শেষ আপডেট: 28 October 2020 16:22
যতই তত্ত্ব করি না কেন, যতই বিভিন্ন মত নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত করতে উঠে পড়ে লাগুক, আসলে কবিতা এমন এক অনাবিষ্কৃত অঞ্চল, যার জন্য হয়তো একটি শব্দ প্রযোজ্য, আর তা হল বিস্ময়বোধ। কবিতা সবসময়েই আমাদের বিস্মিত করে, তার অন্তর্নিহিত শক্তি দিয়ে। কেননা সে অপ্রত্যাশিত রূপেই আমাদের কাছে আসে। তাই কবিতার জন্য আমাদের ভাল লাগা বা খারাপ লাগার মতামতের বাইরেও একটা জায়গা থাকে। আর তা হল অমীমাংসিত। আমরা আমাদের মত কবিতার উপরে চাপিয়ে দিতে পারি না। কবিতার বিভিন্ন স্কুলিং-এর কথা মাথায় নিয়েও তাই, তার বৈচিত্রপূর্ণ অস্তিত্বের জন্যই অপেক্ষা করা ভাল।
আর সেই অপেক্ষার জায়গা থেকেই বলা যায় কবি সুবোধ সরকারের কবিতা বাংলা কবিতায় এমন এক অঞ্চল এনে দিল, এমন এক বাতাস এনে দিল, যা অনন্য। বিশেষ করে, আমরা যদি চল্লিশ পরবর্তী বিশ্ব কবিতার আঙ্গিকের কথা ভাবি, তাহলে, তীক্ষ্ণ বক্তব্যসম্পন্ন এক কাব্যভুবন উঠে এসেছিল বিশ্ব কবিতায় সেই সময়ে। সময়ের অস্থিরতা, টানাপোড়েন, যুদ্ধ, বিপ্লব, পুঁজিবাদের আরও ভয়ংকর আগ্রাসী এক রূপ, সাধারণ মানুষের অবস্থার শোচনীয় ক্ষয়– এই সবকিছুই সমাজ থেকে ঔচিত্যবোধ ও মানবিকতাকে যখন ক্রমশ মুছে দিতে শুরু করেছে, তখন কবিতা ও শিল্প হয়ে উঠেছে মানুষের কথা বলার হাতিয়ার। এ প্রসঙ্গে স্টিফেন স্পেন্ডার, গার্সিয়া লোরকা, মায়াকোভস্কি, জোসেফ ব্রডস্কি, নেরুদা, নিকানোর পাররার, অক্টাভিও পাস, মিরোশ্লাভ হোলুব এমনকি হয়তো অ্যালেন গিনসবার্গের কবিতার প্রসঙ্গও বলা যায়।
সমাজের যে বিভিন্ন অসঙ্গতিগুলো আমাদের ক্লান্ত করে, বিধ্বস্ত করে, আমাদের মনের ভিতরে রক্তপাত এনে দেয়, সেই সব অসঙ্গতিগুলিকে নিয়ে কবিতা লেখেন সুবোধ সরকার। একপ্রকার তীক্ষ্ণ শ্লেষ, রাজনৈতিক সন্দর্ভের হাত ধরেই কবিতার মধ্যে উঠে আসে তাঁর কলমে। এই বীজ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের চতুর্দশপদী কবিতাগুলির মধ্যেও পাওয়া যায়। ঋক্ষমেষ কথা-র মধ্যেও বোঝা যায় এক ভীষণ সংবেদনশীল মানুষ জীবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উনুন থেকে যে ধোঁয়া উঠতে দেখছেন, তার মধ্যে মিশে আছে অনেককালের যন্ত্রণা, অনেক মানুষের দুঃখ, লড়াই এবং হেরে যাওয়া।
একজন কবি তো সমাজসংস্কারক নন, কবিতাও পারে না রাষ্ট্র ও সামাজিক বিপ্লব এনে দিতে। কিন্তু কবিতা যা পারে, তা হল, আগুনে হাওয়া দিতে। এর আগে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের, সৃজন সেনের , সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাতেও আমরা পেয়েছি এই রাজনৈতিক বিসুভিয়াসের আত্মপ্রকাশ। সুবোধ সরকারের কবিতা একপ্রকার অ্যালোট্রপ সেই সব কাব্যের, কিন্তু নিজস্ব কবিতাবীক্ষায় নিজের কণ্ঠস্বরও সেই সব কবিতা খুঁজে পেয়েছে প্রথম থেকেই।
মারাঠি ব্রাহ্মণেরা আপনার তিনশো কবিতা পাথর বেঁধে নদীর জলে
ফেলে দিয়ে বলেছিল, "শূদ্র, শূদ্রের মতন থাক্
কবিতা লেখার এতই যখন শখ ব্রাহ্মণ হয়ে জন্মালেই পারতিস্।
কিন্তু সারা মহারাষ্ট্রের মানুষ বিশ্বাস করে
আপনার তিনশো কবিতা
একবছর বাদে জল থেকে উঠে এসেছিল।
একটি ব্রাহ্মণ কন্যা একবার স্বপ্নে দেখেছিল আপনাকে
বিছানায় উঠে বসে সে তার স্বামীকে জড়িয়ে ধরে বলে ফেললো
'জানো কে এসেছিল স্বপ্নে, তুকারাম'
সেই রাতে স্বামী নতুন বৌকে বেদম পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়
মেয়েটি কি পেরেছিল আপনার গ্রামে পৌঁছতে?
এই মেয়েটি মারাঠি ভাষার প্রথম মহিলা কবি।
তুকারাম, আপনার কবিতা জল থেকে উঠে এসেছিল কিনা জানি না
তবে মেয়েটি স্বামীর হাতে মার খেয়ে বাড়ী ছেড়েছিল
সে চোখ বন্ধ করে মুখস্থ বলতো আপনার তিনশো কবিতা
৩৮ বছর বয়সে, তুকারাম, আপনাকে হত্যা করা হলো
কিন্তু ব্রাহ্মণেরা একটা ছোট্ট সত্য বুঝতে পারেনি সেদিন
কবিতার পান্ডুলিপি জলে ফেলে দিলেই, কবিতা ডুবে যায় না।
(তুকারাম, সুবোধ সরকার)
‘তুকারাম’ কবিতাটি আজকের ভারতবর্ষের প্রেক্ষিত থেকে বিচার করলে এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ কবিতা। যখন ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে উচ্চশ্রেণির হিন্দুত্ব দলিত শ্রেণির মানুষ এবং সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষদের উপর নামিয়ে আনছে জঘন্য অত্যাচার, যখন আমাদের দেশ আবার পিছনের দিকে হাঁটছে, তখন এই কবিতাটিই যে এই সময়ের এক রাজনৈতিক কবিতা, সে বিষয়ে মনে হয় না কারো দ্বিমত থাকবে। রাজনৈতিক কবিতা মানে যে স্লোগানধর্মী নয়, তা প্রমাণ করে গেছেন সার্থক ভাবেই কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিকানোর পাররার-এর কবিতাও ভয়ংকর রাজনৈতিক। সুবোধ সরকারের কবিতার রাজনৈতিক সত্ত্বা একা মানুষের রাজনীতিকেই বারবার তুলে ধরে। ভারতের এই জাতিভেদ প্রথা, এই কণ্ঠরোধের রাজনীতির বিরুদ্ধে মাথা তোলার সময় এখনই। কারণ সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখতে পেয়েছি সুজাত বুখারি থেকে গৌরী লঙ্কেশ, ভারভারা রাও থেকে কলবুর্গী, সকলেরই উপর নেমে এসেছে ফ্যাসিবাদী শক্তির কুঠার, সেখানে ‘তুকারাম’-এর মতো রাজনৈতিক কবিতা যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সে বিষয়ে অন্তত আমার সন্দেহ নেই। আসলে ব্যক্তির রাজনীতি যদিও রাজনৈতিক বিশ্বে স্থান পায় না, কিন্তু ব্যক্তির রাজনীতিই আসল রাজনীতি। কারণ একজন ব্যক্তিই রাজনীতির মূল বিশ্বকে স্পর্শ করতে পারে কোনওরকম রাজনৈতিক চিহ্নিতকরণের দায় কাঁধে না চাপিয়ে। যখনই সেই ব্যক্তির দলীয় রাজনীতির জোয়াল কাঁধে চাপিয়ে নেয়, তখনই সে কোথাও ব্যক্তি রাজনীতির যে লক্ষ্য, তা থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, ব্যক্তি রাজনীতি যে সাবভার্সিভ যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারে, তা দলীয় রাজনীতিতে থেকে পারা সম্ভব কিনা। এ নিয়ে তর্ক স্বতন্ত্র বিষয়ের হলেও, এ কথা অনস্বীকার্য যে একজন কবি কিন্তু দলীয় রাজনীতির পতাকা ঘাড়ে করে চলেন না। তিনি তাঁর নিজস্ব রাজনীতির মশালই জ্বালিয়ে চলেন বিভিন্ন জায়গায়। যখনই দলীয় রাজনীতির ম্যানিফেস্টো রচনার ভার তাঁর উপর এসে পড়ে, তখন হয় কবিসত্ত্বা থেকে নয় তাঁর এই একা মানুষের রাজনীতির কণ্ঠ থেকে তিনি দূরে সরে যান। এ প্রসঙ্গে আরও একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে-
... আমি আরবি শিখিনি, ফারসি শিখিনি, উর্দু শিখিনি
বাংলাই আমার ভাষা, এই ভাষা আমার ভাত, আমার রুটি
আমার চোখের কাজল, আমার পায়ের ঘুঙুর ।
এই ভাষা আমার গোপন চিঠি, যার অক্ষরে অক্ষরে লেগে আছে
আমার চোখের জল ।
আমরা যেদিন বিয়ে করি
সেদিন কফিহাউস গিয়েছিলাম, ও সেদিন
আমাকে ঝোলা ভর্তি করে রবীন্দ্রনাথ কিনে দিয়েছিল
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে কানে কানে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন
ফিরোজা, তুমি আমার মৃন্ময়ী, তুমি আমার লাবণ্য
তুমি আমার সুচরিতা ।
সেদিন রাত্রে কি হয়েছিল জানি না
কি ঘটেছিল ওদের বাড়িতে, কি ঘটেছিল ওদের পাড়ায়, কি
. করেছিল ওদের
বাবাকাকা – সেটা আজও আমি জানি না
কিন্তু তার পরের দিন ওকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি
ও কোথায় চলে গেল আমি জানতে পারিনি ।
এই আপনাদের ভারতবর্ষ ?
এই আমাদের ভারতবর্ষ ?
আমি একজন সাধারণ মেয়ে
অথচ বাড়িতে পাড়ায় অফিসে পুজোর প্যান্ডেলে
বিয়ে বাড়িতে অন্নপ্রাশনে এখনো আমাকে নিয়ে ফিসফাস
ডাক্তারের কাছে যাই – ফিসফাস
কলেজে ঢুকি – ফিসফাস
বাজারে যাই – ফিসফাস
যে হাউসিং –এ থাকি সেখানেও চলতে থাকে অবিরাম লুকোচুরি ।
ওটা লুকোচুরি নয়, ওটা ফিসফাস নয়
ওটা আপনাদের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক-একটা সুপ্ত গুজরাট ।
যদি আপনাদের হৃদয়
বড় না করেন
আকাশের দিকে আপনারা যদি না তাকান
এই পোড়া দেশে আরও, আরও, আরও
অনেকগুলো পোড়া গুজরাট তৈরি হবে । ( অংশ, আমি ফিরোজা, একটি ভারতীয় মেয়ে)
ভাবুন লাভ জিহাদকে বিষয় করে কয়েকদিন আগেও তনিষ্ক-এর করা একটি বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে এই ভারতবর্ষে এমন কিছু হল, যার জন্য কোম্পানিটি বিজ্ঞাপন তুলে নিতে বাধ্য হল। দোলের একটি বিজ্ঞাপন নিয়েও কয়েকদিন আগে এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একদিকে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এ দেশে তৈরি করছে এক ভয়ানক অরাজকতা, দলিত ও তথাকথিত নিম্নবর্ণের ভারতীয়দের উপর অত্যাচার। অন্যদিকে এই ধর্মের সংকীর্ণতা এ দেশেই তৈরি করছে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। ‘আমি ফিরোজা, একটি ভারতীয় মেয়ে’ শীর্ষক কবিতাটিও তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলা এক প্রকৃত রাজনৈতিক উচ্চারণ। এক গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, যা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া উচিত মানবতার ম্যানিফেস্টো হিসেবে। ‘ আপনাদের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত গুজরাট’ তো আমাদের এই দেশের সমস্ত মানবিকতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সমগ্র ভারতবর্ষ পরিণত হচ্ছে এক উচ্চবর্ণের হিন্দুরাষ্ট্রে। এই প্রেক্ষিত থেকেই যদি আমরা বিচার করি, তাহলে এই কবিতাগুলির চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক কবিতা আর নেই বলেই মনে হয়।
কবিতার রাজনৈতিক ভাষ্য এবং রাজনীতির কথায় কাব্যিক ভাষ্য—এই দুয়ের মধ্যে সুবোধ সরকারের কবিতায় উঠে এসেছে এক স্বতন্ত্র বিষয়। তা হল কবিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক উচ্চারণ। সেই উচ্চারণ ম্যানিফেস্টো হচ্ছে কোনও রাজনৈতিক দলের নয়, বরং মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের। মানুষের না-বলা প্রশ্নের।
তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে আমার কাছে
তোমার হাতে মায়াকভ্ স্কি
আর চোখে
সকালবেলার আলো |
বিহার থেকে ফিরে এসে তুমি আবার এলে
গলা নামিয়ে, বাষ্প লুকিয়ে
তুমি বলেছিলে বিহারের কথা
খুন হয়ে যাওয়া বাবার কথা
আমি দেখতে পেলাম তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বিষণ্ণতা |
আবার এলে একদিন, আবারও এলে, আবার, আবার
একদিন চিন নিয়ে কথা হল
একদিন ভিয়েৎনাম
একদিন কম্বোডিয়া
একদিন কিউবা
তোমার চোখে সকালবেলার আলো
তুমি চে-গুয়েভারার ডায়েরি মুখস্ত বলেছিলে |
কিন্তু কী হল তোমার ?
আসা বন্ধ করে দিলে কেন ?
একদিন ফোন করেছিলাম, তোমার বাড়ি থেকে
আমায় বলল, তিনদিন বাড়ি ফেরনি তুমি
এরকম তো ছিলে না তুমি ? কী হয়েছে তোমার ?...
( অংশ, ছাত্রকে লেখা চিঠি)
এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর নেই এই সময়ে। কী হল এই দেশটার? এরকম তো ছিলে না তুমি। এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য হয়তো আর নেই এসময়ে।