দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিদ্যাসাগরই কি জিতিয়ে দিলেন? তাঁর সৌজন্যেই কি জয়ের 'মালা' পড়ল তৃণমূল কংগ্রেসের গলায়?
অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে, আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগের এমনই দিনটার কথা। ভোট-গণনা চলছে টানটান উত্তেজনায়। তৃণমূলের তখন রমরমে আধিপত্য। রাজ্যে ৩৪টা আসনে রয়েছে তারাই। তা সত্ত্বেও মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে 'কোনও রকমে' মুখরক্ষা করেছিলেন কলকাতা দক্ষিণের তৎকালীন হেভিওয়েট প্রার্থী সুব্রত বক্সী। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির পদে আসীন সুব্রতর এত সঙ্কীর্ণ মার্জিনের জয় তখন প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল দলের অন্দরেই।
শুধু তা-ই নয়। তার দু'বছর পরে ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটেও খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরে বিজেপির পাওয়া বিপুল ভোটের সংখ্যা দলের অন্দরেই খেপিয়ে তুলেছিল বড় অংশের তৃণমূল কর্মীকে।
সেখানে, এরকম একটা পরিস্থিতিতে, এ বছরের ভোটের হিসেব উল্টে গেল কলকাতা দক্ষিণে! প্রায় দেড় লাখ মার্জিনে জিতেছেন তৃণমূল প্রার্থী মালা রায়! অথচ রাজনীতির প্রাঙ্গণে খোঁজ নিলে জানা যাবে, কলকাতা কর্পোরেশনের বৃত্তের বাইরে দেখাই যায়নি এই মালা রায়কে। শহরের অন্য কোনও বিষয়ের রাজনৈতিক ইস্যুতে তেমন কোনও উপস্থিতিই চোখে পড়েনি তাঁর। রাজ্য রাজনীতি তো দূরের কথা।
অথচ সারা রাজ্যে যখন গেরুয়াবাহিনী প্রায় ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, জয়ের ব্যবধান যখন ক্রমেই কমে আসছে বিভিন্ন আসনে, তখন কলকাতা দক্ষিণে একাই হু হু করে এগিয়ে চলছিলেন মালা রায়, যিনি বলতে গেলে, প্রার্থী হিসেবে প্রায় নতুন মুখ তৃণমূলের। এক সময় ব্যবধান হয় প্রায় পাঁচ লাখ ভোটেরও।
রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা জানাচ্ছেন, এই বড় ব্যবধানে জেতার বড় কারণ, সাম্প্রতিক বিদ্যাসাগর-ইস্যু। চলতি মাসের ১৪ তারিখে কলকাতায় অমিত শাহ-র রোড শো ও প্রচার সভার শেষে বিদ্যাসাগর কলেজের একটি মূর্তি ভাঙা নিয়ে তুলকালাম পরিস্থিতি তৈরি হয় শহরে। অভিযোগ ওঠে, ভেঙে ফেলা হয়েছে বিদ্যাসাগরের প্লাস্টার অব প্যারিসের মূর্তি।
ঘটনায় তৃণমূল তীব্র আক্রমণ করে বিজেপিকে। দাবি করে, বাংলার ঐতিহ্য নষ্ট করতে উদ্যত বিজেপি। অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপির তরফে তৃণমূলের দিকে পাল্টা আঙুল তোলা হলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় প্রভাব পড়ে এই ঘটনার। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা নিয়ে দোষারোপের তরজায় বাঙালির ভাবাবেগে খুব পরিকল্পিত ভাবেই আঘাত করা গিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। আর সেই রাগটাই ভোটবাক্সে বিজেপির বিরুদ্ধেই উগরেছেন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার একটা বড় অংশের মানুষ।
শুধু তা-ই নয়। গোটা রাজ্যে আগ্রাসী ভাবে ভোট পেলেও, বিদ্যাসাগর মূর্তি কাণ্ডের পরে সপ্তম দফার লোকসভা ভোটের পরে যে ন'টি আসনে ভোট হয়েছে, তার সব ক'টিতেই বিজেপি হেরেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যাসাগর মূর্তি কাণ্ডের প্রভাব কি শেষ দফার ভোটে পড়েছে? আর সেই প্রভাবেরই একটা উদাহরণ কি মালা রায়ের বড় ব্যবধানে জয়?
যদিও তথ্য বলছে, বিদ্যাসাগর নিয়ে চিরকালীন আবেগ কোনও দিনই বাঙালির ছিল না তেমন। বরং সাম্প্রতিক এই ঘটনার পরেই গুগলের সার্চ হিস্ট্রিতে ঘনঘন জায়গা করে নিয়েছেন বিদ্যাসাগর। অনেকেই বলছেন, এই ঘটনাই তাঁকে নতুন করে চর্চায় আনল, যা এত বছরে আনতে পারেনি। কিন্তু সে যা-ই হোক, চর্চা থাকুক বা না থাকুক, বিদ্যাসাগর নামটাই যে বাঙালির আবেগকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, সপ্তম দফার আসনগুলিতে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট হয়তো সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।