দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে যোগ। পুলওয়ামা কাণ্ডেও কি জড়িত ছিলেন তিনি? ২০০১ সালে সংসদ হামলায় নাম, আফজল গুরুর বিস্ফোরক অভিযোগ, পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ— জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ডিএসপি, ডাকাবুকো অফিসারের উর্দিতেই লেগেছে কালির দাগ। দেবেন্দ্র সিং। ১৯৯০ সাল থেকে খাকি উর্দি গায়ে চাপাবার পর থেকেই তাঁর সাহস ও বীরত্বের প্রশংসা ছিল পুলিশ-প্রশাসনে। উপত্যকার একাধিক এনকাউন্টারে সফল তিনি। একসময় ছিলেন পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপেও (এসওজি) । কর্মজীবনে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। হালে শ্রীনগর বিমানবন্দরের অ্যান্টি-হাইজ্যাকিং স্কোয়াডের অফিসার কীভাবে হিজবুলের প্রতি অনুরক্ত হয়ে উঠলেন, সেটাই ভাবাচ্ছে প্রশাসনকে।
শনিবার কুলগামের মীরবাজার এলাকা থেকে হিজবুল জঙ্গিদের সঙ্গে অস্ত্র সমেত ধরা পড়ার পরেই গ্রেফতার করা হয়েছিল ডিএসপি দেবেন্দ্রকে। ৪৮ ঘণ্টা জেল হেফাজতে রাখার পর ডিএসপি পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় তাঁকে। ১২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে জঙ্গিদের নিরাপদে সমতলে পৌঁছে দেওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন দেবেন্দ্র। হিজবুলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কতটা এবং জঙ্গিদের কীভাবে সাহায্য করছিলেন তিনি, তার তদন্ত শুরু করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। গোয়েন্দা সূত্রে উঠে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
পুলওয়ামার ত্রালে জঙ্গিদমন! দেবেন্দ্রর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে দুর্নীতির
শ্রীনগরের অমর সিং কলেজ থেকে পাস করার পর যোগ দেন জম্মু-কাশ্মীর পুলিশে। সেটা ১৯৯০ সাল। অল্পদিনেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মন জয় করেন দেবেন্দ্র। ১৯৯৪ সালে পুলওয়ামার ত্রালে স্পর্শকাতর এলাকায় পোস্টিং দেওয়া হয় তাঁকে। প্রথমে সাব-ইনস্পেকটর, পরে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের (এসওজি)সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পুলওয়ামায় একাধিকবার জঙ্গিদমন অভিযানে সাফল্য পান দেবেন্দ্র। টাস্ক ফোর্সের সক্রিয় সদস্যও ছিলেন তিনি।
এনআইএ জানিয়েছে, স্পেশাল অপারেশন গ্রুপে থাকার সময়েই তোলাবাজি ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ ওঠে দেবেন্দ্রর বিরুদ্ধে। জঙ্গিদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখার অভিযোগও উঠেছিল, তবে তার প্রমাণ মেলেনি। এনআইএর দাবি, এর থেকেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে সত্যিই সেইসব এনকাউন্টারে তিনি সফল ছিলেন, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও রহস্য লুকিয়ে ছিল। কয়েকমাসের জন্য বরখাস্তও করা হয়েছিল তাঁকে। গোয়েন্দাদের অনুমান, জঙ্গিদের থেকে বিপুল অর্থসাহায্য পেতেন দেবেন্দ্র। পরে পুলওয়ামা থেকে সরিয়ে শ্রীনগরের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পোস্টিং দেওয়া হয় দেবেন্দ্রকে। ২০০৬ সালে পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্টের পদ পান তিনি। চলতি বছরে তাঁকে শ্রীনগরর বিমানবন্দরের অ্যান্টি-হাইজ্যাক স্কোয়াডের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০১ সালে সংসদে হামলা, আফজল গুরুর সঙ্গে যোগ
২০১৩ সাল। ফাঁসির আগে বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন ২০০১ সালে সংসদ হামলার অন্যতম ষড়যন্ত্রী, কাশ্মীরের কুখ্যাত জঙ্গি আফজল গুরু। অভিযোগের তির দেবেন্দ্র সিংয়েরই দিকে। একটি চিঠিতে আফজল অভিযোগ করেন, জেল হেফাজতে তাঁর উপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালাতেন দেবেন্দ্র। আর এই অত্যাচার করা হত তাঁর থেকে টাকা আদায়ের জন্য। অভিযোগ আরও ছিল। আফজল গুরুর দাবি ছিল, সংসদ হামলার পিছনে দেবেন্দ্ররই মদত ছিল। তা ছাড়া এই হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আরও এক জঙ্গি মহম্মদকে নিরাপদে দিল্লিতে থাকার জন্য বাড়ি ও গাড়ির ব্যবস্থাও নাকি করে দিয়েছিলেন দেবেন্দ্র সিং। ফাঁসির আসামির বক্তব্যকে সেই সময় গুরুত্ব না দিলেও, বর্তমানে দেবেন্দ্র সঙ্গে জঙ্গিযোগের ভয়ঙ্কর অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। প্রশ্ন উঠেছে, বাজপেয়ী সরকারের আমলে হওয়া সংসদ হামলার পিছনে কি পুলিশ অফিসার দেবেন্দ্রই সক্রিয় ভূমিকা ছিল, নাকি পাকিস্তানের কোনও জঙ্গি সংগঠনের নির্দেশে ওই হামলায় মদত দিয়েছিলেন তিনি!
হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে যোগ, দেবেন্দ্রকে অস্ত্র চালান করত নাভিদ বাবু
গোয়েন্দাদের অনুমান, শ্রীনগরে পোস্টিংয়ের সময়েই হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে দেবেন্দ্রর। যোগাযোগ তৈরি হয় হিজবুল কম্যান্ডার নাভিদ মুস্তাক ওরফে নাভিদ বাবুর সঙ্গে। নাভিদ বাবু একসময় ছিল জম্মু-কাশ্মীর পুলিশেই। পরে হিজবুলের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে। শ্রীনগরে সেনার ১৫ কোরের সদর দফতরের পাশে ইন্দিরা নগরে দেবেন্দ্র বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে একে-৪৭ সহ নানারকম আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। মনে করা হচ্ছে, পুলিশ অফিসারের বাড়িতেই নিজেদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখত হিজবুল জঙ্গিরা। চলত টাকাপয়সার লেনদেনও। শনিবার জম্মু-ক্শ্মীর হাইওয়ে ধরে দিল্লির পথে যাওয়ার সময় দেবেন্দ্র আই-১০ গাড়িতে তাঁর পাশেই বসে থাকতে দেখা গিয়েছিল এই নাভিদ বাবুকে। উপত্যকায় ১১ জন শ্রমিক হত্যায় অভিযুক্ত নাভিদ ছিল জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গি।
অপারেশন ব্লু-প্রিন্ট, ধরা পড়লেন পুলিশ কর্তা
নাভিদের সঙ্গেই দেবেন্দ্র ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে ধরা পড়েছে হিজবুলের আরও সক্রিয় সদস্য রফি রাঠৌর এবং গাড়ির চালক কাশ্মীরের এক আইনজীবী, হিজবুলের সদস্য ইরফান শফি মীর। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শোপিয়ানে গিয়ে নাভিদকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন দেবেন্দ্র। সেখান থেকেই বাকিদের গাড়িতে তুলে রওনা দিয়েছিলেন দিল্লির দিকে। অনুমান করা হচ্ছে, দিল্লি, পঞ্জাব, চণ্ডীগড়ে একাধিক নাশকতার ছক কষছিল ওই হিজবুল জঙ্গিরা। রাজধানীতে লুকিয়ে থাকা হিজবুলের কোনও এক ঘাঁটিতে তাদের পৌঁছে দেওয়ার বরাত নিয়েছিলেন দেবেন্দ্র। কিন্তু সেই অভিসন্ধি সফল হয়নি। পুলিশ অফিসারের ফোন ট্র্যাক করে জঙ্গিদের সঙ্গে তাঁর গোপন কথাবার্তা ও ঘুষ নেওয়ার কথা জানতে পেরে গিয়েছিলেন শোপিয়ানের পুলিশ সুপার সন্দীপ চৌধুরী। তারপর থেকেই গোয়েন্দাদের কড়া নজরে ছিলেন দেবেন্দ্র সিং। জঙ্গিদের নিয়ে দিল্লি যাওয়ার ছক সামনে আসার পরেই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ডিআইজি অতুল গয়ালের নেতৃত্বে তৈরি হয় অপারেশন ব্লু-প্রিন্ট। জম্মু পুলিশের বিশ্বস্ত অফিসারদের নিয়ে তৈরি হয় বিশেষ টিম। হাইওয়ের একটি টানেলের ভিতর আটকানো হয় দেবেন্দ্র গাড়ি। জঙ্গি ও অস্ত্রসমেত ধরা পড়েন পুলিশ অফিসার।