দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেইসব ছোটবেলার দিনের কথা মনে পড়ছে। শৈশবে পেয়ারা গাছে দুলে জিমনাস্টিক্স খেলত একরত্তি মেয়েটি। বাবা-মা বারণ করতেন, ‘‘মনা রে, বেশি দোল খাস না, মাথা ঘুরে পড়ে যাবি।’’ ছোট্ট মেয়েটি কথা শুনত না। এইভাবে গাছে দুলতে দুলতে কবে যে নামী জিমনাস্ট হয়ে গিয়েছেন, নিজেই মনে হয় টের পাননি!
শনিবার দুপুরে নিজের স্মৃতিতে হাঁটছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের পিংলার অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে আসা জিমনাস্ট প্রণতি নায়েক। যিনি সারা ভারতে টোকিও অলিম্পিকে জিমনাস্টিক্সে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে টোকিও গেলেন।
টেনশন হচ্ছে না মেগা আসরে যাওয়ার আগে? প্রণতি বলছিলেন, ‘‘টেনশন তো হবেই, পিছন ফিরে তাকালে অদ্ভুত লাগে, একটা সময় কলকাতায় আসতে ভয় করত, সেই মেয়েটি আজ অলিম্পিকে নামবে, অবাক লাগছে আমার।’’
কেন? জিজ্ঞাসা করলে প্রণতি বলতে থাকেন, ‘‘আমি খুব কষ্ট করে বড় হয়েছি, বাবা বাস ড্রাইভার ছিল, তাও স্থায়ী চাকরি নয়, কেউ না এলে তাঁর জায়গায় চালানোর ডাক আসত। অনোক কষ্ট করে মা সংসার চালিয়েছে। কত অভাবের মধ্যেও এগিয়েছি, তাই একটু তো অবাক লাগছেই।’’
রিও অলিম্পিকে ভারতকে আশা দেখিয়েছিলেন দীপা কর্মকার। তাঁর ভল্টের নামই হয়ে গিয়েছিল প্রোদুনোভা। এবার কী ‘প্রণিনোভা’ বলে কোনও ভল্টের হদিশ দেবেন আপনি? হাসছিলেন প্রণতি, জানালেন, ‘‘না, না আমার স্যার লক্ষ্মণ শর্মা আমাকে বলেছেন বেশি টেনশন নিবি না, যা পারবি, যা এতদিন শিখেছিস, সেটাই করবি। বাড়তি চাপ নিলে ফল ভাল হবে না।’’ প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে এশীয় জিমনাস্টিক্সে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন প্রণতি লক্ষ্মন স্যারের কোচিংয়ে। তারপর থেকে টানা দু’বছর তাঁর কাছে তালিম নিয়ে নিজেকে অনেক উন্নত করেছেন।
প্রণতির আসল কোচ যদিও সাই কলকাতার মিনারা বেগম। তিনি চেয়েছিলেন ছাত্রীর সঙ্গে টোকিও যেতে, কিন্তু তিনি অনুমতি পাননি। মিনারা বলছিলেন, ‘‘গতবার তো দীপার সঙ্গে বিশেশ্বরদা যেতে পেরেছিলেন, তিনি পারলে আমি নয় কেন? এগুলি আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত।’’ লক্ষ্মণ শর্মা যদিও প্রণতির পাশে থাকবেন অলিম্পিকে।
অলিম্পিকে চতুর্থ হওয়া দীপার সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রণতি বলেছেন, হ্যাঁ, দীপাদিই আমাকে ফোন করে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ফ্লোর এক্সারসাইজের সময় অনেকক্ষেত্রে গানের সুর ডিসটার্ব করে, সেটি দেখে নিতে, কারণ সুর গণ্ডগোল করলে ছন্দ ব্যাহত হয়। প্রণতির অবশ্য গানের সুর ঠিক করা হয়ে গিয়েছে, তিনি মাসাআল্লা...গানটি বাজাবেন ওইসময়। অলিম্পিক্সে দল এবং ব্যক্তিগত চারটি বিভাগে নামবেন প্রণতি। চারটি ইভেন্টে তাঁকে লড়াই করতে হবে। ফ্লোর এক্সারসাইজ়, আনইভেন বার্স, ব্যালান্স বিম এবং ভল্ট।
প্রণতির আক্ষেপ, করোনার কারণে গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে প্র্যাকটিসই করতে পারেননি দীর্ঘদিন। টানা দু’মাসে কলকাতা সাই কেন্দ্রে প্রস্তুতি নিতে পেরেছেন। তাই জানালেন, ‘‘একেকজন জিমনাস্ট টানা দু’বছর সমানে আধুনিক তালিম নিয়েছেন, সেখানে আমি দু’মাসের বেশি ভাল করে ট্রেনিংই নিতে পারলাম না। তাও আমি শেষ পর্যন্ত লড়ব।’’ বলার সময় দৃপ্ত লাগে তাঁর কন্ঠস্বর।