প্রশ্নটা আর তাই ‘কে তিনি?’ নয়। সওয়াল বদলে যাচ্ছে—ভারতীয় দাবার পরবর্তী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কি এই অর্জুনই?—এই বয়ানে।

অর্জুন এরিগাইসি
শেষ আপডেট: 30 December 2025 15:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দোহায় চলতি ফিডে বিশ্ব ব্লিটজ চ্যাম্পিয়নশিপে (FIDE World Blitz Championship) এক সন্ধ্যায় কিস্তিমাত খেলেন ম্যাগনাস কার্লসেন (Magnus Carlsen)। সময়ের চাপে হেরে যাওয়া ম্যাচ শেষে হতাশায় টেবিলে থাবড়ালেন এক নম্বর দাবাড়ু। আর গোটা দৃশ্যের কেন্দ্রে যিনি, তিনি ২২ বছরের এক ভারতীয়, নাম অর্জুন এরিগাইসি (Arjun Erigaisi)।
কার্লসেনকে ব্লিটজ ফরম্যাটে হারানো মানেই বড় খবর। কিন্তু এই জয় শুধু চমক নয়। ধারাবাহিক উত্থানের স্পষ্ট চিহ্ন। প্রশ্ন তাই একটাই—কে এই অর্জুন এরিগাইসি (Arjun Erigaisi), যাকে নিয়ে হঠাৎ করে গোটা দাবা দুনিয়ায় চর্চা চলছে?
তেলঙ্গানা থেকে দাবার শীর্ষে: শুরুটা কোথায়, কীভাবে?
অর্জুন এরিগাইসির (Arjun Erigaisi) জন্ম তেলঙ্গানার ওয়ারাঙ্গালে। বাবা পেশায় নিউরোসার্জন, মা গৃহবধূ। আটপৌরে মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু ছেলের মধ্যে খুব ছোট বয়সেই ধরা পড়ে ‘আলাদা কিছু’। হনামকোন্ডার বিএস চেস অ্যাকাডেমিতে কোচ বল্লাম সম্পথের হাত ধরে দাবার পাঠ শুরু। তাঁর খেলার ধরন ছিল সাহসী, ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক সময়েই অপ্রত্যাশিত—যার জন্য পরবর্তীতে দীর্ঘদিন তাঁকে ‘বোর্ডের ম্যাডম্যান’ বলে ডাকা হয়েছে।
১৪ বছর বয়সে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া ভারতীয় দাবার ইতিহাসে এমনিতেই বিরল ঘটনা। কিন্তু অর্জুনের (Arjun Erigaisi) ক্ষেত্রে সেটা ছিল শুরু মাত্র। ডেটা সায়েন্স পড়ছিলেন, কিন্তু ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম বর্ষেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পুরোপুরি চৌষট্টি খোপের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর পিছনে ফিরে তাকাননি।
রেটিং, রেকর্ড আর ‘২৮০০’ ক্লাবের দরজা
২০২৪ সালটা অর্জুন এরিগাইসির (Arjun Erigaisi) কেরিয়ারে টার্নিং পয়েন্ট। সেপ্টেম্বরে দেশের টপ রেটেড খেলোয়াড় হন। ডিসেম্বরে ফিডে রেটিং দাঁড়ায় ২৮০১—এক ঐতিহাসিক সংখ্যা। বিশ্বনাথন আনন্দের (Viswanathan Anand) পর তিনিই দ্বিতীয় ভারতীয়, যিনি ২৮০০-এর ক্লাব ছুঁলেন। বিশ্ব দাবার ইতিহাসে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজনই এই সীমা পেরোতে পেরেছেন।
অবশ্য এর আগেও অর্জুনের (Arjun Erigaisi) ঝুলিতে ছিল একাধিক বড় স্বীকৃতি—২০২২ সালে টাটা স্টিল চ্যালেঞ্জার্স জয়, জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া, আবু ধাবি ইন্টারন্যাশনাল জেতা, দাবা অলিম্পিয়াডে বোর্ড থ্রিতে ব্যক্তিগত সোনা এনে ভারতের প্রথম দলগত সাফল্যে বড় ভূমিকা। কিন্তু ২০২৪–এর পর থেকে অর্জুন আর ‘প্রতিশ্রুতি’ নন—হয়ে উঠেছেন কড়া চ্যালেঞ্জার।
কার্লসেন বনাম অর্জুন: কেন এই জয়টা আলাদা?
দোহায় ব্লিটজ চ্যাম্পিয়নশিপে নবম রাউন্ডে কার্লসেনের (Magnus Carlsen) বিরুদ্ধে কালো ঘুঁটি নিয়ে খেলেছিলেন অর্জুন (Arjun Erigaisi)। ব্লিটজ মানেই সময়ের সঙ্গে দৌড়। সেখানে অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কিন্তু সেখানে নেমে অর্জুন দেখালেন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি—দ্রুত গণনা আর এন্ডগেম টেকনিক। কার্লসেন সময়ের চাপে পড়ে যান। ম্যাচ শেষে ঘড়ির কাঁটা থামতেই বোঝা যায়, কী হয়েছে।
এটা কিন্তু চলতি বছরে প্রথমবার নয়। আগেই নরওয়ে চেস (Norway Chess) টুর্নামেন্টে ক্লাসিকাল ফরম্যাটে কার্লসেনকে (Magnus Carlsen) হারিয়েছিলেন অর্জুন (Arjun Erigaisi)। অর্থাৎ, একাধিক ফরম্যাটে, একাধিক পরিস্থিতিতে প্রমাণ করছেন—এই জয় নিছক দুর্ঘটনা নয়।
চর্চায় আসা ব্লিটজ চ্যাম্পিয়নশিপেই অর্জুন এরপর হারান উজবেক গ্র্যান্ডমাস্টার নডিরবেক আব্দুসাত্তারভকে (Nodirbek Abdusattorov)। ফাবিয়ানো কারুয়ানার (Fabiano Caruana) সঙ্গে ড্র, দিন শেষ করেন যৌথ শীর্ষে থেকে। টেবিলের মাথায় তাঁর নাম থাকা এখন আর অবাক করার মতো নয়।
ভারতীয় দাবার ভবিষ্যৎ: অর্জুন কোথায় দাঁড়িয়ে?
ভারতীয় দাবায় এই মুহূর্তে তরুণদের ভিড়। ডি. গুকেশ (D. Gukesh), প্রজ্ঞানন্দ (R. Praggnanandhaa), বিদিত (Vidit Gujrathi)—নাম অনেক। কিন্তু অর্জুন এরিগাইসির (Arjun Erigaisi) একটা আলাদা পরিচিতি তৈরি হচ্ছে। তাঁর খেলায় ভয় নেই। রেটিং পয়েন্ট বাঁচানোর হিসেব নেই। তিনি খেলেন জেতার জন্য। ব্লিটজ, র্যাপিড, ক্লাসিকাল—তিন ফরম্যাটেই অর্জুনের পারফরম্যান্স ক্রমশ স্থিতিশীল হচ্ছে। ২০২৫ সালে টিম মিজিডি১–এর হয়ে বিশ্ব র্যাপিড টিম চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা, অনলাইন ফ্রিস্টাইল ইভেন্টে টানা তিনবার জয়—এই সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে, অর্জুন শুধু বোর্ডে নয়, মানসিক দিক থেকেও ক্রমশ পরিণত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের নজরে কার্লসেনের (Magnus Carlsen) টেবিল চাপড়ানো আসলে প্রতীক। এক যুগ ধরে যে সিংহাসন অটল ছিল, সেখানে এখন নিয়মিত ধাক্কা লাগছে। আর সেই ধাক্কা দেওয়া তরুণদের সামনের সারিতেই অর্জুন এরিগাইসি (Arjun Erigaisi)। ২২ বছর বয়সে এত কিছু অর্জনের পর প্রশ্নটা আর তাই ‘কে তিনি?’ নয়। সওয়াল বদলে যাচ্ছে—ভারতীয় দাবার পরবর্তী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কি এই অর্জুনই?—এই বয়ানে।