কঠিন শুধু রোজকার জীবন নয়, ট্র্যাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আচরণও বিছিয়ে দেয় পথের কাঁটা। চলে টিটকিরি, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ। কিন্তু সামলাতে হয়। সামলে নেন আতিকা।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 August 2025 18:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাশ্মীরের মেয়ে। বয়স মাত্র দশ। অথচ স্টিয়ারিং হাতে যেন পেশাদার রেসার! ইউরোপ ও আরব দুনিয়ার জুনিয়র কার্টিং সার্কিটে (Junior Circuit) এই মুহূর্তে একচ্ছত্র দাপট দেখাচ্ছেন। নাম আতিকা মির (Atiqa Mir)। তাঁর গতি আর নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক মোটরস্পোর্ট জগতের ঘুম ছুটিয়েছে!
চলতি বছরের গোড়াতেই ইতিহাস গড়েন কাশ্মীরি-তনয়া। প্রথম ভারতীয় ও প্রথম এশীয় হিসেবে সই করেন ফর্মুলা ওয়ান (Formula 1) একাডেমির ড্রাইভার প্রোগ্রামে। বয়স কম হলেও স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আতিকার সোজাসাপটা কথা, ‘আমি মনে করি যে কোনও মেয়ে ফর্মুলা ওয়ানে পৌঁছতে পারে। শুধু দরকার নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম আর চারপাশের মানুষের সমর্থন। চেষ্টা করছি, যেন দশ বছর পর ফর্মুলা ওয়ানে নাম লিখতে পারি!’
মরশুমের ব্যস্ত সূচির আগে আপাতত দেশে ছুটি কাটাচ্ছেন আতিকা। তাঁর বাবা আসিফ মিরের (Asif Mir) স্মৃতিচারণে শুধুই ফেলে আসা দিনের কথা—‘খুব সাধারণভাবে শুরু। শপিং মলে খেলনার গাড়ি চালাত। তারপর আগ্রহ বাড়ল। আমি গুরুত্ব দিইনি। একদিন কার্টিংয়ে গেলাম। তখনই বুঝলাম, ও সত্যিই ভালো চালাচ্ছে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি!’
মাত্র ছ’বছর বয়সে শুরু। ‘বামবিনো’নামের কচিকাচাদের ট্র্যাক থেকে মাত্র দু’বছরের মধ্যে পৌঁছে গেলেন পেশাদারদের রেসিং সার্কিটে। আপাতত বছরে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ২০-২৩টি রেসে অংশ নেন। ট্রফি ক্যাবিনেট দ্রুত ভরছে। মার্কিন সার্কিটে ভাইস চ্যাম্পিয়ন, ইউরোপে প্রথম ভারতীয় ও প্রথম মেয়ে হিসেবে শীর্ষ দশে শেষ করার কৃতিত্ব—সবই টপাটপ ঝুলি ভরিয়ে তুলছে!
আতিকার গতির প্রতি ভালবাসা পরিবার থেকে এসেছে। বাবা আসিফও একসময় রেসার ছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতার ঝলকও শোনাতে গিয়ে বলেন, ‘সুযোগ পাই, যখন আমার বয়স কুড়ির কোঠায়। তখন আমি ভারতের প্রথম জাতীয় কার্টিং চ্যাম্পিয়ন। অনেক স্পনসরের সমর্থন জুটেছিল। পরে গিয়েছিলাম প্রতিযোগিতামূলক সিরিজ ফর্মুলা এশিয়ায়!’
এখন আসিফই কোচ, টেকনিক্যাল ম্যানেজার এবং বাবা—সব ভূমিকায়। জানিয়ে দেন, সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হল খেলার মধ্যে আবেগ ঢুকতে না দেওয়া। আসিফের কথায়, ‘আপনি চান কোচ হতে, বাবা নয়। কিন্তু সবসময় কি সম্ভব? বিশেষ করে পরিস্থিতি খারাপ হলে তো নয়-ই!’
মা–বাবা মিলিয়ে পাঁচ সদস্যের সাপোর্ট টিম ঘিরে রেখেছে আতিকাকে। ফর্মুলা ওয়ান অ্যাকাডেমির সহায়তা তাঁর রেসিং জীবনে বড় পদক্ষেপ। পাশাপাশি প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে ওয়ার্ল্ড সিরিজ কার্টিংয়ের আস্ত সিজনে সই করাও বিরাট কৃতিত্ব।
আপাতত দুবাইয়ে রয়েছেন সপরিবারে। যদিও আতিকার জীবন আর পাঁচজন সমবয়সী কিশোরীর মতো নয়। কেন? কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘কখনও দেখি অন্য মেয়েরা খেলাধুলো করছে, মজা করছে। অথচ আমার খেলার সময় নেই। তখন একটু মন খারাপ হয়। কিন্তু নিজেকে বোঝাই: আমি কার্টার। তাই আমার রুটিন আলাদা। অবশ্যই পার্কে খেলা বেশি মজার, কিন্তু জীবনে কখনও না কখনও কঠিন পথে হাঁটতে হয়!’
কঠিন শুধু রোজকার জীবন নয়, ট্র্যাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আচরণও বিছিয়ে দেয় পথের কাঁটা। চলে টিটকিরি, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ। কিন্তু সামলাতে হয়। সামলে নেন আতিকা। এতকিছু দেখে বাবা আসিফ আবেগ ধরে রাখতে পারেন না। বলে দেন—‘ও ছোটবেলায় কেঁদে জিজ্ঞেস করত, কীভাবে সামলাব? আমি বলতাম, মুখোমুখি হতে হবে। মেয়েদের জন্য কষ্টটা বেশি। কখনও ভালো ভাবে চলা রেসের মধ্যেই কেউ এসে ধাক্কা দেয়। পরে শুনি, আগের রেসে ও (আতিকা) নাকি তার বন্ধুকে ওভারটেক করেছিল!’
কার্টিং থেকে ফর্মুলা ওয়ান পর্যন্ত রাস্তাটা বেজায় লম্বা। আতিকা সেটা জানেন। আপাতত পরিকল্পনা—১৫ বছরে পৌঁছনোর আগেই ফর্মুলা ফোরে নামা। তারপর ধাপে ধাপে এলিট লিগে। তার জন্য অ্যাকাডেমি শিখিয়ে চলেছে নিখুঁত ড্রাইভিং কৌশল। আর বাবা-মা প্রতিনিয়ত বুঝিয়ে চলেছেন, দেশের প্রথম মহিলা হিসেবে ফর্মুলা ওয়ানে পৌঁছনো দুরূহ হতে পারে, কিন্তু দুষ্কর নয়।