
শেষ আপডেট: 2 May 2019 15:52
১৯৮১ সালে এক তাঁতি পরিবারে জন্ম হয় রাজেশ্বরীর। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সব চেয়ে ছোট। বাবা-মা কাজ করতেন স্থানীয় একটি কাপড়-কারখানায়। চরম অভাবে জর্জরিত পরিবারের পঞ্চম সন্তান যখন সেরিব্রাল পলসির মতো কঠিন এবং জটিল রোগ নিয়ে জন্মায়, তখন তার বেড়ে ওঠা যে খুব মসৃণ হয় না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু রাজেশ্বরীর বাবা-মা বহু কষ্টেও, সন্তানের লেখাপড়ার সঙ্গে কোনও আপস করেননি।
রাজেশ্বরীর হাত নেই দু'টো, হাঁটতে পারে না, মুখের কথাও স্পষ্ট নয়। প্রথম প্রথম তার মা-ই সব করিয়ে দিতেন। ব্রাশ করানো, চুল আঁচড়ানো, খাওয়ানো-- সবই। কিন্তু মাত্র ছ'বছর বয়স থেকেই নিজের কাজ নিজের মতো করে করতে শিখে যায় সে।
তার পরেই ভর্তি হয় স্কুলে। গ্রামেরই সরকারি স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ে সে। হাত নেই দু'টো, হাঁটতে পারে না, মুখের কথাও স্পষ্ট নয়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই, তার কলম যেন কথা বলত সাদা খাতার পাতায়। পায়ের দু'আঙুলের মাঝে কলম চেপে লিখত সে। অভ্যেস করতে করতে সেটাই সহজ এবং সহজাত হয়ে উঠেছিল। পরে করেসপন্ডেন্স কোর্সে মাধ্যমিকও পাশ করে রাজেশ্বরী।
১৯৯৯ সালে, রাজেশ্বরীর বয়স তখন ১৮। আচমকাই তীব্র অভাবের জেরে আত্মহত্যা করেন তেলঙ্গানার বেশ কিছু তাঁতি। ঘটনাটি ভীষণ ভাবে ছুঁয়ে যায় রাজেশ্বরীকে। সেই প্রথম, মনের মধ্যে জমে থাকা রাগ-কষ্ট-ক্ষোভ এক করে, একটি কবিতা লিখে ফেলে সদ্যতরুণী মেয়েটি। সেই শুরু।
রাজেশ্বরী বলেন, "আমি তো হাঁটতে পারি না, বেশি ক্ষণ বসতে পারি না, কথাও বলতে পারি না ঠিক করে। আমার পক্ষে তো পৃথিবীটা দেখা সম্ভবই নয় বাকিদের মতো করে। তাই আমি যা শুনি, যা বুঝি তা লিখেই প্রকাশ করি। কবিতাই যেন পৃথিবীর সঙ্গে আমার যোগসূত্র।"
সাম্প্রতিক নানা ঘটনা নিয়ে রাজেশ্বরীর বোধ, লেখালেখি-- এসব দেখে তাঁর এক শিক্ষক তাঁকে যোগাযোগ করিয়ে দেন একটি তেলুগু পত্রিকার সঙ্গে। সেখানেই রোজ কলাম লিখতে শুরু করেন রাজেশ্বরী। আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘ দিন লেখালেখি করেন তিনি। তাঁর কবিতাতেও বারবার প্রতিফলিত হয় জীবনের কথা, বেঁঁচে থাকার কথা।
আর এখানেই রাজেশ্বরীর জিত। যাঁর নিজের বেঁচে থাকায় এত কষ্ট, এত দ্বন্দ্ব, যিনি নিজে অন্যের সাহায্য ছাড়া এক পা চলতে পারেন না, তিনি প্রতিনিয়ত উপভোগ করছেন পৃথিবীকে। সব রকমের অনুভূতি দিয়ে চেখে দেখছেন যাপনকে। যিনি হাত দিয়ে কলমটুকুও ধরতে পারেন না, তিনিই হাসিতে-কান্নায় প্রকাশ করছেন নিজের শব্দ, পায়ের আঙুলে কলম ধরে।
সমস্ত প্রতিবন্ধকতার পরেও যিনি জীবনের কাছে হার না মেনে বহু মানুষের প্রেরণা ও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারেন, তিনিই আসল জয়ী। বারবার এমনটাই মনে করাচ্ছেন কবি রাজেশ্বরী।