দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার লং অনের উপর দিয়ে ছক্কাটা মারার পরেই হেলমেট খুলে দু'হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তারপর গলার তাবিজে চুমু খেয়ে উপরের দিকে তাকালেন কিছুক্ষণ। গোটা ড্রেসিং রুম তখন উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। হাততালি অবশ্য দিচ্ছিলেন প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার দূরে টিভির পর্দায় চোখ রাখা আর এক ভদ্রলোকও। ছেলে যে তাঁর ইচ্ছে পূরণ করেছে। ছেলের কাঁধে ভর দিয়েই তো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে ভারত। যে ছেলে একসময় বেঁচে থাকার জন্য ফুচকা বেচত, সেই যশস্বী জয়সওয়ালের দিকেই তাকিয়ে সবাই।
অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের দলে সুযোগ পাওয়ার পরেই যশস্বী সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চেষ্টা করবেন দলের জয়ে যেন তাঁর যোগদান থাকে। এখনও পর্যন্ত প্রতিটা ম্যাচে রান এসেছে যশস্বীর ব্যাটে। তিনটে হাফসেঞ্চুরি এলেও সেঞ্চুরি আসছিল না। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নামার আগে বাবা বলেছিলেন, এই ম্যাচেই সেঞ্চুরি করবেন যশস্বী। সেটা করেও দেখালেন। ১৭২ রান তাড়া করতে গিয়ে যশস্বীর সেঞ্চুরিতে ১০ উইকেটে ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছে ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দল।
অথচ এই যশস্বীকেই ক্রিকেটার হয়ে ওঠার জন্য কত কিছু না করতে হয়েছে। জন্ম উত্তরপ্রদেশের ভারোহিতে। বাবার একটা ছোট্ট দোকান ছিল। কিন্তু ছোট থেকেই স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হবেন। ছোটবেলাতেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বই পাড়ি দেন যশস্বী। থাকার জায়গা ছিল না। আজাদ ময়দানে মুসলিম ইউনাইটেড ক্লাবের মাঠকর্মীদের সঙ্গে তাঁবুতেই থাকতেন তিনি। শুতে হত মাটিতে। তাতে অবশ্য কোনও দুঃখ ছিল না। সারাদিন খেলে ফিরে যা পেতেন, তাই খেয়েই শুয়ে পড়তেন। কিন্তু এই অবস্থাও বেশিদিন টিকল না। মাঠকর্মীদের কোনওভাবে সাহায্য করতে পারেন না বলে তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। অগত্যা বাধ্য হয়ে ফুচকা বিক্রি করা শুরু করেন তিনি।
পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে যশস্বী বলেন, “দিনের বেলা খেলতাম। সন্ধেবেলা ফুচকা বিক্রি করতাম। মোটামুটি চলে যেত। রামলীলা বা কোনও মেলা হলে তো ভালই বিক্রি হত। খালি ভগবানের কাছে চাইতাম, আমার সঙ্গে যারা খেলে তারা যেন না আসে। বন্ধুদের ফুচকা বানিয়ে দিতে কষ্ট হত। মনে হত ওরা আমাকে গরিব ভেবে করুণা করছে।”
এইভাবেই রাত-দিন এক করে যে ক্রিকেট সাধনা করেছেন, তা কি বৃথা যায়। পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন যশস্বী। মাত্র ১৭ বছর ১৯২ দিন বয়সে বিজয় হাজারে ট্রফিতে ঝাড়খণ্ডের বিরুদ্ধে ডবল সেঞ্চুরি করেন এই বাঁ’হাতি ওপেনার। ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে সবথেকে কম বয়সে ডবল সেঞ্চুরির রেকর্ড করেন তিনি। তাঁর এই একটা ইনিংসই ভারতীয় ক্রিকেটের আঙিনায় তাঁকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
শচীন তেণ্ডুলকর থেকে সুনীল গাভাসকার, সবাই প্রশংসা করেছেন এই বা'হাতি ওপেনারের। আইপিএলেও রাজস্থান রয়্যালস তাঁকে ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকায় কিনে নিয়েছে।
তবে বর্তমানে বিশ্বকাপ নিয়েই ভাবতে চান তিনি। আর মাত্র একটা ম্যাচ। রবিবার নিউজিল্যান্ড নয়তো বাংলাদেশ, কোনও এক দলের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলতে নামবে ভারত। ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপ ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে। সবথেকে বেশি ৫বার বিশ্বকাপ জেতারও সুযোগ রয়েছে। আর এই জয়ের পথে ভারতের প্রধান অস্ত্র যশস্বী। এককালে যে ফুচকা বেচত, সেই যশস্বীর কাঁধেই রয়েছে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের ভার।