
শেষ আপডেট: 9 February 2024 14:39
জেদ থাকলে সাফল্য আসবেই। লড়াইয়ের ইচ্ছে থাকলে যত বাধাই আসুক না কেন, সেগুলি তুচ্ছ মনে হবে। বাংলার দুই মহিলা ক্যারাটেকারের গল্পগুলো অনেকটা তেমনই।
আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় ক্যানিংয়ের দুই বীরাঙ্গনা সোনা জয় করে চমকে দিয়েছেন। ক্যানিংয়ের মাতলা ২ পঞ্চায়েতের থুমকাঠি এলাকার বাসিন্দা পেশায় অটোচালক অভ্রদীপ দেবনাথ। স্ত্রী মণিমালা, এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সংসার। দম্পতির একমাত্র মেয়ে অদিতি ক্যানিংয়ের দ্বারিকানাথ বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী।
অন্যদিকে ক্যানিংয়ের দিঘিরপাড় পঞ্চায়েতের ১ নম্বর দিঘিরপাড় মণ্ডল ১ গার্লস স্কুল পাড়ার বাসিন্দা গৃহবধু পূর্ণিমা মণ্ডল প্রধান। স্বামী নেই, একমাত্র মেয়ে ঐন্দ্রি ও মা প্রতিমা মণ্ডলকে নিয়ে সংসার। পাড়ায় রয়েছে ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান। কোনও রকমে দিন গুজরান করেন। পরিবারের একমাত্র মেয়ে দ্বারিকানাথ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ঐন্দ্রি। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যারাটে ট্রেনার রাজু বিশ্বাসের কাছে হাতেখড়ি ঐন্দ্রি ও অদিতির।
ক্যানিংয়ের দুই বালিকা বীরাঙ্গনা আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় সোনা পেয়ে গোটা ক্যানিং শহরকে গর্বিত করেছেন। বিগত দিনে ক্যানিংয়ের দুই কৃতি ক্যারাটেকার গত মে মাসে নেপালে আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন। অগস্টে হরিয়ানাতে জাতীয় ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় রুপো ও ব্রোঞ্জ পদক পান। গত বছরের জানুয়ারিতে খেলো ইন্ডিয়া গেমসে ‘কাতা’ ও ‘কুমি’ তে দুজনেই সোনা পেয়ে গ্রামের নাম রেখেছিলেন।
এছাড়া চলতি বছর জানুয়ারিতে বেলুড়ে হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতা। অংশগ্রহণ করেছিলেন ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার প্রায় ৮০০ প্রতিযোগী। সেখানে ক্যানিংয়ের দুই বীরাঙ্গনা কাতা ও কুমিতে সোনা জিতে সকলকে অবাক করে দেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি দুজনেই বিদেশের মাঠে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও ভাল ফল করতে বদ্ধপরিকর। বড় হয়ে দুজনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে চান। ঐন্দ্রি’র মা পূর্ণিমা দেবীর কথায়, ‘ওর বাবা নেই। একমাত্র মেয়েই আমার ধ্যানজ্ঞান। ওর আশা যাতে পূরণ করতে পারি সেই চেষ্টা চালিয়ে যাব। ওর স্বপ্ন মানে আমার স্বপ্ন।’
অদিতি’র মা মণিমালা জানিয়েছেন, মেয়ের অসম্ভব জেদ রয়েছে। ও চায় নিজেকে মেলে ধরতে। সেই সামর্থ্য আমাদের নেই। যদিও মাঝে মধ্যে ওর মামা মিলন সরকার ও প্রতিবেশী জেঠু সোমনাথ মণ্ডল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ভবিষ্যৎ কী হবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।
ক্যানিংয়ের দুই বীরাঙ্গনার ক্যারাটে কোচ রাজু বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘ঐন্দ্রি ও অদিতি দুজনেই হতদরিদ্র পরিবার থেকে লড়াই করে নিজেদের জাত চিনিয়েছে। এখন অনেক পথ বাকি রয়েছে!
আগামী দিনে দেশের বাইরে গেলে সেই খরচ কে দেবে? যদি কোনও সহৃদয় ব্যক্তি বা সংস্থা হতদরিদ্র দুই পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো আগামী দিনে ক্যানিংয়ের দুই বীরাঙ্গনা বিদেশের মাটিতে ক্যারাটে প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণ করে দেশের সম্মান বাড়াতে পারবেন। ক্যারাটে রিংয়ের চেয়েও বাস্তবের রিংয়ের লড়াই আরও বেশি কঠিন, সেটি বুঝতে পেরে গিয়েছেন বাংলার দুই অলঙ্কার।