
শেষ আপডেট: 21 November 2023 14:38
সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টে হওয়া সাম্প্রতিক মামলাগুলির দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হবে যে কতিপয় রাজ্যপাল তাতে নয়া মাত্রা যোগ করেছেন। ওই রাজ্যপালদের বিরুদ্ধে গুচ্ছ মামলা আদালতের বিচারাধীন। যার অতীত নজির নেই। রাজ্যপালদের বিরুদ্ধে মামলা হত ভিন্ন কারণে এবং তা ছিল অতিবিরল বিষয়।
রাষ্ট্রপতির মতো রাজ্যপালেরাও সংবিধানের রক্ষক। ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হল, সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তিদের আদালতের কাঠগড়ায় না তোলা। চেষ্টা করা, আইন ও সাংবিধানিক বিবাদ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা। কিন্তু কতিপয় রাজ্যপাল যে পরিস্থিতি তৈরি করেছেন তাতে তাঁদের আর সংবিধানের রক্ষক নয় বরং লঙ্ঘনকারী বলা চলে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর রাজ্যপালদের সমালোচনা করেছে। বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ করায় তুমুল সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ রাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ সময়ের উপাচার্য নেই।
এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা একটি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁরা রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারকে বলেছিল দু পক্ষ মুখোমুখি বসে বিবাদ মিটিয়ে নিতে। সোমবার দেখা যায়, রাজ্যপালের আইনজীবী বলছেন তিনি এই ব্যাপারে কিছু জানেন না। রাজ্য সরকারের কৌঁসুলির বক্তব্য ছিল, আদালত এমন কোনও নির্দেশ দেয়নি।
আসলে সুপ্রিম কোর্ট পরামর্শটি পর্যবেক্ষণ হিসাবে দিয়েছিল। দু’পক্ষই শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণকেই শিরোধার্য করতে পারত। তারা তা করেননি।
কতিপয় রাজ্যপালের ভূমিকা আরও অসাংবিধানিক। তামিলনাড়ু, কেরল, পাঞ্জাব ও তেলেঙ্গানার রাজ্যপালেরা সাম্প্রতিককালে শীর্ষ আদালতে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যপালেরা কেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।
রাজ্যপালেরা বিলে সম্মতি দিলে তবেই একটি বিষয় আইনে পরিণত হয়। তাঁরা তাতে চোখকান বুজে সায় দিতে বাধ্য নন। তাঁরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। কিন্তু দিনের পর দিন কোনও বিল ফেলে রাখতে পারেন না।
সোমবার যেমন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল এন রবির উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, তিন বছর হয়ে গেল, এতদিনেও বিলে সম্মতি দিতে পারলেন না? রাজ্যপাল রবি রাজ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া ১২টি বিল আটকে রেখেছেন। কেরলের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান আটকে রেখেছেন সাতটি বিল। পাঞ্জাবের রাজ্যপাল বানোয়ারিলাল পুরোহিত বিল আটকে দেওয়ার পাশাপাশি লড়াইকে কয়েককদম এগিয়ে নিয়ে রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে সম্মতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন।
এই জাতীয় একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যপালদের মনে করিয়ে দিয়েছে, আপনারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নন, মনোনীত পদাধিকারী। আপনারা পদে পদে রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিবাদ করতে পারেন না।
রাজ্যপালের কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে কাজ করেন। ধরেই নেওয়া যায়, অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে রাজ্যপালদের এমন আচরণ প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অজানা নয়।
বিরোধীদের অভিযোগ, মোদী সরকার দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোটিকে ধ্বংস করতে চাইছে। তাই পদে পদে রাজ্য সরকারের সঙ্গে রাজ্যপালেরা বিবাদে লিপ্ত হচ্ছেন। রাজ্য সরকারের কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করছেন। উদ্দেশ্য অবিজেপি শাসিত রাজ্যের সরকারগুলি যাতে কল্যাণমূলক কাজ করতে না পারে। কারণ আইন প্রণয়ন করা হয় জনকল্যাণে। স্বয়ং রাজ্যপালেরা যদি তাতে পদে পদে অসহযোগিতা করেন তাহলে জনকল্যাণের বিরোধিতাই করা হয়।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের উদ্দেশে যে কথা বলেছেন তা সব রাজ্যপালের জন্যই অত্যন্ত জরুরি একটি বার্তা। আশা করা যায়, পদমর্যাদার কথা বিবেচনায় রেখে এখন থেকে পদক্ষেপ করবেন রাজ্যপালেরা।