
শেষ আপডেট: 26 November 2020 13:52
যেন পিকাসো গুয়েরনিকা আঁকছেন। একশো বছরের নিঃসঙ্গতা লিখছেন মার্কেজ। কিংবা সিক্স সিমফোনির সুর করছেন বেঠোফেন। দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা গোল করছেন!
শিল্প। শিল্প। শিল্প।
মাত্র চার মিনিট আগে ফুটবল ইতিহাসের 'কুখ্যাততম' গোলটা করেছেন তিনি। হাত দিয়ে বল ঠেলে দিয়েছেন ইংল্যান্ডের গোলে।স্পোর্টসম্যান স্পিরিটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চেপে গিয়েছেন সে কথা।স্পোর্টসম্যান স্পিরিট? যুদ্ধে আবার সেটা হয় নাকি?
মাত্র চার বছর আগে ফকল্যান্ডস ওয়ারে পর্যদুস্ত হয়েছে আর্জেন্তিনা। ৭৪ দিন যুদ্ধের পর নাকে খত দিয়েছে ইংল্যান্ডের কাছে। অসহায় আত্মসমর্পণ। মারা গিয়েছেন প্রায় সাড়ে ছ’শো আর্জেন্টাইন সেনা।
তারপর ফুটবল যুদ্ধে সেই দেশের কাছে হেরে যাওয়া যায় নাকি? হাত দিয়েই কুখ্যাততম গোল করেছেন তিনি। বলেছেন ‘ঈশ্বরের হাত।’
সাধারণ কেউ হলে এইখানেই একটা বিতর্কিত অধ্যায় শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি মারাদোনা। ঈশ্বর তাঁকে একটা বাঁ পা দিয়েছেন। তাই কুখ্যাততম গোলের ঠিক চার মিনিট পর, সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার, মোটা বেঁটে, ঢাউস মাথার মারাদোনা ড্রিবল করে, কাটিয়ে কাটিয়ে বলটাকে ঠেলে দেবেন গোলের মধ্যে। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম গোল।
একই ম্যাচে একই সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের কুখ্যাততম আর বিখ্যাততম গোল দু’টো করে ফেলাকেই মারাদোনা বলে।
বাবা রেড ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভুত। মা ইতালির গরিব ইমিগ্র্যান্ট পরিবারের। জন্ম হচ্ছে বুয়েনেস আইরেসের কুখ্যাত মহল্লার বস্তিতে। তিন দিদির পর বাড়ির প্রথম ছেলে। বড় ছেলে। তাই গরিব পরিবার তাঁকে শৈশবেই পাঠিয়ে দিয়েছে কাজ করতে। স্ক্র্যাপ আর ফেলে দেওয়া সিগারেটের প্যাকেটের টিন ফয়েল কুড়িয়ে বিক্রি করত দিয়েগো। অন্য কেউ হলে এখানেই গল্পটা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি মারাদোনা। ঈশ্বর তাঁকে একটা বাঁ পা দিয়েছেন। তাই সাদা কালো একটা চামড়ার ফুটবল লাথিয়ে লাথিয়ে তিনি নিজেই আলো হয়ে উঠবেন। প্রথম ফুটবলার হিসেবে পাঁচ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফি। বার্সেলোনায়।
অ্যাথলেটিকো বিলবাওয়ের কুখ্যাত ‘বিলবাওয়ের কসাই’ গোইকোর মার খেয়ে গোড়ালি ভেঙে শুয়ে থাকবেন বিছানায়। তারপর ফিরে আসবেন রাজার মতো। ১৯৮৪ সালের কোপা দেল রেইয়ের ফাইনালে ফের সেই গোইকোর কাছে মার খাবেন তিনি। তারপর ম্যাচের শেষে বিলবাওয়ের মিগুয়েল সোলার কাছে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য শুনে মেজাজ হারাবেন। মাথা দিয়ে ঠুকে সোলাকে অজ্ঞান করে দেবেন তিনি। একা হাতে মেরে ঠান্ডা করে দেবেন বিলবাওয়ের খেলোয়াড়দের।
স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোস খেলা দেখতে এসেছেন। তো কী? আমি মারাদোনা। বস্তি থেকে বল পিটিয়ে উঠে এসেছি। আমাকে মারলে পাল্টা মার খেতে হয়।
বার্সেলোনা থেকে ফের ট্রান্সফার ইতালির নাপোলিতে। দক্ষিণ ইতালির নেপলসের ক্লাব। সেই নেপলস যাঁকে ইতালির লোকের মোটেও ইতালি মনে করে না। সেই নেপলস যাঁকে ইতালিয়ানরা বর্ণবিদ্বেষী গালাগাল দেয়। সেই নাপোলি যাকে নিয়ে খেলার মাঠে গান গায় জুভেন্তাসের সমর্থকরা-- ‘নাপোলি গায়ে সাবান দেয় না। নাপোলি গু। নাপোলি কলেরা। নাপোলি ইতালির লজ্জা!’
এই নাপোলি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খেলে না। খেলে লিগের সব থেকে কম পয়েন্ট পাওয়া দল হয়ে রেলিগেশন আটকাতে। সেই নাপোলি প্রায় সাত মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে নিয়ে এসেছে মারাদোনাকে? এত টাকা কে দিল? মাফিয়ারা?
বর্ণবিদ্বেষটাই যথেষ্ট ছিল বস্তি থেকে উঠে আসা মারাদোনার জন্য। ঈশ্বর তাঁকে একটা বাঁ পা দিয়েছেন। উল্টো দিকের এগারো জন প্লেয়ারকে হারানোর জন্য আর কিছুর দরকার নেই।
১৯৮৭ সালে প্রথমবার ইতালির সুপার ডিভিশন সিরি এ-র চ্যাম্পিয়ন এতদিন রেলিগেশন আটকানো নাপোলি। পরের বার রানার্স। তার পরের বারও। ১৯৮৯ তে ফের চ্যাম্পিয়ন। ১৯৮৯ তে ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন। ১৯৯০ তে ইতালিয়ান সুপার কাপ চ্যাম্পিয়ন।
নাপোলির ভগবানের নাম মারাদোনা। যাঁর রক্ত চুরি করে ক্যাথোলিক চার্চে রেখে আসবেন সেখানকার নার্স। যিনি নাপোলি থেকে চলে যাওয়ার পর ১০ নম্বর জার্সিটাই তুলে দেবে ক্লাবের লোকেরা।
আর বাকি ইতালির কাছে? নেপলেসের মাফিয়াদের ক্লাবকে জেতানো মূর্তিমান শয়তান। যে শয়তান ১৯৯০ সালে আর্জেন্তিনার হয়ে খেলে ইতালিকে হারিয়ে দিয়েছে।
ইতালির এই ঘৃণাকে ভোলেননি মারাদোনা। তাই ডায়পার পরা নিজের ছোট্ট মেয়েকে ইতালিয়ান গান শিখিয়েছিলেন। ‘জুভেন্তাস ফাক অফ।’
একটা গোটা দেশের ঘৃণা। আর উল্টো দিকে আত্মধ্বংসী আবেগ। নেপলসেই মাফিয়ারা বন্ধু হয়ে ওঠে মারাদোনার। তাঁদের সঙ্গে টানা দু’রাত জাগা পার্টি। অসংখ্য যৌন সম্পর্ক। অবৈধ সন্তান। কোকেন।
ওয়ার্ল্ড কাপে ডোপ করার জন্য মারাদোনাকে ব্যান করেছিল ফিফা। পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে সেই ফিফারই ‘বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ ফুটবলার’ মারাদোনা। তাঁর সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান পেলে। যাঁর ভোট ১৮ শতাংশ।
মারাদোনা। ‘এল পিবে দি ওরো’। সোনার ছেলে।
মারাদোনা। ঈশ্বর যাঁকে ডান পা নয়। বাঁ পা দিয়েছে।
মারাদোনা। যাঁর হাতে-পায়ে উল্কি। বাঁ পায়ে ফিদেল। আর ডান হাতে চে। যাঁর বন্ধু উগো সাভেজ।
মারাদোনা। জর্জ ডব্লুউ বুশ আর্জেন্টিনায় এলে যিনি ‘স্টপ বুশ’ লেখা জার্সি পরে প্রতিবাদ করবেন। সেই জার্সিতে বুশের এস এর বদলে হিটলারের স্বস্তিকা আঁকা।
মারাদোনা। একটা বাঁ পা। যার পেছনে সামরিক শাসন, দুর্নীতি আর দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করা একটা গোটা দেশ। আর্জেন্টিনা। একটা গোটা মহাদেশ – লাতিন আমেরিকা। যে মহাদেশকে লুঠ করে ইউরোপ নিজেকে ‘এনলাইটেন’ করেছিল। দারিদ্রের বেদম মার খাওয়া গোটা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ।
একটা অলৌকিক বাঁ পা। যার গায়ে আটকে থাকে একটা সাদা কালো বল। আঠার মতো চুম্বকের মতো নয়। বরং যার কাছে থেকে আঠা এবং চুম্বক দু’জনেই শিখে নিতে পারে আটকে রাখার রহস্য।
আর আত্মধ্বংসী এক বুক আবেগ। যাকে প্রতিভার মতোই বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় না।
মহাকাব্য। মারাদোনা।