
শেষ আপডেট: 25 April 2020 10:51
হয়তো স্বাভাবিক ছিল এটাই যে সত্যজিৎ রায়ের ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে শ্যামলেন্দুর মতো কোনও অনতিপ্রৌঢ় যুবক আজ এই স্বেচ্ছাবন্দি জীবনের সকালে ভীমসেন যোশীর টোড়ি শুনে ভাববে— দিন যায় বিষাদে। কুরুবৎস থেকে, বেথলেহেম থেকে, আমরা যারা এই শহরে এসে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছি, ফিসফিস করে বলেছি— ‘ঈশ্বর! আমারে কইলকাতা নিয়া যাবা?’ তারা পলকেই দেখতে পাই এই জনপদ মৃতবৎসা। খ্রিস্ট এখানে আর পুনরুত্থিত হবেন না। শত শত কুমারী মাতা মিডিয়াকে জানানোর জন্য বাইট দেয়— ‘আগামী সপ্তাহে আমরা করোনা-দংশনে লুটিয়ে পড়ব কিন্তু এ সপ্তাহে অনাহার থেকে আমাদের সব মিছিলে প্রয়োজনীয় আলোকসম্পাতের ব্যবস্থা করে দিন!’ আজ কলকাতার গলি-উপগলি-ফ্লাইওভারের তলায় এমন পর্যটনরত সন্ন্যাসী নেই যিনি স্পর্শ করবেন এই রূপোপজীবিনীকে, সান্ত্বনায় : ‘আজি রজনীতে হয়েছে সময় এসেছি বাসবদত্তা।’
আমি দেখতে পাই কাগজ থেকে কাগজে, বার্তা থেকে বার্তায়, শব্দের ডিজিটাল শিউলিরাশি ঝরে পড়ে আছে, মৃত। যেখানে আকাশের দেবতার কটাক্ষ আর রাত্রির অভিসম্পাত, যেখানে লব ও কুশকে সঙ্গে নিয়ে রামসীতা জলন্ধর থেকে এগিয়ে চলেছেন নাসিকের দিকে, অথবা একাকী ইয়াসিন বা কোনও মলয়ালি জয়সলমির থেকে দেখতে পায় দূর সিন্ধুতীর, সেখানে প্রেম নেই, তবুও কোথাও কোনও প্রীতি নেই এতদিন পরে!
ইউজিন ইয়োনেস্কোর নাটকটাই হঠাৎ মনে হল বাস্তবতার নাটমঞ্চ। একটা জনপদ দ্রুত গণ্ডারে বদলে যাচ্ছে। গণ্ডার গণ্ডারকে ভাবায়, হাসায়, ভয় দেখায়। ‘আইসোলেশন’ আর ‘কোয়ারেন্টাইন’-এর কথা বলে। চারিদিকে সুশিক্ষিত, সুসজ্জিত, সুকথক ভাষ্যকার যারা বিচ্ছিন্ন হতে বলে। কেউ কোনওদিন ভেবে দেখেনি আসমুদ্রহিমাচলে ক’টি পরিবারের একটিও ঘর আছে। বস্তিতে আর গ্রামে যে জনসংখ্যা তারা তো ‘প্ল্যানড’ নয় যে আমরা দু’জন— আমাদের একজন। জব্বলপুরের পঁচিশ কিলোমিটার দূরের পল্লিরমণী যে জল খান, পূর্ব কলকাতার আকাশছোঁয়া দম্ভের মতো টাওয়ার-সমূহে তা শৌচকার্যেও ব্যবহৃত হয় না। তথ্য আর পরিসংখ্যান এসে ভিড় করে; দেখতে পাই না পুণ্যতোয়া জাহ্নবী বয়ে চলেছে, তার পাশে দুটি উলঙ্গ শিশু খেলে চলেছে অবিরত; অনন্ত সময়।
বার্তাজীবী এই সমাজ কত কাঙাল হয়ে আছে! বড়জোর দশটা শহর, মাত্র দশটা শহর দাবি করছে তারা অনলাইনে মারের সাগর পাড়ি দেবে। ভারতবর্ষে ক’জন মানুষের কম্পিউটার আছে? ক’জন মানুষ তা ব্যবহার করতে পারেন? আয়লা-বিধ্বস্ত সুন্দরবন উপকূলে কিংবা ঘন ঘিঞ্জি ধারাভি বস্তি এলাকায় এসব পরাবাস্তব পরিহাসের মানে কী? আরব অঞ্চল থেকে কোচিনে ফিরে যে মানুষ দেখে সমগ্র পরিবারের জন্য একটি পায়খানা বরাদ্দ তাকে চোদ্দো দিন স্বগৃহে কোয়ারেন্টাইনের পরামর্শ যারা দিচ্ছেন, তারা জানেন না চোদ্দো বছর এভাবে রঘুপতি রাঘব রাজারামকে বনবাসে এরাই আতিথ্য দান করেছিল? কয়েক দিন আগেও কিন্তু এই হতভাগ্য মানুষদের জানা ছিল না তাদের গৃহ কোথায়, সন্দেহের তিরে বিদ্ধ ছিল তাদের নাগরিকত্ব। তারা তো নির্বাসিত— বাহিরে অন্তরে! করোনা আতঙ্ক নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় যেসব কণ্ঠস্বর ভেসে আসে তা অন্তত করুণাঘন নয়। অসহায় অনিকেত এই মানুষেরা যে বাক্যসমূহ গিলে খেতে বাধ্য হচ্ছেন তা এলোমেলো বিশেষণ, ক্রিয়ার জঞ্জাল, জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দূরে থাকে। সে উচ্চারণে কোনও অনুভূতি নেই। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের সমাজে মূল সমস্যা এইখানেই যে আমরা কথা বলছি। যে কথা বলছি, যাকে বলছি সে শুনতে পাচ্ছে না। এই কথা বলার আনন্দে, কথার স্তূপে ক্রমশ আমরা ডুবে যাচ্ছি। যেমনভাবে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর নায়ক টাকার স্তূপে ডুবে গিয়েছিল। এই নবীন মধ্যবিত্ত দল— তারা ফেসবুকে হোয়াটসঅ্যাপে সোশাল মিডিয়ায় শুধুই বাক্যের স্তূপ, শুধুই অক্ষরের জঞ্জালে চাপা পড়ছে। এই মৃত্যু করোনার থেকেও ভয়াবহ। করোনার থেকেও দুঃস্বপ্ন!
আমাদের এই পরিণতি হয়তো দৈববাণীর মতো ঘোষিত হচ্ছিল। অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? আমরা বড়লোক হওয়ার নেশায় বাচিকশিল্প আয়ত্ত করছিলাম। মেঘের কাঁচুলি খুলে চাঁদ উঠছিল আকাশে। আমরা ক্রমশ ভুলে যেতে চাইলাম ঝলসানো রুটির রোজনামচা। দেশজুড়ে রূপসীরা প্রসব করছিল টয়োটা, হুন্ডাই বা সুইফ্ট। শপিং মলের এসকালেটরে চলমান অশরীরী। গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজারে কবন্ধের মিছিল। বুদ্ধ থেকে মার্কস সবাই ছেড়ে যাচ্ছিলেন এই জনপদ। একদিন অপূর্বকুমার রায়, সত্যজিতের নায়ক শহরকে দেখেছিল ছাপাখানায়। তার হাতে একটি গ্লোব ছিল। দু’হাত দিয়ে সেই গ্রামীণ যুবক বসুধাকে কুটুম্ব মনে করেছিল। আজ তো এই শহর বাতানুকূল পানশালা। তার কোনও ধর্ম নেই, কোকাকোলা আছে। অবচেতনা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, পড়ে আছে খোলস; বিরতিহীন খোয়ারি, যাকে মার্কিনি পণ্ডিত ফ্রেডরিক জেমিসন বলেন, Surrealism without the Unconscious। রাত বারোটার বৃষ্টি, কালো বৃষ্টি ঝরে পড়ে স্তব্ধতার স্তূপে।
গত তিরিশ বছরে আমাদের সম্পদের দারিদ্র এত প্রকট হয়েছে যে, নার্সিংহোমগুলিকে ট্যুরিস্ট রিসর্ট মনে হয়। হাসপাতালের— সে মেডিক্যাল কলেজ হোক বা রায়গঞ্জের সুপারস্পেশালিটি, সামনে থিকথিক করছে হাসিম শেখ বা রামা কৈবর্ত্যের দল। পেশেন্ট পার্টি! এর বেশি কিছু নয়। আর যারা অ-সরকারীকরণের আলোকিত দৃষ্টান্ত তাদের বাগানে বোগেনভেলিয়া ও চন্দ্রমল্লিকা, হৃদয়ে প্যাকেজ। সেখানে আপনাকে স্বাগত জানাবে ইনস্যুরেন্স ডেস্ক ও মৃদু সুহাসিত কর্পোরেট ক্লাব। সুপ্রিম কোর্টের রায় পর্যন্ত এরা এদের স্বপ্নের মতো করিডরে, সিনেমা সেটের চাইতেও অর্থময় ল্যাবরেটরিতে কোনও করোনা-আক্রান্তের পরীক্ষা করতে রাজি ছিল না। যারা প্রচার করতে শুরু করেছিল আর তারা বিশ্বাসও করিয়ে ফেলেছিল যে, যেকোনও ক্রেডিট কার্ড আমাদের জাতীয় পতাকার চেয়ে দামি, যারা জীবনযাপনের পাসওয়ার্ড বিলগ্নীকরণ চেয়েছিল, যারা ভাবতে চাইত সরকার একুশ শতকে একটি বাহুল্য চিহ্ন, একটি অতিশয়োক্তি বা টটোলজি, তারা অন্তত দেখতে পাচ্ছে আমাদের সরকারি হাসপাতাল, আমাদের সরকারি রেলপথ, আমাদের সরকারি প্ল্যাটফর্ম, সরকারি দূরসঞ্চার ব্যবস্থা, সরকারি খাদ্য বিপণন যদি না থাকত তবে কতিপয় শিল্পপতি আজ আমাদের অন্ত্যেষ্টিযাত্রারও ব্যবস্থা করে উঠতে পারত না।
বস্তুত ইওরোপ-আমেরিকার কর্পোরেট পুঁজিবাদ বুঝতে পারেনি যে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাওয়ায় একা মানুষের দিকচিহ্নহীন ঔদ্ধত্য কোনও মরূদ্যান পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না। দস্তয়েভস্কির কিরিলভ আত্মহত্যা করেছিল এই কারণে যে, ঈশ্বর যদি উপস্থিত না থাকেন তবে নৈরাজ্যই ন্যায়— সব কিছুই অনুমোদিত। যার দর্শন নেই কিন্তু টেকনোলজি আছে, যে দেখতে পায় না তাই জিপিএস ব্যবহার করে তার শবদেহ একদিন নগরীর পথে পথে স্মারক হিসেবে পড়ে থাকবেই। সক্রাতেস থেকে সার্ত— আজ তার পাশে কেউ নেই। তার শরীরের কোনও ছায়া পড়ে না। নচিকেতা ও লাজারাস যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিল। উপনিষদ ও বাইবেল আসলে তো মায়ায় ফেরায়। যে মায়া থেকে প্রতিবেশীকে জানানো যায়, সহজীবীদের বোঝানো যায় মারী জয়ের মন্ত্র।
দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসে রাস্কলনিকভ, জনৈক খুনি ও সোনিয়া একজন দেহপসারিনী লাজারাসের গল্প শোনে, যে লাজারাস মৃত্যুলোক থেকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছিল। প্রেম তাদের জীবনে পুনরুত্থিত করে। আর এ শহর, ধূসর শহর— ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’য় মৃত্যুঞ্জয়ী নচিকেতাকে ভুলে গিয়ে ঈশ্বরকে সুরাপানে ও গণিকাগৃহে নিখোঁজ করে দেয়। আমাদের এটিএম কাউন্টারে টাকা আছে। প্রেম নেই। আমাদের লিপ্সা ছিল, লিপ্তি ছিল না। তাই আমাদের সারা গায়ে সফটওয়্যারের আঁশ লেগে আছে শুধু। কত দীর্ঘ ঋতু মানুষ সভ্যতার জ্বরতপ্ত কপালে হাত রাখেনি। তার চশমা পড়ে ছিল নর্তকীর পায়ের তলায়। প্রলয়ের পথ সে ছেড়ে দিয়েছিল অকাতরে। পাঁচশো বছর মানুষ শর্তহীন প্রভুত্ব করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছে সহমর্মিতা। আজ যদি মৃত্যু তার দরজায় কড়া নাড়ে, আজ যদি সমুদ্র জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় হাসপাতাল, মানুষ কি পুনর্জাগরণের জন্য মহাকালের থেকে আরও একবার মার্জনা পাবে না?
লেখক চলচ্চিত্রবেত্তা ও সংস্কৃতির ভাষ্যকার।