বাচিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'অনুপ্রাণন'-এর ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ‘অদম্য’। শ্রীকান্ত আচার্য ও বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর শ্রুতিনাটকে মন্ত্রমুগ্ধ দর্শক।

৫ বছর উদযাপনে বাচিক সংস্থা ‘অনুপ্রাণন’
শেষ আপডেট: 10 April 2026 16:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বসন্তের এক মনোরম সন্ধ্যায় কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক উজ্জ্বল রেখা টেনে দিল বাচিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘অনুপ্রাণন’। গত ৪ঠা এপ্রিল ছিল এই সংস্থার পাঁচ বছর ছোঁয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দীর্ঘ পথচলাকে উদযাপন করতে তারা বেছে নিয়েছিল ‘অদম্য’ শিরোনামের এক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক আর সৃজনশীল ভাবনার মেলবন্ধনে সেদিনের অনুষ্ঠানটি কেবল একটি বার্ষিকী উদযাপন ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল শুদ্ধ সংস্কৃতির এক অমোঘ মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল জনপ্রিয় শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য এবং অনুপ্রাণন-এর কর্ণধার নন্দিনী লাহা সোমের অনবদ্য উপস্থাপনা। মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত নাটক ‘সুন্দর’-এর শ্রুতিনাটক পাঠে দর্শকাসনে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। শ্রীকান্ত আচার্যের সেই ভরাট ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর আর পরিমিত অভিব্যক্তি সৌরভ চরিত্রটিকে যেন এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। অন্যদিকে, নন্দিনী লাহা সোমের স্বরাভিনয়ে মল্লিকা চরিত্রটি হয়ে উঠেছিল জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। দুই শিল্পীর যুগলবন্দীতে ‘সুন্দর’-এর সৌরভ আর মল্লিকার সম্পর্কের রসায়ন দর্শক মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।
মঞ্চে বাড়তি আমেজ নিয়ে আসেন বর্ষীয়ান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী এবং বাচিক শিল্পী মধুমিতা বসু। স্বপন গাঙ্গুলির কলমে ‘ফুলশয্যা’ নাটকের শ্রুতিনাটক পাঠে হাস্যরসের এক অপূর্ব ফোয়ারা ছোটে। বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর সহজাত অভিনয় দক্ষতা আর মধুমিতার সঠিক লয় ও ছন্দের ভারসাম্য দর্শকদের দারুণ আনন্দ উপহার দেয়।

‘অনুপ্রাণন’-এর বিশেষত্ব হল, তাদের বৈচিত্র্য। এদিনের অনুষ্ঠানে তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে তিয়াত্তর বছরের প্রবীণ— প্রত্যেক সদস্যেরই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই দীর্ঘ অনুষ্ঠানে দর্শকদের বিন্দুমাত্র ক্লান্তি স্পর্শ করতে পারেনি। আবৃত্তি এবং পাঠের মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল ইতিহাসের নানা অধ্যায়। ‘চিরপ্রণম্য অগ্নি’ পর্যায়ে ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর শহিদদের প্রতি বাচিক শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিত্বের বিবর্তনকে তুলে ধরা হয় ‘যাত্রাপথের আনন্দগান’ পর্বে, যেখানে কবির ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ থেকে ‘গীতাঞ্জলি’র দীর্ঘ যাত্রাপথ কবিতায় কবিতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
উপস্থাপনার বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘রাম রাবণের ছড়া’ থেকে শুরু করে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গা ছমছমে ভূতের গল্প— কিছুই বাদ যায়নি। খুদে সদস্যদের গলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ছড়া কিংবা সহজ পাঠের ‘বনে থাকে বাঘ’ দর্শকদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ থেকে ‘বলাকা’ হয়ে ‘কথা’ কাব্যের মাত্রাবৃত্ত ছন্দের চলনও দারুণ মুন্সিয়ানায় পরিবেশিত হয়। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী গল্প ‘খগম’-এর একটি সম্পাদিত রূপ শ্রুতিনাটক হিসেবে উপস্থাপনা করেন অনুপ্রাণনের তিন সদস্য, যা তাঁদের সৃজনশীল ক্ষমতার পরিচয় দেয়।
একক কবিতার জন্য রাখা হয়েছিল দুটি বিশেষ পর্ব। সেখানে যেমন ছিল বহুল পঠিত জনপ্রিয় সব কবিতা, তেমনই ছিল কিছু স্বল্পপঠিত রত্ন। নবীন থেকে প্রবীণ, প্রতিটি সদস্যের বাচনভঙ্গি এবং কণ্ঠের কাজ ছিল দেখার মতো। উল্লেখ্য যে, ঠিক বিকেল পাঁচটায় প্রার্থনার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্যায় ছিল ঘড়ির কাঁটা মেনে সুশৃঙ্খল। এই নিয়মানুবর্তিতা বর্তমান সময়ের অনুষ্ঠানগুলোতে বিরল।
পুরো অনুষ্ঠানটিকে দৃশ্য ও শ্রুতির দিক থেকে সার্থক করে তুলেছিলেন পর্দার আড়ালে থাকা কারিগররা। তরুণকান্তি বারিকের মিনিম্যালিস্টিক বা নূন্যতম সাজে সাজানো মঞ্চটি ছিল রুচিশীল। দীপঙ্কর দে-র আলোর ব্যবহার মঞ্চে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছিল এবং হাসি পাঞ্চালের নিখুঁত শব্দ প্রক্ষেপণ আবৃত্তির প্রতিটি সুরকে দর্শক কান পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছিল সার্থকভাবে। সব মিলিয়ে মাত্র পাঁচ বছরেই ‘অনুপ্রাণন’ যে বাচিক শিল্পের জগতে নিজের স্বতন্ত্র ও অদম্য জায়গা করে নিয়েছে, এদিনের আয়োজন ছিল তারই যোগ্য প্রমাণ।