Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

বুদ্ধের শরণে বাজ্জিও, বৌদ্ধধর্মের ছায়ায় খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ান এই ইতালীয় স্ট্রাইকার

বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পর রবার্তো বাজ্জিওর কোমরে হাত দিয়ে মাটির দিকে চেয়ে থাকার স্মরণীয়, বেদনাঘন ইমেজের সঙ্গে এই দুই পুরাণপ্রতিমার মিল কি নেহাতই আপতিক?

বুদ্ধের শরণে বাজ্জিও, বৌদ্ধধর্মের ছায়ায় খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ান এই ইতালীয় স্ট্রাইকার

রবার্তো বাজ্জিও

শেষ আপডেট: 4 February 2025 16:56

রূপক মিশ্র 

মেদিনী গ্রাস করেছে রথের চাকা। আর নতশিরে ললাটলিখন মেনে মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছেন বীর কর্ণ। কিংবা নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে তস্করের ছলে প্রবেশ করা লক্ষণের হাতে নিরস্ত ইন্দ্রজিৎ মৃত্যুর আগে হতঃশ্বাস, হতবীর্য।

বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পর রবার্তো বাজ্জিওর কোমরে হাত দিয়ে মাটির দিকে চেয়ে থাকার স্মরণীয়, বেদনাঘন ইমেজের সঙ্গে এই দুই পুরাণপ্রতিমার মিল কি নেহাতই আপতিক? একদিকে প্রতিভাবান অন্যদিকে ভাগ্যবিড়ম্বিত। একাধারে বন্দিত ও নিন্দিত৷ উত্থান ও পতন, সাফল্য ও ব্যর্থতায় ভরা জীবননাট্যের এই তিন কুশীলবের সংযোগকে কি স্রেফ ‘কষ্টকল্পনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে?

১৯৯৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল ইতালি ও ব্রাজিল। সেবার আয়োজক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ শেষ লড়াইয়ের মঞ্চ ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়াম। সেই প্রথম কোনও বিশ্বকাপ ফাইনাল অতিরিক্ত মিনিট পেরিয়ে পেনাল্টি পর্যন্ত গড়ায়। যেখানে তিন-দুইয়ে এগিয়ে থাকা ব্রাজিলকে চাপে ঠেলতে এবং নিজেদের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে ইতালিকে গোল করতেই হত৷ এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেন্টার সার্কেল থেকে ধীর পায়ে হেঁটে আসেন বাজ্জিও৷ টুর্নামেন্টের ফর্মে থাকা গোলদাতা, ইতালির পরিত্রাতা। যাঁকে ছাড়া আজ্জুরিদের ফাইনালে ওঠার ন্যূনতম কোনও সম্ভাবনাই ছিল না।

ক্লাবের হয়ে নিয়মিত পেনাল্টি নেন। বরাবরই যিনি শান্ত, স্থির, অচঞ্চল স্বভাবের। চলতি টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জেরে যিনি আত্মবিশ্বাসে ফুটছেন—এমন স্ট্রাইকার পেনাল্টি মিস করবেন এবং শুধু মিস না—তাঁর লক্ষ্যহীন শট তেকাঠির টার্গেট পর্যন্ত ছোঁবে না—এটা অতিবড় ব্রাজিল ভক্তও আগাম আঁচ করতে পারেননি। বাজ্জিও নিজেও কি পেরেছিলেন? চাপ সইতে না পেরে পেনাল্টি কিক বাইরে মেরে, দেশবাসীকে দেখানো স্বপ্ন এত লঘুচালে নিজের হাতেই চুরমার করার জন্য কি নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল তাঁর? ক্যালিফোর্নিয়ার রৌদ্রস্নাত স্টেডিয়ামের একটা বড় অংশ যখন উল্লাসে, আনন্দে বাঁধনহারা, হলুদ জার্সির স্রোত বয়ে যাচ্ছে গ্যালারি জুড়ে, তখন ফোটোগ্রাফারদের ক্যামেরা সেই আলোর উৎসার এড়িয়ে লেন্স পেতেছিল বাজ্জিওর দিকে। জুম ইনে ফুটে উঠছিল এক খর্বকায়, নতশির, পরাক্রমী যোদ্ধার অবয়ব। উচ্ছ্বাসের মধ্যে বিষাদ। আবাহনের আড়ালে বিসর্জন। সাফল্যের অন্দরে অবসাদ। জীবনের এই শাশ্বত চালচিত্রই যেন ধরা পড়েছিল রোজ বোল স্টেডিয়ামে৷

এই বিয়োগান্তক অথচ আইকনিক ছবি একজন খেলোয়াড়কে শেষ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। রৌদ্রতপ্ত দিনে পেনাল্টি সার্কেলের পাশে দাঁড়ানো একাকী, নি:সঙ্গ বাজ্জিও-ও পুড়ে গেছিলেন। কিন্তু ফুরিয়ে যাননি। ফিরে এসেছিলেন। পরপর তিনটি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন। ক্লাবের হয়ে জিতেছিলেন সিরি আ খেতাব। চোট-আঘাতে দীর্ণ কেরিয়ারে বারবার শুধু ফিরেই আসেননি। তাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছিলেন। ইন্টার মিলান, এসি মিলান, জুভেন্তাসের মতো ইতালির তাবড় তাবড় ক্লাবে খেলেছেন। পারস্পরিক বৈরিতা ভুলে সমস্ত সমর্থকই তাঁকে আপন করে নিয়েছে। হয়ে উঠেছেন ইতালীয় ফুটবলের ‘পোস্টার বয়’!

কিন্তু এত ভাঙন, এত যন্ত্রণা, এত বিতর্ক এড়িয়ে কী করে নিজেকে ধাতস্থ করলেন বাজ্জিও? ‘দ্য ম্যান হু ডায়েড স্ট্যান্ডিং’ (একজন মানুষ যিনি দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যুবরণ করেছিলেন) বিশ্বকাপের ট্র্যাজিক মুহূর্তটিকে বোঝাতে মিডিয়া এই লব্জই সেঁটে দিয়েছিল যাঁর গায়ে, তিনি কীভাবে কেরিয়ারে কামব্যাক করেছিলেন? বাজ্জিও নিজে কিছুই লুকিয়ে রাখেননি। একবার নয়, বারবার এই রহস্য খোলসা করে জানিয়েছেন—বৌদ্ধধর্মই তাঁকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বুদ্ধের বাণীই তাঁর শক্তি৷ যার কৃপায় জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন। খাদের কিনারে দাঁড়িয়েও ঘুরে তাকানোর স্বপ্ন দেখেছেন।

রবার্তো বাজ্জিওর রূপকথার শুরু ১৯৮০ সালে। ইতালির ছোট শহর কালডোগনো। সেখানেই বেড়ে ওঠেন রবার্তো। ফুটবল খেলা যেন রক্তে মিশে ছিল। বল পায়ে একটু সড়গড় হতেই স্থানীয় অ্যাকাডেমির হয়ে ২৬ ম্যাচে ৬৫ গোল। যার ফলে অচিরে চলে আসেন স্কাউটদের নজরে। যোগ দেন তৃতীয় ডিভিশনের ক্লাব ভিচেনজায়। যে ক্লাবে এক সময় খেলতেন ইতালির ফুটবল তারকা পাওলো রোসি। ১৫ বছর বয়সে পেশাদার কেরিয়ারের শুরুয়াত। তিন বছরের মধ্যে ডিভিশনের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান বাজ্জিও।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এরপর তাঁকে নিয়ে শুরু হয় দড়ি টানাটানির খেলা। একদিকে জুভেন্তাস। অন্যদিকে ফিওরেন্তিনা। দীর্ঘদিন চলে দর কষাকষি। শেষমেশ ফিওরেন্তিনার হয়ে সই করার সিদ্ধান্ত নেন বাজ্জিও। ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে। তখনকার হিসেবে এই অঙ্কটা ছিল যথেষ্ট বড়। বিশেষ করে এক উঠতি কিশোরের জন্য দেড় মিলিয়ন পাউন্ডের হিসেবকে চোখধাঁধানোই বলা চলে।

ফিওরেন্তিনার জার্নি শুরুর আগে শেষবার ভিচেনজার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন বাজ্জিও। মাঠে ভিড় জমান কাতারে কাতারে দর্শক। তাঁদের স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একটি স্লাইড ট্যাকল। কড়া ট্যাকল। আর তাতেই যাবতীয় স্বপ্ন পলকে ধ্বংস। হাঁটুর মেনিসকাস, এসিএল ভেঙে যায়। পুরো ডান পা প্রবল্ ক্ষতিগ্রস্ত। ডাক্তার, ফিজিও সবাই একবাক্যে জানান: বাজ্জিওর পক্ষে ফুটবলের মাঠে ফিরে আসা কার্যত অসম্ভব।

নতুন ক্লাবের হয়ে সইটুকু করেছেন। একটি ম্যাচও খেলননি। তার আগেই এমন কেরিয়ারঘাতী চোট! এই দুঃসময়ে বাজ্জিওর পাশে দাঁড়ায় ফিওরেন্তিনা। ট্রেনিং, অ্যাকাডেমির সমস্ত আধুনিক সরঞ্জাম, ফিজিওথেরাপির যাবতীয় সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, সুস্থ হতে অনেকটা সময় লেগে যায়। গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে ওঠে অ্যালার্জি… পেনকিলারে প্রবল অ্যালার্জি।

মাঠই ছিল যার বেঁচে থাকার রসদ, মাসের পর মাস ময়দান-ছাড়া হয়ে থাকার ফলে বাজ্জিওর মনের অন্দরেও জমতে থাকে ঘুণ। পরিবার গোঁড়া রোমান ক্যাথলিক ধর্মে আস্থাবান। কিন্তু তা সত্ত্বেও খ্রিস্টীয় আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করতে পারেননি তিনি। নতুন বছরের প্রথম দিন সকালে উঠেই বাজ্জিও বন্ধু মরিচ্চিওর বাড়ি চলে যান এবং জানান, তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে চলেছেন।

ধর্মান্তরণের এই একটি সিদ্ধান্তই তাঁর জীবন ওলটপালট করে দেয়। নিচিরেন বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন তিনি। মহাযান ধর্মের একটি উপশাখা নিচিরেন। জাপান থেকে বাকি বিশ্বে সম্প্রসারিত হয়। ‘সোকা গাক্কাই ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি বৌদ্ধ সংঘে নাম লেখান। অধ্যয়ন, বিশ্বাস ও অধ্যবসায়—এই তিনটি দর্শনের উপর দাঁড়িয়ে নিচিরেনদের আদর্শ। আর বাজ্জিও-ও আহত শরীর, বিক্ষত মনের শুশ্রূষার জন্য এই তিনের অনুশীলন শুরু করেন। বাইরের সমাজ, বাইরের প্রকৃতি থেকে চোখ সরিয়ে নিমগ্ন হন অন্তরের সাধনায়। ধ্যান হয়ে ওঠে প্রতিদিনের জীবনচর্যার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জীবনে কোনওদিন এই অভ্যাস ছাড়েননি তিনি। ম্যাচ শিডিউল যতই জটিল হোক না কেন, রোজ সকালে উঠে বাজ্জিও ধ্যানযোগে বসতেন।

জীবনের এই পর্বান্তর নিয়ে পরে আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে আমায় কিছু একটা ধাক্কা মারে। যার টানেই আমি সকাল সাতটায় বন্ধুর বাড়িতে হাজির হই এবং তাঁকে জানাই, আমায় এবার নতুন কোনও যাত্রা শুরু করতে হবে। এক এক সময় হাঁটুর যন্ত্রণায় এতটাই ছটফট করতাম যে, মনে হত, কেউ বুঝি মাথায় হাতুড়ি ঠুকছে। কিন্তু আমি থামিনি। এই লড়াইয়ে আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হার স্বীকার করত। কিন্তু আমি পালিয়ে যাইনি।‘

সত্যি পরাজয় মানেননি বাজ্জিও। পরের সিজনে ফিরে এসে ফের চোট খেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়ার পরেও না। হাঁটুতে ১১০টি স্টিচ পড়ার পরেও না। অবসাদে ১২ কেজি ওজন কমে যাওয়ার পরেও না। বাজ্জিওর অভিধানে ‘না’ বলে কোনও শব্দই যেন ছিল না। তাই যখনই কোনও টিমের অধিনায়কত্ব করেছেন তখন আর্মব্যান্ডে লিখে রেখেছেন বৌদ্ধ আদর্শের বাণী: ‘আমরা জিতব। আমরা অবশ্যই জিতব।‘ আর সেখানে শোভা পেয়েছে নিচিরেন ঐতিহ্যের তিনটি রঙ—নীল, হলুদ ও লাল।

এই ত্রিবর্ণই যেন অমোঘ লিখন হয়ে ফিরে এসেছিল চুরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে। নীল রঙের জার্সি গায়ে সেদিন খেলতে নেমেছিলেন রবার্তো বাজ্জিও। লড়াই শেষে জয়লাভ করেছিল হলুদ জার্সি গায়ে ব্রাজিল টিম। আর মিস করার পর পেনাল্টি বৃত্তের পাশে চুপ করে একাকী আটটি মিনিট ধরে দাঁড়িয়েছিলেন বাজ্জিও। তাঁর বিক্ষত হৃদয় সেদিন ভেসে গেছিল লাল রক্তে।


```