গৌতম কুমার গোস্বামী
(goutamkgoswami@gmail.com)
রাস্তার দিকে মুখ করে থাকা ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিক চোখ যেতেই কেমন যেন বিষণ্ণতা গ্রাস করল মনকে। চেনা রাস্তার অচেনা ছবি। একঝাঁক কাক প্রতিদিন খুঁজে বেড়াচ্ছে উল্টোদিকের খাবারের দোকানের সামনে রাখা ডাস্টবিনটা। আসছে, খুঁজছে আর আমার মতোই বিষণ্ণ হয়ে চলে যাচ্ছে। ফুটপাথের পাগলটার আজ চরম উল্লাস, রাজপথ আজ ওর একার রাজত্ব।
অভিবাসী শ্রমিকরা মাইলের পর মাইল হেঁটে চেষ্টা করছেন নিজের বাড়ি ফেরার। শুনছি ক’জন মারাও গেছেন। তবু পেটের টান। কাজের জায়গাটা যে আজ বন্ধ, খাবেন কী?
স্টেশনের ভিখারিগুলো প্রথমদিন বুঝে উঠতে পারেননি কী হয়েছে। ধর্মঘট? একদিন, দু’দিন, তিনদিন... না! সেই একই ছবি। কেউ নেই। মন্দির, মসজিদ, গুরুদ্বারের সামনে বসে থাকা মানুষের থালাতেও ঠং করে পয়সা ফেলার আওয়াজ বন্ধ।
চারদিকে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি। ট্রেনের হকার, স্টেশনের চায়ের দোকান, বাস-কর্মচারী সবার চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ। যে দু-চারজন মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছেন, তাদের মধ্যেও কেমন যেন একটা ভাব। আড়চোখে পাশের মানুষটিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখা, কে জানে ওর মধ্যেও কিছু আছে কিনা। অস্পৃশ্যতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নতুনভাবে। এ অস্পৃশ্যতা জাতপাতের সীমা ছাড়িয়ে একটু অন্যরকম।
পাশের বস্তির মানুষগুলোই বা কী করছেন? ওরা কেমন আছেন? আমার চেয়ে হয়তো ভাল আছেন। বাজারের থলিটা নিয়ে আনমনে সিঁড়ি বেয়ে নামছিলাম, চমকে গেলাম একটা চেনা স্বরে, ‘দেখে হাঁটুন কাকু। মিনিমাম ডিস্ট্যান্সটাও মেইন্টেন করে না রে বাবা! নিউজ চ্যানেল ফলো করুন, দেখুন কী বলছে।’ বলেই দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল।
আমেরিকায় আক্রান্তের সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়াল। আমেরিকা, স্পেন, ইতালিতে মৃত্যুমিছিল। ধারাভী বস্তি এলাকাতে আরও চারজন পজিটিভ। ডাক্তারবাবুরাই এখন আসল যোদ্ধা। এই মহামারী থেকে নিজেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় লকডাউন মেনে চলা। বিশ্বব্যাপী ২০০ কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। দেখা দেবে অর্থনৈতিক সঙ্কট। উফ! না আর নিতে পারছি না। ছেলেটা ফোনও করে না, নিউইয়র্কের খবর নিউজ চ্যানেল থেকেই নিতে হচ্ছে। আমেরিকায় নাকি ৪০ জন প্রবাসী ভারতীয়র মৃত্যু হয়েছে। কেমন আছে ছেলেটা?
ভাল থাকুক আমার দেশ, ভাল থাকুক পৃথিবী। Stay Home, Stay Safe.
এই কঠিন সময় আমাদের শিখিয়েছে ভয় পেতে, কাজ হারানোর ভয়
পায়েল চ্যাটার্জি
(payel.air@gmail.com)
পৃথিবীর কাছে এ বড় কঠিন সময়। এই কঠিন সময় আমাদের শিখিয়েছে ভয় পেতে, কাজ হারানোর ভয়, স্বজন হারানোর ভয়। এই ভাইরাসের পক্ষপাতহীন, বৈষম্যহীন সংক্রমণ আমাদের বেঁচে থাকার পাঠ পড়াচ্ছে। আসলে আমরা সব কিছুই উদযাপন করতে ভালবাসি। কিন্তু আতঙ্ক, হতাশা সেই তালিকায় পড়ে না। তাই মনের গহন কোণে লুকিয়ে থাকা বিষাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অপেক্ষার প্রহর গোনা হয়ে পড়ছে বড়ই কঠিন।
রাতারাতি জীবনটা পাল্টে গেল। করোনা-দৈত্য যেন রুপোর কাঠি ছুঁইয়ে দেশটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল তেইশে মার্চ মধ্যরাত থেকে। তবে এ ঘুম শান্তির নয়, হতাশার, আতঙ্কের। একটা আণুবীক্ষণিক বীজাণু তরতরিয়ে এগিয়ে চলা সভ্যতাকে সজোরে ব্রেক কষে থামিয়ে দিল। পৃথিবী তার স্বাভাবিক ছন্দে চলা জীবন থেকে বিরতিতে, দেশও বন্ধ করল তার ঝাঁপি। SARS-COV-2 অর্থাৎ নভেল করোনাভাইরাসের এখনও পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষেধক সামাজিক দূরত্ব। তাই এই লকডাউন।
করোনা-ত্রাসে ত্রস্ত প্রাণের স্যান্ডউইচ অবস্থা। বাইরে করোনা আর বাড়িতে work from home অথবা ওয়ার্ক ফর হোম। তবে যাদের মাথার উপর ছাদ আর অন্নসংস্থান এখনও পর্যন্ত সুনিশ্চিত তাদের সমস্যাটা খানিক শৌখিন। কখনও একঘেয়েমি কাটানোর উপায়, আবার কখনও কেন ভিডিও কলটা কেটে গেল তার কারণ খুঁজতে ব্যস্ত এই দুঃখবিলাসীরা। আর কিছু মানুষ প্রতিদিন সূর্যটা দেখে ভাবছেন আবার একটা নতুন দিন মানেই তো ক্ষুন্নিবৃত্তির উপায় খোঁজা।
তবে লকডাউন প্রকৃতির কাছে সঞ্জীবনী। সে তার সমস্ত ধুলো-ময়লা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে সেজে উঠেছে। দূষণমুক্ত পরিবেশ প্রকৃতিকে যোগাচ্ছে বিশল্যকরণী।
এ লকডাউনে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স মেন্টেন করতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে আমাদের নিকট আত্মীয়। আমাদের পোস্টানো, ট্যাগানোতে হ্যাকারদের পোয়া বারো। গুজবের জন্য তো এখন মোবাইল পাতা দায়। এই collateral damage সামলানো বেশ কঠিন। এই অতিমারির ধাক্কায় অর্থনীতি গভীর খাদে। এই অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ জিততে গেলে বন্দিদশা মানতেই হবে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা এই যুদ্ধের একেবারে সামনের সারির সৈনিক। কোয়ারেন্টাইন গেম, আইসোলেশন চ্যালেঞ্জ আর মিমের ভিড়ে এদের ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকাই সংক্রমণ কমানোর অস্ত্র। পৃথিবীর সুস্থ হওয়ার আশায় আমরা সবাই, সংক্রমণ হোক সচেতনতার, ছোঁয়াচে হোক ভালবাসা।