বলাই ছিল, নির্ধারিত দিন ২৮ অগস্টেই হবে পরীক্ষা। তাই হয়েছে। সিদ্ধান্তের একটুও নড়চড় হয়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Calcutta University) অস্থায়ী উপাচার্য (VC) শান্তা দত্ত দে (Shanta Dutta Dey) দেখিয়ে দিয়েছেন, সরকারের প্রচ্ছন্ন চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে কীভাবে পরীক্ষা করাতে হয়।

শান্তা দত্ত দে ও সুরেন্দ্রনাথ সান্ধ্য কলেজের অধ্যক্ষ
শেষ আপডেট: 28 August 2025 21:13
বলাই ছিল, নির্ধারিত দিন ২৮ অগস্টেই হবে পরীক্ষা। তাই হয়েছে। সিদ্ধান্তের একটুও নড়চড় হয়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Calcutta University) অস্থায়ী উপাচার্য (VC) শান্তা দত্ত দে (Shanta Dutta Dey) দেখিয়ে দিয়েছেন, সরকারের প্রচ্ছন্ন চাপের মুখে নতিস্বীকার না করে কীভাবে পরীক্ষা করাতে হয়। অন্যদিকে যে কর্মসূচি নিয়ে এত স্নায়ুযুদ্ধ, সেই তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP Foundation Day) প্রতিষ্ঠা দিবসও হৈ হৈ করে পালিত হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাই বলাবলি করছেন, শেষ হাসি হাসলেন 'বিজয়িনী' উপাচার্যই। কিন্তু, এই বিজয়িনীই একটা বিষয় নিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত। যার বিষয়বস্তু সুরেন্দ্রনাথ সান্ধ্য কলেজের অধ্যক্ষের কীর্তিকলাপ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সেমিস্টার (Calcutta University Exam) পরীক্ষার দিনেই নজর কেড়েছেন জাফর আলি আখান। বৃহস্পতিবার কলেজ চত্বরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (TMCP) পক্ষ থেকে সদস্যদের পোশাক বিতরণ করা হচ্ছিল। ওই কর্মসূচিতেই তিনি 'জয় বাংলা' লেখা হলুদ পাঞ্জাবি (Panjabi) পরে টিএমসিপি সদস্যদের পোশাক বিলি করছিলেন।
অধ্যক্ষ সাফাই দেন, ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধেই তিনি এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন। বলেন, “টিএমসিপির স্থানীয় ইউনিট এই আয়োজন করেছিল। ছাত্ররা আমায় ডেকে নেয়। বলল, অন্তত কয়েকটা পোশাক আপনি তুলে দিন। আমি তাদের অনুরোধ রেখেছি।"
একজন অধ্যক্ষের এহেন আচরণই মেনে নিতে পারছেন না কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শান্তা দত্ত দে। দ্য ওয়াল এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করলে, তিনি বলেন, "খুবই খারাপ ব্যাপার একটা। যখন ভদ্রলোক (পড়ুন অধ্যক্ষ) চিঠিতে সই করে লিখছেন, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা, অশিক্ষক কর্মীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না, সেই সময়ই আমার মনে হয়েছে, ওরে বাবা, একজন অধ্যক্ষ এ কথা বলছেন কী করে। ওঁর কাজ তো ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝানো। যখন চিঠি পাঠালেন, তখনই পরিষ্কার হয়ে গেছে উনি রাজনৈতিক দোষে দুষ্ট। তারও এক ধাপ এগিয়ে উনি পাঞ্জাবি পরে জামা বিতরণ করছেন। তিনি জানেন নিশ্চয়ই যে তাঁর এগুলোই করা কর্তব্য। এটাই সরকার শেখাচ্ছে, তিনি সেটাই করছেন। খুব দুঃখজনক। একজন উপাচার্য হিসেবে অধ্যক্ষের এই ব্যাপারটার আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।"
বৃহস্পতিবার মোটামুটি সকলেরই মনে প্রশ্ন ছিল, আদৌ আজ ঠিক করে পরীক্ষা করানো যাবে তো। শান্তাদেবীর কাছেও এটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিলই। দিনের শেষে দেখা গেছে, নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পেরেছেন ছাত্র-ছাত্রীরা। তবে ব্যাতিক্রম বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (Bardhaman University)। তারা একদিন আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, অনিবার্য কারণে ২৮ অগস্ট পরীক্ষা নেবে না।
এ ব্যাপারে শান্তাদেবীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্তটাও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর চাপ নিয়ে আসার জন্যই। কিন্তু, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক প্রাচীন, অনেক বড়। তিনি সাফাই দিয়েছেন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল না, যে কারণে দিন বদল করলেও তাতে কোনও প্রভাব পড়বে। আমার তাঁর কাছে প্রশ্ন, বদলালেও যদি ক্ষতি না হয়, তাহলে না বদলালেও তো ক্ষতি হত না। এর মানে আমি পরীক্ষার দিন বদল করে সরকারকে তুষ্ট করতে চাইছি। এই মানসিকতা থেকে উপাচার্যরা যে কবে বেরিয়ে আসবেন, আমি সেটাই ভাবছি। এটা করতে পারলে শিক্ষার অনেক উন্নতি হবে।"
তাঁর কথায়, "আমার বিশেষ করে ভাললাগছে, ছেলে-মেয়েরা যখন বলছে, নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিয়েছে এবং আমার নাম করে ধন্যবাদ দিচ্ছে। আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। অটোনমির ওপর সরকার হস্তক্ষেপ করছে, সেটাকে একেবারে গুরুত্ব দিতে চাইনি। আর এই পথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ পাশে থাকল, এটা বিশাল বার্তা গেল। সিন্ডিকেটের মেম্বাররা তাঁদের যুক্তিতে সরকার পক্ষের হয়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছিলেন। এটাই বিরাট ব্যাপার।"
দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের আগেই একপ্রস্থ সাংবাদিক বৈঠক সেরে নিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি বলেন, "যেদিন থেকে এই পরীক্ষা নিয়ে সরকারের সঙ্গে সরাসরি স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, তার আগে থেকেই আমরা পরীক্ষার দিন ঠিক করেছিলাম। কোনও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে দিন ঠিক করা হয়নি। একেবারে ক্যালেন্ডারের লাল দাগগুলো বাদ দিয়ে (ছুটির দিন) আমাদের পরীক্ষার দিন ঠিক হয়। একটা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা সেট করার জন্য যে বুদ্ধিমত্তার দরকার হয়, সেটা মাস্টারমশাইরা এবং অফিসাররা এত বছরের ধারাবাহিকতায় তৈরি করে এসেছেন, করেন। তারপর সেটা পাবলিশ হয়। ছাত্ররাও সেইভাবে তৈরি হতে থাকে। এটাই ইতিহাস, এটাই নিয়ম। কিন্তু এবারে যেটা ঘটল তা সেই ইতিহাসের ব্যাতিক্রম। হঠাৎ করে ২৮ অগস্টের পরীক্ষা নিয়ে ২৫ জনের মতো ছাত্র রাতের বেলা এসে উপাচার্যের ঘরে এসে বাকবিতণ্ডা শুরু করে। তারা বলতে থাকে ওই দিন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস, সুতরাং পরীক্ষার দিন পরিবর্তন করতে হবে। না হলে তাদের দলের কর্মসূচিতে সমস্যা হবে। আমরা সেটা শুনে অবাক হয়ে যাই। আদৌ তারা ছাত্র কিনা সেটা নিয়েও আমাদের মধ্যে সন্দেহ ছিল। আমরা জানাই উচ্চ শিক্ষা দফতরের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা হবে।"
তিনি আরও বলেন, "এরপর উচ্চ শিক্ষা দফতর থেকে আমার কাছে পার্সোনাল ফোন আসতে থাকে। বলতে থাকে আমরা যেন দয়া করে পরীক্ষাটা পিছিয়ে দিই। আমি জানাই, এটা তো পরীক্ষা পিছোনোর কোনও সঙ্গত কারণ নয়। এখন যদি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা দিবসের জন্য পরীক্ষা পিছোতে হয় তাহলে অন্যান্য সব ছাত্র সংগঠন একই দাবি করবে। কাজেই আমি জানিয়ে দিই, পরীক্ষা পিছোতে পারব কিনা সন্দেহ আছে। তখন জানানো হয় মুখ্যমন্ত্রী খোদ অনুরোধ করছেন। আমিও জানাই, ওঁকে যেন ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা হয়। এরকম বার দুয়েক ফোনে কথা বলার পর উচ্চ শিক্ষা দফতর থেকে একটা চিঠি চলে আসে। যেখানে লেখা ছিল 'কেউ একজন অনুরোধ করছেন' এই মর্মে। এরপরই এই বিশেষ চিঠির বিশেষ মর্যাদা দিয়ে আমরা সিন্ডিকেট মিটিং ডাকি। যেখানে উচ্চ শিক্ষা দফতরের দু-তিনজন ছিলেন। সেই দিন তুমুল তর্কাতর্কি হয়। এমনকি ওমপ্রকাশ মিশ্র বলতে থাকেন, এটা মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ, রাখা উচিত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায়, আমরা একটা ভোটাভুটি করি। তাতে সকলে নির্ভয়ে হাত তুলে আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানান। সত্যের জয় হওয়ার ছিল, সেদিন সেটাই হয়েছিল।"