দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘‘বোনকে বাঁচাতেই পিস্তল তুলেছিলাম,’’ পুলিশি জেরায় অকপট স্বীকারোক্তি দিল্লি দাঙ্গায় গ্রেফতার হওয়া সেই যুবকের। লাল শার্ট, টাইট জিন্স, পিস্তল হাতে পুলিশের দিতে তেড়ে যাওয়া যে যুবকের ছবি ও ভিডিও গত এক সপ্তাহ ধরে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং টপিক। মহম্মদ শাহরুখ। উত্তরপ্রদেশের বরেলী থেকে কিছুদিন আগেই যাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা (হত্যার চেষ্টা), ১৮৬ এবং ৩৫৩ ধারা এবং অস্ত্র আইনে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। আশ্চর্য এক কাঠিন্য রয়েছে শাহরুখের মধ্যে, পুলিশি হেফাজতেও তার তেজ কমেনি, বরং নিজের যুক্তিতে অটল—এমনটাই জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। শাহরুখের পরিচয়ের খোলস যত খুলছে, ততই চমকে উঠছেন দুঁদে পুলিশ কর্তারা।
কলেজ ফেল শাহরুখ টিকটক-পাবজি আসক্ত, মডেল হতে চাইত
নিজেকে ‘মাচো’ দেখাতে পছন্দ করত শাহরুখ। জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোই ছিল তার প্যাশন। নিজেকে মডেল হিসেবে গড়েপিঠে নেওয়া শুরুও করেছিল। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, টিকটকে প্রায়ই নিজের ভিডিও বানাত শাহরুখ। আসক্তি ছিল পাবজি গেমেও। ফ্যাশন ম্যাগাজিনে নিজের ছবি ছাপাতে চাইত। দুরন্ত গতিতে বাইক ছুটিয়ে আনন্দ পেত। এমন তরতাজা যুবক কীভাবে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সামিল হয়ে গেল সেটা ভেবেই পাচ্ছেন না তদন্তকারীরা।

পাঞ্জাবী গান নাকি তার খুবই পছন্দের। তার গানের একটি সিডিও পেয়েছে পুলিশ। বিএ পড়ার সময়ই কলেজ ছেড়ে দেয় শাহরুখ। মডেল হিসেবে নিজের পোর্টফোলিও বানানো শুরু করে। শাহরুখের বন্ধুরা জানিয়েছেন, পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে সে নাকি ছিল খুবই মিষ্টি স্বভাবের ছেলে। সকলের সঙ্গে মিশতে ভালবাসত। তবে উদ্দাম জীবনযাপনেও অভ্যস্ত ছিল। হুক্কা বারে গিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করত। তার এই স্বভাব নাকি খুব একটা পছন্দ ছিল না মায়ের।

অরবিন্দ নগরে যেখানে শাহরুখের বাড়ি তার আশপাশে একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের বাস। প্রতিবেশীরা অনেকেই বলেছেন, কখনও কোনও ঝামেলায় জড়াতে দেখা যায়নি শাহরুখকে। সে বদমেজাজি ছিল ঠিকই, তবে সকলের সঙ্গেই ভাল ব্যবহার করত। জেরায় শাহরুখ নিজেও জানিয়েছে, উন্মত্ত বিক্ষোভকারীদের দেখে সে মাথার ঠিক রাখতে পারেনি।
‘বোনকে বাঁচাতেই পিস্তল নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম’
পুলিশের খাতায় আগে কখনও নাম ওঠেনি শাহরুখের। পুলিশ জানিয়েছে, শাহরুখের নিজের একটি কারখানা রয়েছে। সেখানকারই কোনও এক কর্মীর থেকে পিস্তলটি কিনেছিল সে। জেরায় শাহরুখ বলেছে, তার বোন জাফরাবাদে সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল। জাফরাবাদ-মৌজপুরে যখন হিংসার আগুন জ্বলছিল তখন উন্মত্ত বিক্ষোভকারীদের মাঝে পড়ে গিয়েছিল তার বোন। তাকে বাঁচাতেই নাকি পিস্তল নিয়ে ছুটে গিয়েছিল সে। তদন্তকারীরা বলেছেন, সেদিন শাহরুখের হাতে সেমি অটোমেটিক ৭.৬৫ বোরের পিস্তল ছিল। মনে করা হচ্ছে বিহারের মুঙ্গের থেকে এই পিস্তল তার হাতে এসেছিল। পিস্তলে পাঁচটি গুলি ভরা ছিল। বিক্ষোভের দিন এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছিল শাহরুখ। যার মধ্যে পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি ছোড়ে সে। শাহরুখের গুলিতে সেদিন কেউ জখম হয়েছিলেন কিনা সেটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, শাহরুখের বাবা শাব্বিরের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগের মামলা চলছে। জাল নোট পাচারের অভিযোগও রয়েছে চার বাবার বিরুদ্ধে। শাহরুখের বাবা শিখ ছিলেন। মা মুসলিম। বিয়ের আগে ধর্ম পরিবর্তন করেন তার বাবা। নতুন নাম হয় শাব্বির।
দিল্লি থেকে পালিয়ে বরেলীতে গিয়েছিল শাহরুখ, লুকিয়ে ছিল গাড়ির মধ্যে
দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার অজিত শিংলার নেতৃত্বে একটি দল শামলীর বাসস্টপ থেকে পাকড়াও করে শাহরুখকে। পুলিশ জানিয়েছে, শাহরুখের ছবি ভাইরাল হওয়ার পরেই দিল্লি থেকে পিঠটান দেয় সে। সূত্র মারফৎ জানা গেছে, দিল্লি থেকে পালিয়ে জলন্ধরের দিকে রওনা দিয়েছিল শাহরুখ। সেখানে একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল তার। কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত সে বদলায়। জলন্ধরের বদলে বরেলীতে গিয়ে পৌঁছয়। পুলিশ জানিয়েছে, পিস্তল হাতে শাহরুখের ছবি তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। নেট দুনিয়ায় ধিক্কারের বন্যা বইছে।

প্রথমে নিজের মুখ ঢেকে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করে। পরে কন্নট প্লেসের কাছে পার্কিং লটের একটি গাড়ির মধ্যে ঘাপটি মেরেছিল দীর্ঘ সময়। বরেলীতে বেশ কিছুদিন এভাবেই পালিয়ে পালিয়ে বেরিয়েছে শাহরুখ। তদন্তকারীরা বলেছেন, বরেলী যাওয়ার আগে পানিপত, আমরোহা ও কাইরানাতেও কিছু সময় কাটিয়েছিল শাহরুখ। বরেলীতে যখন দেখে সে আর সুরক্ষিত নয়, তখন সেখান তেকে পালিয়ে যায় শামলী। হাতেনাতে ধরা পড়ে সেখানেই। শাহরুখের গোটা পরিবারই নাকি নিখোঁজ। তাদের খোঁজ চলছে।
তদন্তকারীদের দাবি, অপরাধের খাতায় নাম না উঠলেও একেবারেই নির্দোষ ছিল না শাহরুখ। পুলিশের অনুমান, দিল্লির বিক্ষোভে মদত দেওয়া চেনু গ্যাঙের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল শাহরুখের। বিক্ষোভ বা দাঙ্গার সময় অস্ত্রের যোগান দেওয়াই ছিল তার কাজ। দিল্লির হিংসায় কোন কোন গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করেচে শাহরুখ, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।