শুভশক্তির জয় যেহেতু নিশ্চিত, তাই সময়ের নিয়মেই শেষ হয় হোলাস্তাক। হোলিকা দহনে অশুভর সমাপ্তি শেষে ফাল্গুনী বাতাসে ভর করে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ওড়ে শান্তির ফাগ।

শেষ আপডেট: 2 March 2026 14:11
আটদিনের হোলাস্তাক পর্ব শেষ। আজ সোমবার হোলিকা দহন। মান্যতা পেতে ছেলে প্রহ্লাদের উপর আটদিন ধরে লাগাতার অত্যাচার চালিয়েছিলেন বাবা হিরণ্যকশিপু। তাই ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথি থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত এই ৮ দিন হোলাস্তাক, অশুভ সময় হিসেবেই চিহ্নিত। শুভশক্তির জয় যেহেতু নিশ্চিত, তাই সময়ের নিয়মেই শেষ হয় হোলাস্তাক। হোলিকা দহনে অশুভর সমাপ্তি শেষে ফাল্গুনী বাতাসে ভর করে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ওড়ে শান্তির ফাগ।
এই হোলিকা দহনই বাংলায় পরিচিত ন্যাড়া পোড়া হিসেবে। সন্ধে নামবে। ফাগুনের বাতাস বইবে। আকাশে দোলের আগের চাঁদ। পাড়ায় পাড়ায় ছেলেবুড়োরা গেয়ে উঠবে, ‘আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া , কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে, বল হরিবোল।’ আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করবে গোটা দিন ধরে বানানো কাঠ-পাতার ঘর। যাবতীয় অশুভর বিনাশ শেষে ঘোষিত হবে শুভর জয়।
কী এই হোলিকা দহন? কেনই বা ন্যাড়াপোড়া? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পুরাণে ফেরা। বাবার থেকে বিষ্ণুকে যে আগে রেখেছিলেন ভক্ত প্রহ্লাদ। তাই না রাজা হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে লাগাতার টানাপড়েন। কিন্তু শত বুঝিয়েও যে ছেলের মন বিষ্ণুর থেকে নিজের দিকে ঘোরাতে পারেননি নিজের দিকে। ভগবান বিষ্ণু নন, তিনিই শশাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর, বলাতে পারেননি ছেলেকে দিয়ে। তাই বারবার অত্যাচার নেমে এসেছে। কিন্তু টলানো যায়নি প্রহ্লাদকে। বাবার কাছ থেকে যত বাধা এসেছে, ততই তিনি আঁকড়ে ধরেছেন ভগবান বিষ্ণুকে। এমন ভক্ত যে ভগবানেরও ভালবাসার ধন।
আগে বহুবার ব্যর্থ হয়েছে প্রহ্লাদকে প্রাণে মারার চেষ্টা। শেষপর্যন্ত বোন হোলিকার শরণাপণ্ণ হলেন দাদা হিরণ্যকশিপু। তপস্যায় ব্রহ্মার বর পেয়েছিলেন তিনি। আগুন তাঁকে পোড়াতে পারবে না। এবার হিরণ্যকশিপু পরিকল্পনা করলেন পিসি হোলিকার কোলে বসিয়েই আগুনে পুড়িয়ে মারবেন প্রহ্লাদকে। আটদিনের লাগাতার অত্যাচারেও যখন প্রহ্লাদ তাঁকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করল না, তখন হোলিকার কোলে বসানো হল তাকে। জ্বলে উঠল আগুন।
কিন্তু এ কী কাণ্ড! প্রহ্লাদের সুরেলা কণ্ঠের অনুরণন শোনা যাচ্ছে যে! ওম নমঃ ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ। আর জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে হোলিকার শরীর। নিজের দু চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না রাজা হিরণ্যকশিপু। এখানেও এক গল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে পুরাণে। আসলে ব্রহ্মার বরে যে অগ্নিরোধী উত্তরীয়টি পেয়েছিলেন হোলিকা, আগুন জ্বলে ওঠার পরে ফাল্গুনী হাওয়া সেটিকে দিয়ে আচ্ছাদিত করে ফেলল ভক্ত প্রহ্লাদের শরীর। তাই বিষ্ণুর ভক্ত সেই আগুনেও বসে রইলেন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায়। আগুনে পুড়লেন উত্তরীয় হারানো হোলিকা।
কিন্তু কেন রাক্ষস হিরণ্যকশিপুর সন্তান হয়েও ভগবান বিষ্ণুর উপর এমন আনুগত্য প্রহ্লাদের? পুরাণ মতে হিরণ্যকশিপু যখন তপস্যায় মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী কায়াদুকে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন দেবর্ষি নারদ। মাতৃগর্ভে থাকাকালীনই দেবর্ষির ভক্তিপূর্ণ কথা প্রহ্লাদ শুনতেন। এই আধ্যাত্মিক শিক্ষা তাঁর চরিত্রের অংশ হয়ে যায়। জন্মের পরেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন দেখা যায় প্রহ্লাদের ভাবনায়-আচারে।
সে যাই হোক, হোলিকা দহন হল। বিনাশ হল অশুভ শক্তির। ফাগ উড়ল বাতাসে। দোল পূর্ণিমার আলোয় ভাসল চরাচর।