন্য সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। শাস্তির সব দরজা যখন বন্ধ তখনই একমাত্র ফাঁসির কথা বলা হয়েছে। এবার আপনারা বলতে পারেন, অপরাধী যে শাস্তি পেয়ে সংশোধিত হবে, তার গ্যারান্টি কোথায়? এটা জোর দিয়ে বলা যায় না ঠিকই, তবে মৃত্যুদণ্ড কখনওই শেষ কথা হতে পারে না।
তাহলে কি এতবড় ঘৃণ্য কাজের চূড়ান্ত শাস্তি পাবে না সঞ্জয়ের মতো অপরাধীরা?
সেঁজুতির কথায়, ‘এভাবে ঠিক-ভুল বলা যায় না। কারণ, নিম্ন আদালতের রায়ের পরে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিমকোর্টেও যাওয়ার জায়গা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফাঁসি নিয়ে চর্চা না করে মহিলাদের কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষার জন্য সিস্টেমের বদল নিয়ে আলোচনা করা উচিত। একটা দুটো ফাঁসি দিয়ে কিছুই হবে না, সিস্টেমের বদল দরকার। দরকার আলোচনা। কেন অপরাধ হয়, কীভাবে এর উৎপত্তি-এগুলো অনেক দীর্ঘ আলোচনা। সমাজ কী এগুলো নিয়ে আলোচনা করতে তৈরি? আসলে কিছু হলেই আমরা ফাঁসি, ফাঁসি বলে চিৎকার করি। কিন্তু ফাঁসি যদি সমাধান হত, তাহলে তো তারপরে আর অপরাধ হত না। বাস্তবে কি তা হয়?’
এখানেই না থেমে সেঁজুতির সংযোজন, ‘তাহলে তো আপনি বলতে পারেন, আমি কি শাস্তির বিরুদ্ধে? কখনওই তা নয়, কিন্তু আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে ডেথ পেনাল্টির পক্ষে নই।’
এর কারণ কী? সেঁজুতির উত্তর, ‘কর্মস্থলে আমরা কেউই সুরক্ষিত ইয়। তেমন পরিকাঠামোও নেই। এ ব্যাপারে কোনও সরকার কি যথাযথ পদক্ষেপ করেছে? এটা নির্দিষ্ট কোনও সরকার সম্পর্কে বলছি না। এটা নিয়ে চর্চা হওয়া উচিত। তা না করে যেটা কোনও সমাধান নেই, সেই ফাঁসি নিয়ে সমাজ সরব।’
সেঁজুতির বক্তব্য, ‘আসলে মেয়েরা এতটাই অসহায়, প্রতিদিন ভাবি আমার ওপর অত্যাচার হতে পারে, তাই কিছু উপায় না পেয়ে ফাঁসি ফাঁসি বলে চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু একটা দুটো ফাঁসি দিয়ে তো পুরুষতন্ত্রকে ঠেকানো যাবে না, বন্ধ করা যাবে না এই ধরনের জঘন্য অপরাধও। বরং কীভাবে সুরক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তুলব, সেটা নিয়ে চর্চা হওয়া জরুরি।’
পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘সরকার তো সেটাই চাইবে, আপনি ফাঁসি ফাঁসি করে ব্যস্ত হয়ে যান, বাকি প্রশ্নের উত্তরগুলো যাতে দিতে না হয়। এটা মানবাধিকার বনাম নারাবাদীর প্রশ্ন নয়। এটা সুরক্ষার প্রশ্ন।’