
শচিন তেন্ডুলকর
শেষ আপডেট: 25 April 2025 07:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৪ অগস্ট, ১৯৯০। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে (Old Trafford) আসা দর্শকরা এক ক্রিকেট তারকাকে জন্মাতে দেখেছিল। জীবনের প্রথম শতরান করে নিজেকে বিশ্বক্রিকেটের মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন শচিন রমেশ তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)।
এরপর দশক গড়াবে। সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে একাধারে ব্যক্তিগত মাইলস্টোন অর্জন, দলের পরিত্রাতা হয়ে ওঠা, দেশের ক্রীড়াসংস্কৃতির আইকনের তকমালাভ—সবদিক দিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রতীকে পরিণত হবেন শচিন।
কিন্তু ‘প্রথম সবকিছু’র মতো প্রথম শতরানের অনুভূতিও তো স্পেশাল… অনেক কিছুর চাইতে আলাদা! আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এই পারফরম্যান্সকে ফিরে দেখেন শচিন। জানান পর্দার আড়ালে থাকা গল্পের কথা। বলেন, ‘১৪ অগস্ট আমি সেঞ্চুরি করি। আর তার পরদিনই আমাদের স্বাধীনতা দিবস৷ তাই সেই ইনিংসটা বেশ অন্যরকম ছিল। এর দৌলতেই পরের ওভাল টেস্ট পর্যন্ত সিরিজ বাঁচানোর স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে পেরেছিলাম। টেস্ট ম্যাচ বাঁচানোর অভিজ্ঞতাও ছিল নতুন।’
যদিও ইংল্যান্ড সফর নয়, কিশোর শচিনকে পরিণতি দিয়েছিল পাকিস্তান সিরিজ৷ আরও স্পষ্ট করে বললে শিয়ালকোটের সেই ইনিংস। যখন ওয়াকার ইউনুসের বোমারু বাউন্সারের আঘাতে নাক ভেঙে যাওয়ার পরেও, অনর্গল রক্ত ঝরা সত্ত্বেও মাঠ ছাড়েননি শচিন তেন্ডুলকর। তখন তিনি মাত্র ষোলো বছরের ক্রিকেটার। কেরিয়ারের অস্তাচলে দাঁড়িয়ে যদিও যন্ত্রণা নয়, যন্ত্রণাকে হারানোর জেদকেই সাফল্যের নিশান হিসেবে তুলে ধরেছেন শচিন। বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের মতো শিয়ালকোটেও আঘাত লাগা সত্ত্বেও আমি ৫৭ রান করি। আর সেই টেস্ট ম্যাচও আমরা বাঁচাতে পেরেছিলাম৷ সেটাও ৩৮ রানে ৪ উইকেট খুইয়ে ফেলার পর!’
এরপর জুড়ে দেন, ‘ওয়াকারের বাউন্সার এবং কষ্ট সত্ত্বেও খেলা চালিয়ে যাওয়া আমায় গড়ে তুলেছে। বিধ্বংসী আঘাত হয় তোমায় আরও শক্তিশালী করে তোলে অথবা তুমি চিরতরে হারিয়ে যাও৷’
শুধু পাকিস্তানের তুখোড় পেসার ওয়াকার নন, ইংল্যান্ডের ডেভন ম্যালকমকেও সেই সময় সামলেছিলেন শচিন। কৈশোরের গন্ধ শরীর ছেড়ে যায়নি। তা সত্ত্বেও অদ্ভুত পরিণতি ও বিচক্ষণতা দেখিয়ে দুজনের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য মেজাজে ধরা দেন বছর ষোলোর মুম্বইকর৷ এই অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শচিন বলেন, ‘ডেভন ও ওয়াকার ওই পর্বের অন্যতম গতিমান পেসার। বল করতেন ৯০ মাইল প্রতি ঘণ্টায়৷ তবুও ওয়াকারের বাউন্সারে চোট পেয়ে আমি ফিজিওকে ডাকিনি। যন্ত্রণাকে বিবশ করার শক্তি আগে ছিল, এখনও আছে। আঘাত পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে কী এসে যায়? বোলারের সামনে কাতরানো কখনও উচিত নয়।’
শিয়ালকোটের রৌদ্রতপ্ত দুপুরে যন্ত্রণায় নতমস্তক শচিন নতজানু হননি৷ জাভেদ মিঁয়াদাদের ক্রমাগত স্লেজিং (‘তোমার নাক ভেঙে গিয়েছে, তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে’)-এর সামনেও নয়। সাফ জানিয়েছিলেন: ‘আমি কিছুতেই মাঠ ছাড়ব না’।
কেন এতটা ভয়ডরহীন, এতখানি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চকিত স্বরে মাঠে রয়ে যাওয়ার ঘোষণা করেছিলেন তিনি? বহু বছর বাদে সেই রহস্য খোলসা করেন শচিন। বলেন, ‘আমরা ৩৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়েছিলাম। ওরা চাইছিল যাতে আমি চলে যাই। তাহলে তাড়াতাড়ি ম্যাচ গুটিয়ে ফেলা যেত। সেই কারণে মিঁয়াদাদ কানের চারপাশে গুনগুন করে চলে। খানিক বাদে হস্তক্ষেপ করেন অধিনায়ক ইমরান খান। জাভেদকে সরে যেতে বলেন তিনি৷’
আর সেই অভিজ্ঞতার শিক্ষা? শচিনের স্মৃতিরোমন্থন, ‘সেই মুহূর্তেই আমি বুজেছিলাম চোট-আঘাত তোমায় গড়ে তুলতে কিংবা ভেঙে ফেলতে পারে৷ আমি খুশি যে সেদিন ড্রেসিং রুমে ফিরে যাইনি। ব্যাটিং জারি রেখেছিলাম। সেই সুবাদেই শুধু ম্যাচ নয়, সিরিজও ড্র করে দেশে ফিরি।’
যন্ত্রণাকে কাবু করার মন্ত্র অবশ্য শিয়ালকোটে নয়, পেয়েছিলেন শিবাজি পার্কের জিমখানার মাঠে। মন্ত্রদাতা রমাকান্ত আচরেকর। মারাঠি গুরুর কঠোর অনুশীলন, নিবিড় তত্ত্বাবধান কোনও সাবেকি রুলবুক মেনে চলত না। টানা ২৫ দিন খেলা হয়েছে এমন রুক্ষ, ক্ষয়াটে পিচেই ব্যাট হাতে নামতে হত কিশোর শচিনকে। বোলারের নিরীহ ডেলিভারি আকছার বিষাক্ত হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছোবল দিত৷ নাকও বাদ যায়নি। রক্ত ঝরেছে। মাথা ঝুঁকেছে। তারপর ফের নামেমাত্র প্রোটেকশন দেয় যে খোলামুখ হেলমেট, সেটা মাথায় গলিয়ে শ্যাডো প্র্যাকটিস সেরে ক্রিজে নেমে পড়েছেন শচিন।
‘কোনি’ উপন্যাসে ক্ষিতীশ কোনিকে বাঁশের লগা নিয়ে তাড়া করতে করতে উন্মাদের ঢঙে বলে গেছিল: ‘... ফাইট কোনি ফাইট—মার খেয়ে ইস্পাত হয়ে উঠতে হবে। যন্ত্রণাকে বোঝ, ওটাকে কাজে লাগাতে শেখ, ওটাকে হারিয়ে দে।… কাম অন কোনি, জোর লাগা… যন্ত্রণাকে তুই বল, ‘দেখে নেব আমাকে কাঁদাতে পারিস কিনা, আমাকে ভয় দেখাতে পারিস কিনা’, বলে যা কোনি, ‘ক্ষিদ্দা তোমাকে খুন করবে। তুমি শয়তান, ছিঁড়ে খাব তোমাকে।’ কমলদিঘিকে টগবগ করে ফুটিয়ে তোল তোর রাগে।’
কাব্যি ছেড়ে, ভাবালুতা সরিয়ে, ভণিতা না করে এটুকু অন্তত বলা যায়, শচিনের ‘ক্ষিতীশ’ রমাকান্তও তাঁকে যন্ত্রণাকে কাজে লাগিয়ে, মার খেয়ে ইস্পাত হয়ে উঠতে শিখিয়েছিলেন। শিয়ালকোটের নিদাঘপীড়িত দুপুরে ওয়াকারের বিধ্বংসী বাউন্সারে শচিন তাই কিছুতেই নতজানু হননি।