
শেষ আপডেট: 14 October 2023 19:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো, বর্ধমান: পুজোয় বসেছিলেন পণ্ডিত মশাই। ঠিক তখনই মদ্যপান করে পরিবারের এক তন্ত্রসাধক বলে যাচ্ছিলেন, বামে গনেশায় নমঃ , দক্ষিণে কার্তিকেয় নমঃ। তা শুনে পণ্ডিত মশাই প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তন্ত্রের মাধ্যমে সকলকে দুর্গা প্রতিমার বামে গণেশ এবং দক্ষিণে কার্তিকের অবস্থান দেখিয়েছিলেন সেই তন্ত্রসাধক। তারপর থেকে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বামে গণেশ ও দক্ষিণে কার্তিককে রেখেই পুজো হয়ে আসছে সভাকর বাড়িতে। পূর্ব বর্ধমানের জামলপুরের সাদিপুর গ্রামের ওই পুজোতে এভাবেই তৈরি হয় দুর্গা প্রতিমা।
পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা দামোদর নদ লাগোয়া জামালপুরের বেরুগ্রাম। সনাতন ঐতিহ্য মেনে এই গ্রামের সভাকর বাড়ির সাবেকি মন্দিরে দেবী দুর্গার আরাধনা হয়। সভাকর পরিবারের বর্তমান বংশধর দেবাশিষ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁদের পূর্বপুরুষ ছিলেন বল্লাল সেন, লক্ষণ সেনের আমলের লোক। বর্গিদের অত্যাচারে নিজভূম ছেড়ে পূর্ব পুরুষরা পালিয়ে চলে আসেন সাদিপুর গ্রামে । সেখানেই তাঁরা বসবাস শুরু করেন ।
সভাকর বংশের আদি অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালী। তবুও মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ মেনে তাঁদের বংশের পূর্বপুরুষ উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় দেবী কালিকার বেদিতেই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। পুকুরের জল , বনের ফুল ,চালতার আচার আর থোড়ের নৈবেদ্য দিয়ে দুর্গাপুজো করতেন ব্রাহ্মণ উমাচরণ। সেই একই রীতি মেনে বাংলার ১১১১ সন থেকে আজও পুজো করে আসছেন এই পরিবারের সদস্যরা।
কথিত আছে, বহুকাল আগে বন্যার সময়ে দামোদরে পাটাতন সহ দুর্গা প্রতিমার একটি কাঠামো ভেসে আসে। স্থানীয় নাকড়া গ্রামের বর্গক্ষত্রীয় ধারা পরিবারের কয়েকজন সদস্য সেই কাঠামোটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ মেনে তারা সভাকর পরিবারের হাতে কাঠামোটি তুলে দেন। ওই কাঠামোতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে মাটির দেওয়াল আর খড়ের চালার মন্দিরে ব্রাহ্মণ উমাচরণ দুর্গাপুজো শুরু করেন। তবে সেই সময়কার কাঁচা মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালার মন্দিরটি এখন আর নেই। এখন ওই একই জায়গায় পাকা মন্দির তৈরি হয়েছে এবং সেখানেই প্রতি বছর পুজো হয়ে আসছে।
সভাকর পরিবারে সাবেকি আমলের একচালার কাঠামোয় আজও দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করা হয় । তবে এই সভাকর বাড়িতে দুর্গা প্রতিমায় সাধারণ রীতির ঠিক বিপরীত অবস্থানে দেখা যায় গণেশ ও কার্তিককে। এই বাড়ির প্রতিমায় গণেশ দেবী দুর্গার ডানদিকে না থেকে বাম দিকে, আর কার্তিক বামদিকের পরিবর্তে ডানদিকে অবস্থান করেন। কলা বউকে দুর্গা প্রতিমার ডানদিকে অর্থাৎ কার্তিকের পাশে রেখেই পুজো হয়। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অবস্থানে অবশ্য কোনও পরিবর্তন নেই । এই বাড়ির প্রতিমায় দুর্গার বাহন সিংহ সাদা বর্ণের। তার মুখটি আবার ঘোড়ার মুখের মত। রায়নার মহেশ পালের পরিবার পুরুষানুক্রমে সভাকর বাড়ির এমন ব্যতিক্রমী মূর্তি তৈরি করে আসছেন।