অরবিন্দ সামন্ত
আমরা ইতিমধ্যেই অসামাজিক সামাজিকতায় বেশ সড়গড় হয়ে উঠেছিলাম। রাস্তাঘাটে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে স্রেফ শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে, মৌন শুভেচ্ছা বিনিময় করেই সামাজিক কর্তব্য সেরে ফেলতে পারতাম। স্বজনবেষ্টিত সান্ধ্য আড্ডায় পরিচিত বাংলা সিরিয়ালের সাধু-শয়তান, শাশুড়ি-বউমা, সতী-অসতী, সধবা-বিধবা বায়নারির পরিচিত ডিসকোর্সের বাইরে আর কারও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা তেমন ভাবিত ছিলাম না। ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ, জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক, উভয় পরিসরেই স্বার্থমগ্ন বিরূপতায় আমরা তুলনাহীন হয়ে উঠেছিলাম। এই নিষ্করুণ অসামাজিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করল কোভিড-১৯। বিশ্বায়নের যুগেও আত্মমগ্ন আত্মকেন্দ্রিকতায় আমাদের পুরনো পাঠাভ্যাসে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ল! কেননা নভেল করোনাভাইরাস মহামারির জন্য আজ অনেকেই বিশ্বায়নের সমাজবদ্ধতাকেই দায়ী করছেন। ভবিষ্যতে যাতে এইরকম পরিস্থিতির উদ্ভব না হয় সেজন্য তারা দেশকে বিশ্বায়নের গাঁটছড়া থেকে বেরিয়ে আসার নিদান দিচ্ছেন। নতুন অর্থনৈতিক অভিজ্ঞান বলছে দেশে দেশে বিভেদের দেওয়াল তোলো, বিশ্ব-পর্যটন হ্রাস করো, বিশ্ববাণিজ্যে রাশ টানো।
নোওয়া হারারি— যিনি ‘স্যাপিয়েন্স’ কিংবা ‘হোমো ডেয়ুস’ লিখে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন তিনি অবশ্য আমাদের অন্য কথা শুনিয়েছেন। টাইম পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলছেন, মহামারি নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি কোয়ারেন্টাইন খুব জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী তো হবেই না, উপরন্তু বিশ্বে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশ্বব্যাপী মহামারি নিয়ন্ত্রণের প্রকৃত প্রতিষেধক পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা বা সঙ্গ-রোধ নয়, বরং আরও বেশি পারস্পরিক নিবিড় সহযোগিতা।
বিশ্বায়নের বহু আগেও মহামারি কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। চতুর্দশ শতকে আকাশযান ছিল না, ছিল না বিশ্বব্যাপী এত মানুষের ভূপর্যটন। তবুও প্লেগ মহামারি, যা ইতিহাসে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত, তা দীর্ঘ এক দশক যাবৎ পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিকদের অনুমান, এর ফলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের জীবনহানি ঘটেছিল। ইংল্যান্ডে প্রতি দশজনের মধ্যে চারজন মানুষ মারা গিয়েছিল। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের এক লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে মারা গিয়েছিল পঞ্চাশ হাজার মানুষ।
১৫২০ সালের মার্চ মাসে একটিমাত্র মানুষ— ফ্রান্সিসকো দ্য ইগুইয়া— বসন্ত রোগের জীবাণু বয়ে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন মেক্সিকোতে। সে সময় মধ্য-আমেরিকায় ট্রেন ছিল না, বাস ছিল না, ছিল না মনুষ্যবাহী পশুও। তবুও ওই বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই মধ্য-আমেরিকা বসন্ত মহামারিতে বিধ্বস্ত হল। সেখানকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি কয়েক মাসের মধ্যেই সারা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের প্রান্তে-প্রত্যন্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষ— পৃথিবীর সামগ্রিক জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। আর এক বছরের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়েছিল দশ কোটি মানুষ। ভারতের জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ মারা গিয়েছিল এই ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে। এককথায়, চার বছর ধরে লোকক্ষয়ী বিশ্বযুদ্ধে যত না সেনা মারা গিয়েছিল তার থেকেও বেশি মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে।
বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে মানবজাতি আরও বেশি মহামারিপ্রবণ হয়ে উঠল প্রধানত দু’টি কারণে। এক, দ্রুতহারে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব বৃদ্ধি আর দুই, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি। হারারি বলছেন, মধ্যকালীন ফ্লোরেন্সের থেকেও আধুনিক টোকিও কিংবা মেক্সিকো সিটি আরও বেশি করে প্রাণঘাতী প্যাথোজেনের মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে উঠল। একটি ভাইরাস এখন মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই প্যারিস থেকে টোকিও কিংবা মেক্সিকো সিটিতে হানা দিতে পারে। সুতরাং আমরা এখন সংক্রামক ব্যাধির অনেক বেশি সম্ভাবনাময় মারণবিশ্বে বসবাস করছি।
তবুও আশার কথা, সংঘটন এবং প্রভাবের গুরুত্বের নিরিখে এই সেদিনও মহামারি ততটা মারমুখী ছিল না। এড্স কিংবা ইবোলা মহামারির গ্লোবাল সম্প্রসারণ সত্ত্বেও একবিংশ শতকে মহামারি যে পরিমাণ প্রাণহানি ঘটিয়েছে তুলনামূলকভাবে তা অনেক নিরীহ। তার কারণ হিসেবে হারারি বলছেন, প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন আর আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ তেমন বড় হাতিয়ার নয়। এখনকার লড়াইয়ের নির্ভরযোগ্য অস্ত্র হল ইনফর্মেশন বা তথ্যসম্ভার। মহামারির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ডাক্তার আর প্যাথোজেনের লড়াইয়ে একদিকে যেমন প্যাথোজেন দিশেহারা অন্ধের মতো মিউটেশনের ওপর নির্ভর করছে তেমনই অন্যদিকে ডাক্তার-বিজ্ঞানীরা প্রতিজ্ঞা করছেন কীভাবে ভাইরাসের মতিগতির হরেক রকমের তথ্যের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে কত সহজে হনন করা যায়।
সেকালের প্লেগ মহামারির সময়ে মানুষ জানত না এ রোগ এল কী করে আর যাবেই বা কীভাবে। তারা ব্যাকটেরিয়ার কথা জানত না, শোনেনি ভাইরাসের কথাও। নিরূপায় অসহায় মানুষ তাই প্রাণভয়ে দেবস্থানে গিয়ে প্রার্থনা করত, অজ্ঞাত অপরাধের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করত। তারা ভয় পেত নানা দেবতা-অপদেবতাকে। গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে তারা পূজার্চনা করত কূপিত দেবতাকে শান্ত করতে। কিন্তু তাদের ধারণা ছিল না যে, একফোঁটা জলের মধ্যেও আত্মগোপন করে থাকতে পারে কোনও না কোনও অদৃশ্য ঘাতক জীবাণু। ফলত সমবেত গোষ্ঠীবদ্ধ প্রার্থনাসভা রোগের উপশম তো করেনি, উপরন্তু সংক্রমণ বাড়িয়েছিল।
গত শতাব্দীতে বিশ্বের নানা বিজ্ঞানী, ডাক্তার আর নার্সরা মিলে মহামারির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন, বুঝতে পেরেছেন মহামারির আন্তর্গঠন প্রক্রিয়া, আর তাই মোকাবিলা করার আরও কার্যকরী পদ্ধতি। বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যার দ্বারা জানতে পেরেছেন, কখন কীভাবে নতুন রোগের উদ্ভব হয়, কিংবা পুরনো রোগ কখন কীভাবে মারাত্মক হয়ে ওঠে। জেনেটিক্স আর জেনোমের মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞান যা জেনেছে তাতে মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যেই নভেল করোনাভাইরাসকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে, চিহ্নিত করা যাচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিকেও। সে যুগের মানুষ প্লেগের কারণ জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি ফ্লু-র মতিগতি আর গতিপ্রকৃতি। তাই তাদের ঠেকাতে ঠেকাতেই হয়ে গিয়েছিল বিপুল লোকক্ষয়। ভ্যাকসিন, অ্যান্টিবায়োটিক, উন্নত স্বাস্থ্যবিধি আর উন্নততর মেডিক্যাল পরিকাঠামোর কল্যাণে আজ মানুষ তাদের অদৃশ্য ঘাতকের বিরুদ্ধে আরও বেশি শক্তি দিয়ে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। হারারি জানাচ্ছেন, ১৯৬৭ সালেও বসন্ত মহামারি দেড় কোটি মানুষকে আক্রান্ত করেছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ। কিন্তু পরবর্তী দশ বছরে বিশ্বব্যাপী স্মলপক্স প্রতিরোধের সার্বিক প্রয়াসের ফলে ১৯৭৯ সাল নাগাদ এই রোগ পৃথিবী থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
তা হলে, মহামারির এই ইতিহাস আজকের নভেল করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের কী শিক্ষা দিল? দু’টি শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, চিরকাল দেশের সীমানা সিল করে রাখলেই মহামারির কবল থেকে বাঁচবেন এমন কোনও নিশ্চিত গ্যারান্টি নেই। ভেবে দেখুন, গ্লোবালাইজেশনের বহু আগেও মধ্যযুগের ইওরোপেও মহামারি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস শিক্ষা দেয়, প্রকৃত সুরক্ষা আসে বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের পারস্পরিক লেনদেনের মাধ্যমেই। কোনও দেশে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে সে দেশের উচিত নিজের অর্থনৈতিক বিপর্যয়-আশঙ্কার কথা না ভেবে অত্যন্ত সততার সঙ্গে মহামারি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য বিশ্ববাসীকে জানানো।
আজ বিশ্ববাসী যে গভীর সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে তা শুধুমাত্র করোনাভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণজনিত আতঙ্কের জন্য নয়। আমরা আতঙ্কিত কেননা আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটিই নড়ে গেছে। প্রধানত দু’টি জায়গায় এই অবিশ্বাস কাজ করছে। এক, একটি দেশ আর একটি দেশকে সন্দেহের চোখে দেখছে। এই অবিশ্বাস শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্তরেই আর সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন প্রবলভাবে অর্থনৈতিক। ২০১৪ সালে ইবোলা মহামারির সময় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সংক্রমণ দমনে একধরনের সদর্থক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছিল। সে নেতৃত্ব রাজনৈতিক ছিল না, ছিল মানবিক। কিন্তু আজ আমেরিকা সেই নেতৃত্ব গ্রহণে আগ্রহী নয়। উপরন্তু একধরনের আহাম্মকী উদাসীন আত্মম্ভরিতায় সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আমেরিকার সাম্প্রতিক কাজকর্ম প্রমাণ করে যে, মোটা দাগের অর্থনৈতিক স্বার্থের টান ছাড়া সে আর কোনও নিঃস্বার্থ বিশ্বজনীন কাজে আগ্রহী নয়। আর দুই, মানুষ আজ বিজ্ঞানের ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না। কেননা বিজ্ঞানের সত্য দ্রুত এবং ক্রমাগত তার স্থান এবং অবস্থান বদল করে চলেছে। আজকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে যা বৈজ্ঞানিক সত্য বলে মান্য কালই তা বিতর্কিত কিংবা ভ্রান্ত বলে বর্জিত হচ্ছে। ফলত, এর বিপ্রতীপে সমাজে নানা কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস বিস্তারিত হচ্ছে।
আমাদের দেশের কথাই ধরুন। বিশ শতকের শুরুতে কলকাতায় যখন প্লেগ রোগ মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ল, শিক্ষিত সমাজ বিধান দিল মন্দিরে, মসজিদে, গির্জায়, ব্রাহ্ম উপাসনালয়ে একদিন মানুষ সমবেত হয়ে প্রার্থনা করুক রোগমুক্তির লক্ষ্যে। তারা আশা করেছিলেন এইভাবেই মানুষ নিজের নিজের ধর্মবিশ্বাস অনুসারে নিজের নিজের সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে প্রার্থনা করলে সর্বশক্তিমান বিশ্ববিধাতা তাঁর সন্তানদের রক্ষা করবেন। কলেরা বা বসন্ত মহামারির সময়ে, বিগত অভিজ্ঞতা থেকে তারা মনে করেছেন, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে হরিনাম সংকীর্তন করার ফলেই কলেরা আর বসন্ত মহামারি থেকে মুক্তি পাওয়া গিয়েছিল। সুতরাং প্লেগের সময়ও উচিত সংকীর্তনদলের পাড়ায় পাড়ায় উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম সংকীর্তন করা। একইভাবে ঔপনিবেশিক সরকার বিধান দিয়েছিল প্লেগের জীবাণুবাহক ইঁদুর নিধন অভিযানের। সরকারের কাছ থেকে আর্থিক পুরস্কারলাভের আশায় অনেকেই ইঁদুর নিধনে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। আর সেই কারণেই কলকাতার মাড়ওয়ারি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এর বিরুদ্ধে মারমুখী হয়ে ওঠে, কেননা ইঁদুর গণেশের বাহন। ইঁদুর মারার মূল্যে প্লেগ নিবারণের চেয়ে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে গণেশকে সন্তুষ্ট রাখা তাদের কাছে বেশি জরুরি ছিল। বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে ক্ষুদ্রতর সম্প্রদায়ের আর্থিক স্বার্থরক্ষা তাদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছিল।
শতবর্ষ পরেও আমরা কতটা গোষ্ঠীভাবনায় উদ্বুদ্ধ হতে পেরেছি? আজ সকালে কন্যা ফোনে জানাল এক অভিজ্ঞতার কথা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে সে তার বাড়ির কর্মসহায়িকাকে হাতে গ্লাভস আর নাকে-মুখে মাস্ক পরিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটি তাতে নাকি হেসে উত্তর দিয়েছিল, ‘দিদি, আমাদের এইসব রোগ হয় না। এ হল বড়লোকদের রোগ।’ কন্যা তাতে বিস্ময় প্রকাশ করলে মেয়েটি তার সুস্থির বিশ্বাস বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলে, ‘দেখছ না দিদি, যারা উড়োজাহাজে চড়ে, শপিং মলে বাজার করে তাদের ঘরেই করোনা হচ্ছে।’ যুক্তি এবং পরিসংখ্যানের এই যুগপৎ যুগলবন্দিকে আপনি অস্বীকার করবেন কী করে? শুধু বড়লোক নয়, উচ্চশিক্ষিত ক্ষমতাসীন বড়লোকরাই আজ সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া, স্বার্থপর আর ভয়ংকর। কলকাতায় আজ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য!
এর পাশাপাশি ভাবুন বিজ্ঞানের কথা। এ যুগে আমরা জীবনচর্যায় কতটা বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছি? আমরা গণেশমূর্তিতে সে যুগের প্লাস্টিক সার্জারির উন্নতির পরাকাষ্ঠা লক্ষ করি, গোদুগ্ধকে স্বর্ণখনির আধার মানি, ময়ূরের চোখের জলেই গর্ভসঞ্চারের কৌশল খুঁজি আর গোমূত্র পানের মাধ্যমেই করোনাভাইরাস নিধনের নিদান মানি। দেশনেতাও উপদেশ দিলেন হাততালি দিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে আর মোমবাতি জ্বালিয়ে করোনাভাইরাস তাড়াতে। ভয় হয়, কেননা এসবই শিক্ষিত মানুষদের ডিসকোর্স। অশিক্ষিতের সংলাপ নয়। নভেল করোনাভাইরাস আমাদের যতটা না ভয় দেখিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয় পাওয়াচ্ছে এই অবিজ্ঞান-অপবিজ্ঞানের প্রতি আমাদের অবিচল নিষ্ঠা আর শিক্ষিত ক্ষমতাবানদের অপরিসীম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
লেখক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়