শুভ্র মুখোপাধ্যায়
মানুষের জীবনটাই একটা সিনেমা। প্রতিদিনের জীবনচরিত যেন সেললুয়েডের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। একটা সময় কিভাবে দিন চলবে, সেই নিয়ে ভাবতে বসতে হতো ওই খুদে ক্রিকেটারকে। সেই আবেশ খান বর্তমানে দশ কোটি টাকার মালিক। আইপিএলের মেগা নিলামে আবেশকে দলে নিয়েছে লখনউ ফ্রাঞ্চাইজি।
বাবার ইন্দোরের বড় রাস্তার ধারে একটা পানের গুমটি ছিল। একদিন স্থানীয় প্রশাসন থেকে এসে আবেশের বাবাকে বলে দেয়, পানের গুমটি সরাতে হবে, কারণ রাস্তা বড় করতে হবে। কোনওরকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নয়, বরং নির্দেশ মেনে পানের গুমটি তুলে দিতে হয়। বাবা সন্ধ্যের দিকে অনেকসময় বসতে পারতেন না, সেইসময় পানের গুমটিতে বসতে হতো আবেশকে।
সেই গুমটি উঠিয়ে দেওয়ার পরে পুরো পরিবার অথৈ জলে পড়ে। বাবাই একমাত্র রোজগেরে ছিলেন সংসারে। আবেশ সেইসময় সবেমাত্র একটি ক্রিকেট ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে। সেটিও বন্ধ করে দিতে হয়, মুথ থুবড়ে পড়ে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু কারোর যদি চোখে ভরা স্বপ্ন থাকে, আর সেই ইচ্ছেকে সে যদি তাড়া করে, তা হলে চিনি জোগান চিন্তামণি, তাই আবেশের ক্ষেত্রে ‘ঈশ্বর’ হিসেবে দেখা দিলেন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার অময় কুরেশিয়া। তাঁর ইন্দোরে একটি কোচিং অ্যাকাডেমি ছিল। একদিন সেই অ্যাকাডেমিতে বোলিং করতে গিয়ে সকলকে অবাক করে দিল ছোট্ট আবেশ।
ব্যস, আর যায় কোথায়! শুরু হয়ে গেল নিবিড় ক্রিকেট অধ্যাবসায়। অময় সকলের থেকে টাকা নিলেও আবেশকে বিনা পয়সায় ক্রিকেট শিক্ষা দিতে থাকেন। সেইজন্যই আবেশ এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সেইসময় যদি অময় স্যার আমার পাশে না থাকতেন, তা হলে এইদিন আমার দেখা হতো না।
আবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলা বাংলার নামী পেসার ঈশান পোড়েল এদিন বলছিলেন, ‘‘আবেশের দারুণ মনের জোর। বারবার বলে একদিন ভারতের একনম্বর বোলার হবে। আমার তো মনে হয় সেইদিনও আর দেরি নেই। ওর ইন্দোরের বাড়িতেও গিয়েছি, আমাদের চেয়েও সাধারণ বাড়িতে থাকে, কোনওরকম দেখনদারী ব্যাপার নেই ওদের।’’
ছেলেকে ক্রিকেটার করবেন, এই স্বপ্ন দেখতেন আবেশের বাবা মহম্মদ আশিক খানও। তাই ব্যাঙ্ক থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার লোন নিয়েছিলেন ছেলেকে গড়ে তুলবেন বলে। আবেশও অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে বিদেশ সফর শেষে যে অর্থমূল্য পেয়েছিলেন, সবটাই বাবাকে দিয়ে বলেছিলেন, পাপা তুমি তোমার লোন শোধ করে দাও। এমনকি অনূর্ধ্ব ১৬ ভারতীয় শিবিরে থাকার সময় ১৭দিন শিবিরে থেকে যে ১৭০০ টাকা পেয়েছিলেন, সেটিও বাড়িতে এসে তুলে দিয়েছিলেন।
একটা সময় ভারতীয় এ দলের হয়ে ক্রিকেট খেলে সেই অর্থে চার হাজার টাকার জিনসের প্যান্ট কিনেছিলেন। সেই দেখে বাবা বলেছিলেন, পয়সার মর্ম বুঝতে শেখো, কষ্ট করে উপার্জনের টাকা বাজে খরচ করো না। সেই কথা মনে রেখেছেন আবেশ। তাই আইপিএল থেকে গতবারের অর্থ দিয়ে বাড়ি মেরামতের কাজ করেছেন। এমনকি দামী গাড়ির পিছনে না ছুটে একটি স্কুটার কিনেছেন ২৫ বছরের পেসার।
এবার ১০ কোটি টাকার মালিক হয়ে আবেশের জীবন কী বদলাবে? যে ক্রিকেটার জীবনের কালো অধ্যায় পেরিয়ে আলোর রাজপথে পা দিয়েছেন, তিনি আর যাইহোক বাকিদের থেকে একটু আলাদা তো হবেনই। মাথা ঘুরে যাওয়ার হলে অনেকদিন আগেই আবেশ হারিয়ে যেতেন।